চন্দ্রনাথ গুপ্ত :
দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে প্রচন্ড গরমে মানুষ হাঁসফাঁস করছেন। গরমের সঙ্গে চাহিদা বেড়েছে শরবত ও কোমল পানীয়র। দিনের বেলা প্রচন্ড গরম থাকলেও রাতের শেষ ভাগে শরীরে জড়াতে হচ্ছে কাঁথা বা কম্বল।
প্রচন্ড গরমে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট মানুষকে বেকায়দায় ফেলেছে। টিউবওয়েল ও সেচযন্ত্রে প্রয়োজনীয় পানি মিলছে না। প্রতিবছরই পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে জানান কৃষি বিভাগের লোকজন।
তাপপ্রবাহ ও ভ্যাপসা গরমে মানুষ জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হচ্ছেন না। রিকশা ও ভ্যান চালকরা একটু গাড়ি চালিয়েই ছায়ায় গিয়ে জিরিয়ে নিচ্ছেন। অনেকে বিকেলে তাপমাত্রা কমলে যানবাহন নিয়ে বাইরে বের হচ্ছেন।
ফুলবাড়ী পৌরশহরের কাঁটাবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা রিকশা চালক সিঙ্গেল জয়সোয়াল (৬৩) বলেন, বয়স হয়েছে, তাই রোদে বাইরে যেতে পারেন না। আাবার সংসারও চলে না। তাই বাধ্য হয়ে বিকেলে রোদের তেজ কমে এলে রিকশা নিয়ে বাইরে যান।
উপজেলা খয়েরবাড়ী ইউনিয়নের পূর্ব নারায়ণপুর গ্রামের কৃষিশ্রমিক ইলিয়াস হেম্ব্রম ও বেতদীঘি ইউনিয়নের সূর্য্যপাড়া গ্রামের কৃষিশ্রমিক শ্যামল হাঁসদা বলেন, তাপদাহের কারণে কাজ কারতে গিয়ে হাফিয়ে উঠছেন। তীব্র তাপদাহে জন্য ক্ষেত খামারে বেশিক্ষণ টিকে থাকা যাচ্ছে না। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন নারী কৃষিশ্রমিক রাস্তার কাজ করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তাপদাহের জন্য।
ফুলবাড়ী পৌরএলাকার রিকশা চালক অলঙ্গ রবিদাস বলেন, গত তিনদিন ধরে গরমে রাস্তায় লোকজন পাওয়া যাচ্ছে না। সকালে রিকশা নিয়ে বের হলেও যাত্রীর অভাবে তেমন আয় রোজগার হয়নি। রাস্তা থাকছে ফাঁকা। আয় না হওয়ায় অনেকে বিকেলে রিকশা বের করছেন।
মাইক্রোবাস চালক সঞ্জিত প্রসাদ বলেন, গরম আর তাপদাহের জন্য রাস্তার পিচ গলে যাচ্ছে, এতে করে যানবাহন খুব সতর্কতার সঙ্গে চালাতে হচ্ছে। একটু এদিক ওদিক হলেই দুর্ঘটনার ঘটতে পারে।
গরমে তৃষ্ণা মেটাতে লোকজন শরবতের দোকানে ভিড় করছেন। ফুলবাড়ী শহরে, এমনকি হাটবাজারেও গড়ে উঠেছে ভ্রাম্যমাণ শরবতের দোকান। আখের রস, তোকমা, এলোভেরা, পাকা বেল, শিমুলের মূল, হরতকি, বয়রা ও লেবুর শরবত এবং ফলের জুস বিক্রি হচ্ছে। তোকমা, এলোভেরা, পাকা বেল, শিমুলের মূল, হরতকি, বয়রা ও লেবুর শরবত বিক্রি হচ্ছে গøাস ভেদে ২০ থেকে ৪০ টাকা এবং বরফ, পানি, লেবু ও বিট লবন দিয়ে তৈরি শরবত ১০ টাকা গøাস বিক্রি হচ্ছে। সেই সঙ্গে চাহিদা বেড়েছে বেড়েছে আইসক্রিম ও কোমল পানীয়র।
উপজেলার মহেলপুর গ্রামের প্রবীণ শিক্ষক মো. নাজিম উদ্দিন মন্ডল বলেন, এত গরম সহ্য হয় না, বাইরে আগুনের মতো রোদ।
ফুলবাড়ী পৌরশহরের সড়কের পার্শ্বে ভ্রাম্যমাণ শরবত বিক্রেতা সাইদার রহমান (৫৫) বলেন, তিনি তোকমা, এলোভেরা, পাকা বেল, শিমুলের মূল, হরতকি, বয়রা ও লেবুর শরবত তৈরি করেন। গরম ও রোদের তাপ বাড়লে তার শরবতের বেচাবিক্রি বেশি হয়। তবে প্রচন্ড রোদের জন্য মানুষ প্রয়োজন ছাড়া বাড়ীর বাইরে বের হচ্ছে, এজন্য ক্রেতাও কম পাওয়া যাচ্ছে। তবে বিকেলের পর বেচাবিক্রি বেড়ে যায়। গøাস ভেদে ২০ থেকে ৪০ টাকা দরে বিক্রি করেন তার শরবত।
আরেক শরবত বিক্রেতা মোহাম্মদ আলী বলেন, তিনি বরফ, পানি, লেবু ও বিট লবন দিয়ে শরবত তৈরি করে ১০ টাকা গøাস বিক্রি করেন। এ সময় বেশ ভালো বিক্রি হচ্ছে। গরম যত বাড়বে ততই শরবতের চাহিদা বেড়ে যায়। প্রচন্ড গরমের জন্য তিনিও তার শরবতের দোকান নিয়ে এক জায়গায় টিকে থাকতে পারছেন না। মাঝেমধ্যেই ছায়ায় জিরাতে হচ্ছে।
প্রাণ কোম্পানীর কোমলপানীয়র এজেন্ট মো. আব্দুল কাইয়ুম বলেন, প্রচন্ড গরমের জন্য অন্যান্য সময়ের তুলনায় এ সময় একটু বেশি কোমলপানীয়র বিক্রি হচ্ছে।
দিনাজপুর আঞ্চলিক আবহাওয়া দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবহাওয়া বিদ মো. তোফাজ্জর হোসেন বলেন, গত তিনদিন ধরে দিনাজপুর জেলার তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রি ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৩৭ দশমিক শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াস এর মধ্যে উঠানামা করছে। আজ মঙ্গলবার (১০ জুন) দুপুর ১২টায় জেলার তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৭ দশমিক শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং বাতাসের আর্দ্রতা ৪৯ শতাংশ। একইভাবে গত সোমবার (৯ জুন) তাপমাত্রা ছিল ৩৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং গত রোববার (৮ জুন) তাপমাত্রা ছিল ৩৬ দশমিক শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াস।
তিনি আরো বলেন, বর্তমানে জেলাজুড়ে মৃদ্যু তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকলেও এর তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগামীকাল বুধবার (১১ জুন) পর্যন্ত চলমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে। বর্তমানে তাপমাত্রা বৃদ্ধির পাশাপাশি বাতাসের আর্দ্রতা বা জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি হওয়ায় গরমের তীব্রতা অতীব মাত্রায় অনভূত হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় বাসাতের গড় আর্দ্রতার পরিমাণ ৭০ শতাংশের ওপরে বিরাজ করছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মশিউর রহমান বলেন, চলতান মৃদু তাপদাহে মানুষ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন, বিশেষ করে সর্দি-জ্বর, মাথা ব্যাথা, গলা ব্যাথা, ডায়রিয়া, পেটের ব্যথা উল্লেখ্যযোগ্য। প্রতিদিনই এসব রোগে আক্রান্ত অন্তত শতাধিক রোগী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বহিঃবিভাগে চিকিৎসা নিচ্ছেন। যাদের অবস্থা একটু খারাপ মনে হচ্ছে তাদেরকে অন্তঃবিভাগে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
আমন্ত্রণ/এসিজি


































