আজহারুল আজাদ জুয়েল, দিনাজপুর :
৮ই মার্চ ২০২৬ ছিল আন্তর্জাতিক নারী দিবস। সেদিন ঢাকার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এক বর্ণাঢ্য আয়োজনে ৮৬ বছর বয়সী এক প্রৌড়া নারীকে ‘সফল জননী নারী ক্যাটাগরিতে’ পুরস্কৃত করা হলো ‘অদম্য নারী পুরস্কার’। স্বয়ং রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ নিজ হাত সফল জননীর জাতীয় পুরস্কারটি তুলে দিলেন সেই জননীর হাতে। এ সময় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, কন্যা জাইমা রহমান সহ দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ মঞ্চে ও মিলনায়তনে উপস্থিত ছিলেন।
‘মহামান্য রাষ্ট্রপতি আমাকে যখন ক্রেস্ট তুলে দেন, তখন তিনি জিজ্ঞাসা করেন, এটা তো অনেক ভারী, আপনি কি নিতে পারবেন? পায়ে পড়লে ব্যথা পাবেন। তার চেয়ে আমি ধরে থাকি, আপনি হাত দেন’ বলেন নুরবানু।
এরপর মূলত রাষ্ট্রপতিই ক্রেস্ট ধরে থাকেন, আর প্রৌড়া নূর বানু ক্রেস্টে হাত ছুঁয়ে রাখেন। ছবি তোলার পর ক্রেস্ট তাঁর ছেলেকে দেওয়া হয়। ‘মহামান্য রাষ্ট্রপতি কত বড় মাপের মানুষ! তাঁর এমন বদান্যতা ভুলে যাওয়ার নয়।’ এভাবেই মহামান্য রাষ্ট্রপতির প্রশংসা করলেন নুরবানু।
তিনি বলেন, ‘আমার বয়স অনেক বেশি দেখে মঞ্চে আমার জন্য একটি চেয়ার আনা হয় এবং মহামান্য রাষ্ট্রপতির পিছনে আমাকে বসতে দেয়া হয়। পুরস্কার নিতে গিয়ে ভীষণ অভিভূত হয়েছি। আমাকে অনেক সম্মান দেখানো হয়েছে। আমি সেখানে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী ও কন্যাকে বলি যে, তোমাদের সাথে ছবি তুলব। তাঁরা সানন্দে আমার সাথে ছবি তোলেন এবং জাইমা রহমান তাদেরকে দোয়া করার জন্য বলেন। আমি তাঁদের জন্য দোয়া করেছি।’
জাতীয় পর্যায়ে ‘সফল জননী নারী’ ক্যাটাগরিতে পুরস্কারপ্রাপ্ত নূরবানু কবির হলেন দিনাজপুরের জননী। দিনাজপুর শহরের বালুবাড়ী নিবাসী বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব মোহাম্মদ হুমায়ুন কবিরের স্ত্রী। তিনি প্রথমে উপজেলা পর্যায়ে, পরে জেলা পর্যায়ে, এরপর ভাগীয় পর্যায়ে এই পুরস্কার লাভ করেছিলেন। চূড়ান্ত ধাপে জাতীয় পর্যায়েও পুরস্কার লাভ করে দিনাজপুরকে গর্বিত জননীর জেলায় পরিণত করেছেন। অনুষ্ঠানে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কার হিসেবে ক্রেস্ট, সনদ ও নগদ অর্থ তুলে দেওয়া হয়।
অবিভক্ত দিনাজপুর জেলার লালপুর গ্রাম নিবাসী মহিদুর রহমান চৌধুরী এবং আমিনা খাতুন এর কন্যা নুরবানু কবীর ১৯৫৫ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে একের পর এক ১০ সন্তানের জননী হবার গৌরব লাভ করেছিলেন। নিজে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করলেও সন্তানরা যেন সুশিক্ষিত হয়ে কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারে সেজন্য তিনি সারাজীবন কষ্ট ও সংগ্রাম করে গেছেন। তার কষ্টের ফসল হিসেবে ১০ সন্তানের ৭জন বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ মাস্টার্স ডিগ্রি, ১জন গ্রাজুয়েশন ও ২জন ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন এবং কর্ম জগতে সুপ্রতিষ্ঠা লাভ করতে সমর্থ হয়েছেন।
নুরবানুর ১ম সন্তান সুলতানা কবীর ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অবসরপ্রাপ্ত ইন্সট্রাক্টর, ৩য় সন্তান সুফিয়া কবীর বিরলের মুন্সিপাড়া কলেজের অবসরপ্রাপ্ত সহকারি অধ্যাপক (অর্থনীতি), চতুর্থ সন্তান আবু সুফিয়ান কবির ঢাকায় সাংবাদিকতা করছেন, পঞ্চম সন্তান শাহান সাহা আজাদ কবির সরকারি চাকরিতে উপসচিব পদে অবসরে গেছেন, ৭ম সন্তান শাহানা কবীর সহকারি শিক্ষক পদে চাকরি করার পর অবসরে আছেন, ৮ম সন্তান সাদিয়া সুলতানা দিনাজপুর সরকারি মহিলা কলেজে বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন, ৯ম সন্তান সোহেল সুলতান জুলকার নাইন কবীর পঞ্চগড়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) হিসেবে কর্মরত আছেন, ১০ম সন্তান সোহেলী কবির ঢাকা বিমানবন্দর (ক্যান্টনমেন্ট) উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। নুরবানুর দ্বিতীয় সন্তান সুলতান আলী কবীর কৃষিকর্মে যুক্ত আছেন এবং অপর সন্তান শাহিনা কবীর হলেন সাধারণ গৃহিণী।
নুরবানুর স্বামী বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব হুমায়ুন কবির পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের চাকুরিজীবী হিসেবে দেশের বিভিন্ন স্থানে কর্মরত থাকতেন। তিনি সন্তানদের তেমন সময় দিতে পারতেন না। নুরবানুকেই সন্তানদের কল্যাণে সার্বক্ষণিক নিয়োজিত থাকতে হতো। সন্তানদের সুশিক্ষিত করে মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হতো। তিনি হলেন এক অদম্য জননী রূপকার। যে কারণে তার ১০ সন্তানের সবাই শিক্ষার উচ্চ পর্যায়ে গিয়ে সফল হয়েছেন। এর স্বীকৃতি হিসেবে এ বছর মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর কর্তৃক প্রথমে উপজেলা পর্যায়ে, পরে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে, সর্বশেষ জাতীয় পর্যায়ে সফল জননী ক্যাটাগরিতে অদম্য নারী পুরস্কার লাভ করলেন।
নুরবানু মূলত একজন সাধারণ গৃহিণী। সার্বক্ষণিক ভাবে নিজ বাড়িতেই সাংসারিক কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। সাংসারিক কর্মকান্ডে মনোনিবেশ করতেই বেশি পছন্দ। তাঁর ছেলেমেয়েরা কর্ম ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বসবাস করছেন। মাঝে মধ্যে ছেলে-মেয়েদের বাসায় যান তিনি, তবে বয়সের কারণে সেই যাওয়াটা আজকাল তত বেশি হয় না। ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় আত্মীয়-স্বজনদের সাথে তাঁর যোগাযোগ রয়েছে অতি গভীরভাবে।
সফল জননী ক্যাটাগরিতে পুরস্কার লাভের পিছনে স্বামী বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব মোহাম্মদ হুমায়ুন কবিরের যথেষ্ট অবদান আছে বলে জানালেন নুরবানু।
‘আমি তো এসব খোঁজখবর রাখতাম না. আবুর (ছেলের নাম) বাবাই খোঁজ-খবর রাখত এবং আমার সম্পর্কে পরিচিতি তুলে ধরে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরকে দরখাস্ত দিয়েছিল। সেটা যে এইভাবে আমাকে সফলতা এনে দিবে তা ভাবতেই পারিনি। আমি ভীষণ কৃতজ্ঞ তার প্রতি, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের প্রতি এবং রাষ্ট্রের প্রতি।’ লেখক এর সাথে আলাপচারিতায় এভাবে সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন নুরবানু। তাঁর ৭১ তম বিবাহ বার্ষিকী পালিত হয়েছে গত পহেলা বৈশাখে।
পুরস্কার প্রাপ্তির পর নুরবানুর কদর বেড়েছে বিভিন্ন মহলে। দিনাজপুর জেলা প্রশাসন তাকে বিশেষভাবে সম্মাননা দিয়েছেন। সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান নবরূপী সম্বর্ধনা দিয়েছে। বেসরকারি সংস্থা পল্লীশ্রী থেকে সম্মানিত হয়েছেন। ২৫ এপ্রিল দিনাজপুর লেখক ফোরামের সাহিত্য বিষয়ক একটি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়েছেন।
অনেক প্রোগ্রামে এখন তাকে ডাকা হয় এবং বিশেষ শুভেচ্ছা বক্তব্য দিতে বলা হয়। তবে তিনি বক্তৃতা দিতে অভ্যস্ত নন। তাই শুভেচ্ছা বক্তব্য বলেন নিজের মতো করে, অতি সাদামাটা ভাবে।
নুরবানু এখন দিনাজপুরের গর্ব, বাংলাদেশের গর্ব। তিনি চান সব মায়েরাই যেন সফল জননী হয়ে উঠতে পারেন এবং সকল সন্তান যেন কৃতি সন্তান হয়ে উঠতে পারেন।
আমন্ত্রণ/এজি
































