রীতা রানী কানু :
এক কাপ চায়ের দাম ১০ টাকা। অথচ এক কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ৮ থেকে ৯ টাকায়। এমন বৈপরীত্যে হতাশ দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর আলুচাষিরা। উৎপাদন খরচই যেখানে ওঠে না, সেখানে লাভ তো দূরের কথা। লোকসানের বোঝা টানতেই হাঁপিয়ে উঠেছেন কৃষকেরা। গত বছরের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই এবারও একই শঙ্কা ঘিরে ধরেছে তাদের।
উপজেলার পাঠকপাড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল জব্বার বলেন, ‘এক কেজি আলু বেচে এক কাপ চা হয় না। তবু ক্রেতা নেই। গত বছর আলুতে ৫০ হাজার টাকা লোকসান করেছেন। এবারও যদি লোকসান হয়, তবে পথে বসতে হবে।’
উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত বছর উপজেলার পৌর এলাকাসহ ৭টি ইউনিয়নে ১ হাজার ৪৮০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছিল। এতে উৎপাদন হয় ৩৫ হাজার ৫২০ মেট্রিক টন আলু। কিন্তু ফুলবাড়ীর একমাত্রা হিমাগার ফুলবাড়ী কোল্ড স্টোরেজের ধারণক্ষমতা মাত্র ১০ হাজার টন। ফলে বাকি ১ লাখ ২৮ হাজার ৯৫ টন আলু কৃষকেরা বাড়িঘর, উঠান ও অস্থায়ী গুদামে সংরক্ষণ করেন। পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধা না থাকায় অনেক আলু পচে যায়। এতে অনেকে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন। হিমাগারে রাখা আলুর ভাড়াও অনেকের পক্ষে তোলা সম্ভব হয়নি।
কৃষি বিভাগ জানায়, গত বছরের মতো এ বছর আলুর আবাদ হয়েছে সমপরিমাণ জমিতে। তবে মৌসুমের শুরুতেই বাজারদর উৎপাদন খরচের নিচে নেমে যাওয়ায় চাষিরা বিপাকে পড়েছেন। সার, বীজ, সেচ ও শ্রমিকের মজুরি মিলিয়ে প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে গড়ে ১৬ থেকে ১৭ টাকা খরচ হলেও বাজারে দাম পাওয়া যাচ্ছে ৮ থেকে ৯ টাকা।
বুকরুক সমশের নগর গ্রামের কৃষক আব্দুর রহমান জানান, চলতি মৌসুমে এক একর জমি ইজারা নিতে হয়েছে ৩৫ হাজার টাকায়। চাষ বাবদ খরচ হয়েছে সাড়ে ৭ হাজার, উপখাদ্য সাড়ে ৬ হাজার, বীজ বাবদ ৫০ হাজার, রোপণের শ্রমিকের জন্য ৪ হাজার ৮০০ টাকা, রাসায়নিক সার ১৩ হাজার ৬০০ টাকা, আলু বাঁধা ৮ হাজার ৪০০ টাকা, সেচ শ্রমিকসহ ৪ হাজার টাকা, ওষুধ স্প্রে শ্রমিকসহ ১৬ হাজার, আলু উত্তোলন বাবদ ৯ হাজার ৬০০ টাকা খরচ হয়েছে। মোট ১ লাখ ৪৭ হাজার ৬০০ টাকা। এক একরে প্রায় ৯ হাজার কেজি আলু পেয়েছেন। সেই হিসেবে প্রতি কেজিতে তার গড় উৎপাদন খরচ ১৬ টাকারও বেশি। কিন্তু বাজারে দাম উৎপাদন খরচের অর্ধেক। গত বছর দাম না পেয়ে গুদামে ছেড়ে এসেছেন। এবার কী হয় আল্লাহ ভালো জানেন।
আলুচাষিদের দাবি, ন্যুনতম সহায়ক মূল্য নির্ধারণ, সরকারি ক্রয় কার্যক্রম চালু ও হিমাগারের ধারণক্ষমতা বাড়ানো না হলে প্রতিবছরই তাদের এমন লোকসানের চক্রে পড়তে হবে।
গোয়ালপাড়া গ্রামের আলু চাষি পরিক্ষিত চন্দ্র রায় বলেন, ‘এত কষ্ট করে আবাদ করেও যদি দাম না পান এবং বারবার যদি লোকসান গুনতে হয় তাহলে কৃষকরা বাঁচবেন কেমন করে। এ কারণে আগামীতে আলুর আবাদ মনে হয় বাদ দিয়ে অন্য ফসল আবাদে নজর দিতে হবে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সাইফ আব্দুল্লাহ মোস্তাফিন বলেন, এ বছর উপজেলায় আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ হাজার ৪৮০ হেক্টর জমি এবং আবাদও হয়েছে সমপরিমাণ জমিতে। যার উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার ৫২০ মেট্রিক টন। তবে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ কৃষকদের চাষাবাদ ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে কাজ করে থাকে। বাজারদর নির্ধারণের বিষয়টি কৃষি বিপণন বিভাগ দেখভাল করে থাকে।
আমন্ত্রণ/এজি
ফুলবাড়ীতে এক কেজি আলু বেচে এক কাপ চা হয় না!
মার্চ ৭, ২০২৬


































