[জন্ম : ১৯৫০খ্রি.- মৃত্যুঃ ২০২১ খ্রি.]
মো. জোবায়ের আলী জুয়েল :
ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় গান আর ঝাঁকড়া চুলের সৌন্দর্য দিয়ে প্রায় অর্ধ শতাব্দীর বেশি সময় ধরে যে লোকটি লাখো লাখো মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছিলেন তিনি হলেন গণ মানুষের শিল্পী ফকির আলমগীর। ‘মায়ের এক ধার দুধের দাম’, ‘ও সখিনা গেছস কিনা ভূইল্যা আমারে’ গান গুলো এদেশের মানুষকে দরাজগলায় এই শিল্পীর কথা মনে করিয়ে দেবে অনন্ত কাল। ষাটের দশক থেকে তিনি গান করা শুরু করেন। ৬৯ এর গণ অভ্যূত্থান, ৭১ এর মুক্তি যুদ্ধ ৯০ এর সামরিক শাসন বিরোধী গণ আন্দোলনে তিনি শামিল হয়েছিলেন নিজের গান দিয়ে। গণ সঙ্গীত ও দেশীয় পপ সঙ্গীতে তাঁর অবদান ব্যাপক। তিনি ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক তিনি ‘একুশে পদকে’ ভূষিত হন।
ফকির আলমগীরের জন্ম ১৯৫০ সালের ২১ ফেব্রæয়ারি ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা থানার অন্তর্গত কাল মৃধা গ্রামে। পিতা মোঃ হাচেন উদ্দিন ফকির, মা’ বেগম হাবিবুন্নেছা। কাল মৃধা হাই স্কুল থেকে ১৯৬৬ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর জগন্নাথ কলেজ থেকে তিনি উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করেন। জগন্নাথ কলেজ থেকে ¯স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে পরবর্তী পর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতায় এম,এ, পাস করেন। ১৯৬৬ সাল থেকেই তিনি ছাত্র রাজনীতিতে যোগ দেন। ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠী ও গণ শিল্পী গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে তিনি ষাটের দশক থেকেই সরব হয়ে ওঠেন। জড়িয়ে যান বামধারার ছাত্র রাজনীতিতে। সেই সুত্র ধরেই ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠী ও গণ শিল্পী গোষ্ঠীর একনিষ্ট সদস্য হিসেবে তিনি গান আর সংগ্রামের জগতে প্রবেশ করেন।
ফকির আলমগীর একজন লেখক ও ছিলেন ১৯৮৪ সালে তার প্রথম বই ‘চেনা চায়না’ প্রকাশ পায়। পরবর্তীতে তাঁর দুটি বইয়ের নাম ছিল ‘মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজয়ের গান’ এবং ‘গণ সঙ্গীতের অতীত ও বর্তমান’। পরবর্তীতে ২০১৩ সালে তিনি তিনটি বই প্রকাশ করেন ‘অমর কথা’, ‘যার আছে হৃদয় পটে’ এবং ‘স্মৃতি আলাপনে মুক্তি যুদ্ধ’। তিনি সর্বমোট ৯ টি গ্রন্থ রচনা করেছেন।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ফকির আলমগীর বামধারার রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে যান।
পরবর্তীতে মহান মুক্তিযুদ্ধে ফকির আলমগীর যোগ দেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। কণ্ঠ সৈনিক হিসেবে তিনি স্বাধীনতা কামী যোদ্ধাদের মনে ছড়িয়ে দেন বিজয়ের স্পৃহা, সাহসের আলো। ফকির আলমগীরের বয়স তখন মাত্র ২১ বছর। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের তত্ত¡াবধানে কলকতার নারিকেল ডাঙ্গায় শিল্পী গোষ্ঠীতে তিন যোগ দেন।
দেশ স্বাধীন এরপর পূর্নাঙ্গ ভাবে সঙ্গীতে মনোনিবেশ করেন ফকির আলমগীর। নিজেই গড়ে তোলেন ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠী প্রতিষ্ঠান। ফকির আলমগীরের গাওয়া সবচেয়ে জনপ্রিয় গানটির শিরোনাম ‘ও সখিনা’। গানটির প্রথম লাইন ‘ও সখিনা গেছস কিনা ভুইল্যা আমারে, আমি অহন রিশকা চালাই ঢাহা শহরে।’ ১৯৮২ সালে বিটিভিতে ঈদের আনন্দ মেলায় ‘ ও সখিনা গেছস কিনা ভুইল্যা আমারে’ গানটি প্রচারের পর দর্শকদের মাঝে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়। এই গান শোনেনি এমন শ্রোতা খুঁজে পাওয়া দুস্কর। এ ছাড়াও ফকির আলমগীরের কন্ঠ নিঃসৃত ‘ও জুলেখা’, ‘আহারে কাল্লু মাতব্বর’, ‘কালো কালো মানুষের দেশে’, ‘নাম তার ছিল জন হেনরি’ গান গুলো শ্রোতারা মনে রাখবেন চিরদিন। কেবল নিজের গান নয়, ফকির আলমগীরের গেয়েছেন প্রচলিত ফোক ও আধ্যাত্মিক গান ও। তাঁর কন্ঠে তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে ‘বনমালি তুমি’ ‘ও মন আমার দেহ ঘড়ি’ গান গুলিও। মা’কে নিয়ে লেখা তাঁর আরেকটি গান মানুষের মুখে মুখে ফিরত। ‘মায়ের একধার দুধের দাম’ এই গানটি ফকির আলমগীরের কন্ঠে একেবারে শহর-গঞ্জ- গ্রামে সবখানে ছড়িয়ে গিয়েছিল। এখনো গানটি মানুষের হৃদয়ের স্পন্দনে জায়গা করে নিয়েছে। এ ছাড়াও ‘ঘর করলাম নারে আমি’ ‘সান্তাহার জংশনে দেখা’ গাওয়া তাঁর বহু গান আশি ও নব্বইয়ের দশকে দারুণ জনপ্রিয় ছিল। দেশীয় সঙ্গীতে ফকির আলমগীরের অবদান কতখানি তা’ পরিমাপ করা অসম্ভব। তবে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি দিয়েছিল সরকার। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে ১৯৯৯ সালে তাঁর হাতে তুলে দেয়া হয় সম্মান জনক ‘একুশে পদক’। অবশ্য পুরস্কারের চেয়েও ফকির আলমগীরের বড় প্রাপ্তি ছিল গণ মানুষের ভালোবাসা। সঙ্গীতের মাধ্যমে তিনি মানুষকে যতটা আনন্দ দিয়ে গেছেন, যতটা সাহস আর প্রতিবাদ শিখিয়ে গেছেন তা’ টিকে থাকবে যুগের পর যুগ।
গানে গানে গণ মানুষের কথা বলা থেকেই ফকির আলমগীর গেয়েছেন ‘ধোয়ায় ছেয়েছে গাজার আকাশ’ আবার সাভারে রানা প্লাজা ট্রাজেডিও তাঁর গানে এসেছে। লেনসন ম্যান্ডেলার জন্মদিন উপলক্ষে গাওয়া তাঁর গানটিও ছিল সে সময় বেশ জনপ্রিয়। ১৯৯৭ সালের মার্চে বাংলাদেশের স্বাধীনতার রজত জয়ন্তীর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে নেলসন ম্যান্ডেলা এসেছিলেন বাংলাদেশে সে সময় তাঁকে নিয়ে লেখা- ‘কালো কালো মানুষের দেশে’ গানটি শুনিয়েছিলেন ফকির আলমগীর।
ফকির আলমগীর একুশের পদক ছাড়াও শেরে বাংলা পদক, ভাসানী পদক, জসীম উদ্দিন স্বর্ণপদক, পশ্চিম বঙ্গ সরকারের সম্মাননা, সিকোয়েন্স অ্যাওয়ার্ড অব অনার, তর্ক বাগীশ স্বর্ণপদক, কান্ত কবি পদক, গণ নাট্য পুরস্কার, ঢালিউড অ্যাওয়ার্ড যুক্তরাষ্ট্র, জন সংযোগ সমিতি বিশেষ সম্মাননা, চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড বিশেষ সম্মাননা ও বাংলা একাডেমি সম্মানসূচক ফেলোশিপ পান তিনি।
গন শিল্পী হিসেবে তিনি আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। মেহনতি মানুষের জন্য গান করেছেন, লিখেছেন প্রবন্ধ, গড়ে তুলেছেন সংগঠন। সঙ্গীতের সঙ্গে রাজনীতির যে সম্পর্ক রয়েছে, রয়েছে অধিকার আদায় ও সংগ্রামের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক সেই পথকে অবলম্বন করে তিনি বাংলা গানের ধারায় নব যুগের সূচনা করেছেন। দীর্ঘ ৪৫ বছর একজন সংগঠক হিসেবে ঋষিজ নামে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের হাল ধরেছিলেন তিনি।
ফকির আলমগীর বাংলাদেশের পপ সঙ্গীতের পঞ্চ-পান্ডবের একজন। বীরমুক্তি যোদ্ধাও ছিলেন তিনি। অনেকের কাছে ‘লালভাই’ নামে পরিচিত ছিলেন তিনি। চমৎকার বাঁশি বাজাতেন। গণসঙ্গীতকে তিনি এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছেন, যেখানে আধুনিক যন্ত্রাঙ্গের সাথে মিশে নতুন একটা মাত্রা তৈরি হয়েছে। আজম খান, ফিরোজ সাই, পিলু মমতাজ, ফেরদৌস ওয়াহিদ এদের সাথে ফকির আলমগীর ও তখন পপগানে উন্মাদনা ছড়িয়ে ছিলেন সর্বস্তরের শ্রোতাদের মাঝে। পপগানের স্থানে খেটে খাওয়া মানুষের কথাও তুলে ধরেছেন তাঁর গানে। হতভাগ্য, নীপিড়িত, বঞ্চিত, মেহনতি মানুষের গান ও ছিল তাঁর কন্ঠে। পয়লা মে’ আসলেই বিভিন্ন টেলিভিশনের চ্যানেলে তাঁকে সরব দেখা যেতো। তাঁর এই গান গুলো রাজনৈতিক সামাজিক সাংস্কৃতিক, নিপীড়িত, বঞ্চিত, শোষণ, নির্যাতন, অত্যাচার, অনাচারের বিরুদ্ধে গণ মানুষকে উদ্দীপ্ত করতো। তিনি ছিলেন গণ সঙ্গীতের রূপকার ও প্রাণ পুরুষ।
২০২১ সালের ১৪ জুলাই সঙ্গীত শিল্পী ফকির আলমগীরের করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরাপড়ে। শ্বাস কষ্ট বাড়তে থাকলে পরদিন তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ফুস্ফুস সংক্রমণের পাশাপাশি রক্তে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে তাঁর। ২০২১ সালের ২৩ জুলাই রাত সাড়ে নয়টার দিকে হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। করোনার কাছে চিরদিনের মতো হেরে গেলেন কিংবদন্তী সঙ্গীত শিল্পী ফকির আলমগীর। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭১ বছর (১৯৫০-২০২১ খ্রি.)। স্ত্রী সুরাইয়া আলমগীর এবং তিন ছেলে রেখে গেছেন ফকির আলমগীর। আমরা তাঁর আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।
সঙ্গীতের মাধ্যমে তিনি মানুষকে যতটা আনন্দ দিয়ে গেছেন, যতটা সাহস আর প্রতিবাদ শিখিয়ে গেছেন তা’ টিকে থাকবে যুগের পর যুগ। আর গণ সঙ্গীতের নায়ক হয়ে ফকির আলমগীর থেকে যাবেন দেশের ইতিহাসের স্বর্ণালী পাতায় চিরদিন ও অনন্তকাল।
লেখক : সাহিত্যিক, কলামিস্ট, গবেষক, ইতিহাসবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা।
২৩ জুলাই মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণে : পপ সঙ্গীত ও গণ সঙ্গীত শিল্পী ফকির আলমগীর
জুলাই ১৫, ২০২৫


































