আজহারুল আজাদ জুয়েল :
৬ জানুয়ারি ১৯৭২, সন্ধ্যা। সূর্য তখন অস্তগামী। আকাশে লাল আভা। ঠিক এমনি সময় অকষ্মাৎ প্রচন্ড বিস্ফোরণে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হলো মহারাজা স্কুল। স্কুলের দ্বিতল ভবন গুড়িয়ে গেলো। মাঠের যে স্থানটিতে অস্ত্র ভান্ডার ছিলো, সেটি বিরাট খালে পরিণত হলো। সে খালে উঠে এলো পানি। আর গোটা আকাশ, গোটা মহারাজা স্কুল প্রাঙ্গণ অন্ধকারে ঢেকে গেলো। স্কুলের বিশাল এলাকা এবং এর চারপাশে নিহত আর আহত মানুষের পোড়া গন্ধে ভয়ঙ্কর এলাকায় পরিণত হলো ট্রানজিট ক্যাম্প। এখান থেকে ৮০—৯০ কিলোমিটার দূরের লোকও বিকট একটি শব্দের সঙ্গে সঙ্গে বিশাল অগ্নিকুন্ড দেখতে পেলো। এই অকষ্মাৎ বিস্ফোরণ শুধু মহারাজা স্কুল প্রাঙ্গণ নয়, গোটা দিনাজপুর শহরকে ভূমিকম্পের মতো কাঁপিয়ে দিয়েছিল।
কেমন করে এই বিরাট দূর্ঘটনা সেদিন ঘটেছিলো, তার সঠিক ব্যাখ্যা আজো পাওয়া যায়নি। তবে বিভিন্ন সূত্রে এবং অনেকের লেখা থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায় যে, মুক্তিসেনাদের ট্রানজিট ক্যাম্প স্থাপনের পর প্রতিদিন বিভিন্ন স্থান হতে পরিত্যক্ত অস্ত্র, গোরাবারুদ উদ্ধার করে মহারাজা স্কুল প্রাঙ্গণে এনে রাখা হতো। অন্যান্য দিনের মতোই ১৯৭২ সালের ৬ জানুয়ারী তারিখেও উদ্ধারকৃত বিপুল সংখ্যক অস্ত্র ও গোলাবারুদ দুইটি ট্রাকে করে (কারো কারো মতো তিনটি ট্রাকে) মহারাজা স্কুলে আনা হয়। ট্রাক থেকে অস্ত্র খালাসের কাজ শুরু হয় বিকেল ৪ টায়। বাংকার বা অস্ত্র ভান্ডার থেকে ট্রাকের দূরত্ব ছিলো ১০০ গজ এর মত। এই ১০০ গজের মধ্যে বেশ কিছু মুক্তিযোদ্ধা ফলিংরত অবস্থায় লাইনে দাঁড়ানো ছিলেন। তাঁরা ট্রাক থেকে অস্ত্র নামিয়ে হাত বদলের মাধ্যমে বাংকারে রেখে দিচ্ছিলেন। সাধারনত এ ভাবেই এক মুক্তিযোদ্ধার হাত হতে অপর মুক্তিযোদ্ধার হাতে দিয়ে উদ্ধারকৃত অস্ত্র প্রতিদিন ট্রাক হতে নামিয়ে বাংকারে রাখা হতো।
১৯৭২ সালের ৬ জানুয়ারীতেও একইভাবে অস্ত্র রাখা হচ্ছিলো। কিন্তু সেদিন হাত বদলের সময় একজন মুক্তিযোদ্ধার কাছ থেকে একটি মাইন পড়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে মাইনটি বিস্ফোরিত হয়। বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গেই বাংকারে মজুত রাখা পুরো অস্ত্র ভান্ডার বিস্ফোরিত হয়ে ব্যাপক ধ্বংসলীলা সাধন করে । অস্ত্রভান্ডার বিস্ফোরণের কারণে ট্রানজিট ক্যাম্পে উপস্থিত কয়েকশ’বীর মুক্তিযোদ্ধার অকাল মৃত্যু ঘটে।
দুর্ঘটনার সময় ঠিক কত জন মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে উপস্থিত ছিলেন তার সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সকালে রোল কলের সময় ৭৮০ জন মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে উপস্থিত ছিলেন। তারপর অনেকেই ২—১ দিনের ছুটি নিয়ে বাবা—মা—স্ত্রী—সন্তানদের সাথে দেখা করার জন্য ক্যাম্প ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। ক্যাম্প ছেড়ে চলে যায় কত জন? তাও জানে না কেউ। তাই দুর্ঘটনার সময় ক্যাম্পে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বলা কঠিন।
দুর্ঘটনার পরপরই জনতা উদ্ধার কাজে নেমে পড়েছিলেন। কিন্তু সে সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ঘন অন্ধকারের ভেতর ধ্বংসস্তুপ থেকে উদ্ধারকাজ চালানো কষ্টকর ছিলো্। পরে ভারতীয় মিত্র বাহিনী উদ্ধার কাজে যোগ দেয়। গাড়ির লাইট জ্বালিয়ে এবং টর্চ, হ্যাচাক ও লণ্ঠনের আলোয় রাতভর উদ্ধার কাজে সর্বস্তরের মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। পরদিন প্রথমে ৮৬ জনের, পরে আরো ২১ জনের লাশ চেহেলগাজী মাজার প্রাঙ্গণে দাফন করা হয়। লাশগুলোর অধিকাংশ ছিন্ন—বিচ্ছিন্ন ছিলো। কারো হাত, কারো মাথা জোড়া লাগিয়ে একেকটি লাশের আদল দেয়া হয়েছিল। সবগুলো লাশই ছিলো মুক্তিযোদ্ধাদের। ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৪ মণ গলিত, পোড়া, অর্ধ পোড়া, ছিন্ন—বিচ্ছিন,œ ঝলসানো মাংসের টুকরো উদ্ধার করা হয়। এই মাংসও দাফন করা হয় মুক্তিযোদ্ধাদের লাশের সাথে। হত, পা, মাথা জোড়া লাগিয়ে লাশ প্রাপ্তর সংখ্যা কম হলেও নানান বিশ্লেষণ থেকে মনে করা হয় যে, ঐ ট্রাজেডিক দূর্ঘটনায় অর্ধ সহমুক্তি সেনা শহীদ হয়েছিলেন।
এত বিপুল সংখ্যক মুক্তি বাহিনীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল বাঙালির চুড়ান্ত বিজয়ের পর, স্ধীন বাংলাদেশে। স্বাধীন বাংলাদেশে এত বড় ট্রাজেডি আর কোথাও হয়নি। এক সঙ্গে কয়েকশ বিজয়ী মুক্তিযোদ্ধার প্রাণ ঝরে যাওয়ার এতো বড় মর্মান্তিক, হৃদয়বিদারক ঘটনা অকল্পনীয় ছিলো। যে মুক্তিযোদ্ধারা ঘরে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, বাংলার স্বাধীন মাটিকে নিরাপদ করতে সক্রিয় ছিলেন, তাদের এ প্রাণ বিসর্জন বেদনার চেয়েও বেদনাদায়ক।
আজ বাংলাদেশে নতুন এক প্রেক্ষাপট তৈরী হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে দেয়ার একটি চক্রান্ত চলছে। মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের মূল্যায়নের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী চক্র যে ষড়যন্ত্র শুরু করেছে, তা রুখে দেয়ার মধ্য দিয়েই মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্নের বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।
লেখক : আজহারুল আজাদ জুয়েল, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক লেখক, গবেষক, ০১৯০২০২৯০৯৭।
৬ জানুয়ারি: ভয়ংকর দুর্ঘটনার বেদনাময় সন্ধ্যা
জানুয়ারি ৬, ২০২৬


































