মো. জোবায়ের আলী জুয়েল :
দেশ বিভাগের পূর্বকাল থেকেই দিনাজপুরে সঙ্গীত, সাহিত্য, শিল্প, নাটক, অভিনয়, নৃত্য ইত্যাদি সুকুমার কলার প্রায় প্রতিটি দিক সৃষ্টিশীল স্বকীয়তায় ভাস্বর। দিনাজপুর মহারাজাদের সঙ্গীত প্রীতি, নাট্য শিল্প, পৃষ্ট পোষকতার অবদান কোহিনুর থিয়েটার, হরিচরণ সেন ও সম্পদায়ের “ডায়মন্ড জুবিলী হল (১৯০৪ খ্রি), ও জনগণের পাল্টা প্রতিবেশী প্রতিষ্ঠান “দিনাজপুর নাট্য সমিতি (১৯১৩ খ্রি.)”, জনগণের দিপালী উৎসব সহ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের স্বতঃস্ফুর্ত অবদান দিনাজপুরে একটি স্বর্ণ যুগের সূচনা করেছিল। উত্তরাধীকার সূত্রে জন্ম নিয়েছিল স্ব-স্ব প্রতিভায় উজ্জ্বল এক ঝাক লেখক, শিল্পী, নাট্যকার, কুশলী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। তারই ধারাবাহিকতায় প্রথিত যশা নাট্যকার, স্বনামধন্য অভিনেতা, জাতীয় পুরষ্কার প্রাপ্ত নাট্যকার, নির্দেশক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, ঐতিহ্যবাহী দিনাজপুরের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান নবরূপীর দীর্ঘদিনের সাধারণ সম্পাদক, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সংগঠক, সুবক্তা, প্রাবন্ধিক, গবেষক শাহজাহান শাহ ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দের ২১ ফেব্রæয়ারি (৯ ফাল্গুন ১৩৫২ বঙ্গাব্দ) দিনাজপুর জেলার বিরল উপজেলার মোখলেসপুর গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। পিতা শাহ মো. ইসহাক ও মাতা জয়নব খানম। ৪ কন্যা ও ২ পুত্রের মধ্যে শাহজাহান শাহ ছিলেন পিতার দ্বিতীয় এবং জ্যেষ্ঠ্য পুত্র।
বর্তমানে পরিবারটির স্থায়ী নিবাস দিনাজপুর শহরের গণেশতলায় সূর্দীঘ প্রায় ৬০ বছরের অধিক সময় ধরে তিনি বাস করেছেন শহরের প্রাণ কেন্দ্রের এই বাড়িটিতে। ৪৭ এর দেশ বিভাগ, তেভাগা ও কমিউনিস্ট আন্দোলন, রবীন্দ্র জন্ম শতবর্ষ উদযাপন, শিক্ষা-সংস্কৃতি আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ তথা দিনাজপুরের সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক জগতের নানা ঘটনা আর বহুগুণী মানুষের আগমনে ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে বাড়িটি।
দিনাজপুর শহরের সেন্ট যোসেফ্স স্কুলে (১৯৫১ খ্রি. স্থাপিত) শিক্ষা জীবন শুরু হয় তাঁর। এই স্কুলে তিনি ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। পরবর্তীতে দিনাজপুর মিউনিসিপ্যাল হাইস্কুল (বাংলা স্কুল স্থাপিত ১৮৫৭ খ্রি.) ষষ্ঠ শ্রেণি, দিনাজপুর জিলা স্কুল (১৮৫৪ খ্রি. স্থাপিত) থেকে ম্যাট্রিকুলেশন সম্পন্ন করেন। দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজ (১৯৪৬ খ্রি. স্থাপিত) থেকে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। দিনাজপুর আইন মহাবিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী হিসেবে এল.এল.বি ডিগ্রী ও অর্জন করেছিলেন তিনি। শাহজাহান শাহ স্কুল জীবন থেকেই তৎকালীন শিশু কিশোরদের সংগঠন “মুকুল ফৌজে” যোগদান করেন। শৈশব থেকে তিনি অঙ্কন শিল্পের প্রতিও আকৃষ্ট হন। সে ধারাবাহিকতায় দিনাজপুরে প্রকাশিত বই, পত্র পত্রিকার প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করেছেন নিষ্ঠার সাথে। সেন্ট যোসেফ্স স্কুলে বার্ষিক সাংস্কৃতিক সপ্তাহে শেকস্পিয়রের “এ মিড সামার নাইট ড্রিম” ও হাসির নাটক “বোকা চাকর” দিয়েই তার বাল্যকালে নাট্যচর্চা শুরু হয়। সপ্তম শ্রেণি থেকেই শাহজাহান শাহ জিলা স্কুলে দেশখ্যাত নাট্যকার, শিক্ষক ও কবি কাদের নেওয়াজ, তাজমিলুর রহমান, শাহাদাত হোসেন, গোপাল চন্দ্র ভট্টাচার্য প্রমূখদের লিখিত ও পরিচালিত বিভিন্ন নাটকে অংশ গ্রহণ করে খ্যাতিমান হয়ে ওঠেন কিশোর শাহজাহান শাহ। সেই ধারাবাহিকতায় দিনাজপুর শহরের সংস্কৃতির চর্চার পাদপীঠ সুরেন্দ্র নাথ কলেজে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠােেনর গ্রন্থনা উপস্থাপনা ও পরিবেশনায় তিনি পরিপক্ক হয়ে ওঠেন। কলেজের বার্ষিক সাংস্কৃতিক সপ্তাহে ইংরেজী, বাংলা উর্দূ নাটকগুলো তাঁকে যেভাবে সমৃদ্ধ করেছিল, তাতে অচিরেই তিনি নিজেই নাটক লেখার মতো দুরূহ কাজটি সে সময় সম্পাদন করেছিলেন। তিনি কলেজ জীবনের মজার ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রেম প্রহসন মূলক হাসির নাটক “কার টোপে?” লিখে নাট্য মহলে খ্যাতি অর্জন করেন। কলেজ জীবন থেকেই তিনি নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় (১৯১৮-১৯৭০ খ্রি.) রচিত “ভাড়াটে চাই” নাটকে গাবলু, ইংরেজি নাটক “পম্পাপুর ফিমস্ আনলিমিটেড” ও “চাকর বিভ্রাট” নাটকে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করে সূখ্যাতি অর্জন করেন। এছাড়াও পরবর্তীতে তাঁর অভিনিত ও পরিচালিত নাটক গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- “সবুজ ঢেউ”, দুই এর পিঠে এক শূন্য”, “রক্ত স্বাক্ষর”, “লালুভূলু”, “ভাড়াটে চাই”, “কলির জ্বীন” ইত্যাদি।
পরবর্তীতে দিনাজপুরের আর্যপুস্তকাগারে যোগ দিয়ে প্রভাতদাশ গুপ্তের পরিচালনায় “প্রবেশ নিষেধ”, “নাম নেই” সহ আরও কয়েকটি নাটকে অভিনয় করেন।
১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে দিনাজপুরে নব নাট্য আন্দোলনের পথিকৃৎ প্রতিষ্ঠান “নবরূপী’র সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন শাহজাহান শাহ এবং তৎকালীন গণ অভ্যূত্থানের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড বেগবান করেন।
১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন পাকিস্তানী সামরিক জান্তা কতৃক বেতারে রবীন্দ্র সঙ্গীত প্রচার নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ স্বরূপ দিনাজপুর শহরের প্রায় প্রতিটি মহল্লায় রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্ত জয়ন্তী সহ নানা প্রকার অনুষ্ঠান পরিবেশিত হতে থাকে। এ সকল অনুষ্ঠানে তিনি সে সময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। দিনাজপুর তারই নেতৃত্বে সে সময় রবীন্দ্র জন্ম শত বার্ষিকী উৎসব আয়োজন করা হয়েছিল। ১৯৬৯ এর গণ অভ্যূত্থানের প্রাককালে মাওলানা ভাসানীর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সমাবেশে নাটক পরিবেশনায় তিনিও ছিলেন অভিনেতাদের একজন।
মুক্তিযুদ্ধের প্রাককালে ১১দফা আন্দোলনে দিনাজপুরের সকল সাংস্কৃতিক সংগঠন গুলোকে একত্রিত করেন শাহজাহান শাহ। নাট্যকার মমতাজ উদ্দীন রচিত “আলোর পথ যাত্রী” নাটক ও পূর্ব বাংলার স্বাধীকার ও স্বাধীনতার পক্ষে পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, বীরগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে দেশাত্ববোধক জারিগানের উদ্যোগ গ্রহণ করেন তিনি। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ভারতের বিভিন্ন শহরে ক্যাম্পে ক্যাম্পে স্বাধীনতার পক্ষে প্রচারাভিযান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চালিতে যেতে থাকেন। পশ্চিম বঙ্গের কালিয়াগঞ্জে ১০ ডিসেম্বর ১৯৭১’ এ স্বাধীন বাংলা শিল্পী সংসদ” নামে একটি প্রতিষ্ঠানের তিনি সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। সেই সংসদের সভাপতি ছিলেন স্বনামধন্য তুষার কান্তি সরকার। বিজয় উৎসব উদযাপনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সম্পাদক শাহজাহান শাহের বক্তৃতা শুনে সকলে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
স্বাধীনতার পরে তিনি দিনাজপুর নাট্য সমিতির পরিচালক হিসেবে “অন্ধকারের আয়না”, “ভূমিকম্পের আগে”, “ইতিহাসের মৃত্যু” প্রভৃতি নাটকে তাঁর কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। ইতিমধ্যে তাঁর হাত ধরেই ঐতিহ্যবাহী নবরূপী দিনাজপুর শহরের তথা বাংলাদেশের সংস্কৃতি চর্চার আদি পীঠে রূপান্তরিত হয়েছে। বহু প্রাচীন সভ্যতার লীলাভূমি এই দিনাজপুর। বাংলাদেশের মানচিত্রের উত্তর প্রান্তে দিনাজপুরের অবস্থান। দিনাজপুরের প্রকৃতির উদারতা ও মানুষের সরলতা বিনি সুতোয় গাঁথা মালায় সৃষ্টি করেছে এক ঐতিহ্যময় মানবিক বৈশিষ্ট্য। বাঙালি সংস্কৃতি ছয়হাজার বছর বা তারও বহু আগে জন্ম নিয়েছিল, তার বুনিয়াদ যেমন প্রাচীন তেমনি ঐতিহ্যময়। বাঙালি মূলত একটি সংকর জাতি। তাই বিভিন্ন সংস্কৃতির মিশ্রণে গড়ে উঠেছে বাঙালি সংস্কৃতি।
দিনাজপুর নাট্য মঞ্চে দিনের পর দিন একের পর এক নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে তাঁর ও তাঁর নাট্য সারথিদের মাধ্যমে। এ সময় তিনি “অন্ধকারে একজন”, “সামনের পৃথিবী”, “কালিন্দী”, “জান দেব জবান দেব না”, “ক্যাপ্টেন হুররা”, প্রভৃতি নাটকে অভিনয় করে দিনাজপুর নাট্যাকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রে পরিণত হন।
১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ শিল্প কলা একাডেমী আয়োজিত প্রথম জাতীয় নাট্যোৎসবে নবরূপী শাহজাহান শাহ রচিত ও পরিচালিত “ইত্যাদি ধরণের প্রভৃতি” নাটকটি মঞ্চস্থ করে পুরুস্কৃত হয়। জাতীয় নাট্যোৎসব ১৯৯১ এ নবরূপী ঢাকা শিল্পকলা একাডেমী মঞ্চে শাহজাহান শাহ রচিত “বেহান কান্দে যেই আন্ধারে’ নাটকটি প্রদর্শন করে ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করেন। উনসত্তর খ্রিষ্টাব্দ থেকে মৃত্যু অবধি (মৃত্যু ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭ খ্রি.) প্রায় অর্ধ শতাব্দী তিনি নবরূপীর সফল সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন নিষ্ঠার সাথে।
জন্মলগ্ন থেকে দিনাজপুর “নবরূপী”, “নবরূপী সুরবানী শিক্ষা কেন্দ্র”, সঙ্গীত ও বাদ্য যন্ত্র বিষয়ের উপর প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। নাটকের ক্ষেত্রে নবরূপীর খ্যাতি কিংবদন্তী তুল্য। এছাড়াও চারুকলা ও নৃত্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে সুনামের সাথে। নৃত্য পরিবেশনায় দিনাজপুর নবরূপীর ভূমিকা পথিকৃতের মতো। জাতীয় প্রতিটি অনুষ্ঠান ও ঋতু ভিত্তিক পরিবেশনা, বিশ্বকবি ও জাতীয় কবির জন্ম ও মৃত্যু বার্ষিকীতে রবীন্দ্র -নজরুল জয়ন্তী অনুষ্ঠান পালন, সাহিত্য আসর ও মাসিক সঙ্গীতের শ্রোতার আসর এবং গুনীজন সংবর্ধনা অনুষ্ঠান পরিবেশন করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত ভাবে। শাহজাহান শাহ ও দিনাজপুরবাসীর প্রাণের “নবরূপী” এ প্রতিষ্ঠানটি গৌরবজ্জ্বল ৫৫ বছর পেরিয়ে সামনে এগিয়ে চলেছে সাফল্যের সাথে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে এরই ধারাবাহিকতায় দীর্ঘ প্রায় ৫০ বছর (১৯৬৯-২০১৭ খ্রি.) শাহজাহান শাহ দিনাজপুর নবরূপীর সাধারণ সম্পাদক পদে নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করে গেছেন। পাশাপাশি তিনি জেলা শিল্প কলা একাডেমীর প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মিলন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক খাজা নাজিমুদ্দিন মুসলিম হল ও লাইব্রেরীর কার্য নির্বাহী পরিষদের সদস্য, এফ.পি.এ.বি এর সহ সভাপতি, দিনাজপুর ইন্সটিটিউটের সহ-সভাপতি, পল্লী শ্রী দিনাজপুরের কার্যকরী কমিটির সাবেক ভাইস চেয়ারপারসন, বিরল ডিগ্রি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যও পরবর্তীতে সভাপতি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, দিনাজপুরের সহ-সভাপতি ও পরে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জেলা খেলাঘর আসর, উত্তর তরঙ্গ সাহিত্য পর্ষদ ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন “স্বাধীন” এর উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করে গেছেন। শাহজাহান শাহ সমতল আদিবাসীদের প্রথম সাংস্কৃতিক দলের প্রতিষ্ঠাতা, যে দলটি ঢাকায় ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে আদিবাসী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করে। ১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দে ঐতিহাসিক “সাওতাল বিদ্রোহের” ওপর তাঁর রচিত “হুলহুল” নাটক ওই বিদ্রোহের এক প্রাণবন্ত দলিল।
ছাত্র জীবন থেকেই বাম রাজনীতির সাথে সম্প্ক্তৃ ছিলেন শাহজাহান শাহ। বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী ছিলেন তিনি। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে ১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দে বিরলের সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হন। তিনি গর্ব করে বলতেন “আমি চেয়ারম্যান হওয়ার জন্য এক টাকাও খরচ করিনি। কারন আমার সব খরচ গ্রামের মানুষ জুগিয়েছে”। এতেই বোঝা যায় নিজ গ্রামের মানুষের কাছে তিনি কতটা জনপ্রিয় ছিলেন।
উল্লেখ্য তাঁর তেইশ বছর বয়সে তিনি পিতাকে হারান। পিতার মৃত্যুর পর বড় ছেলে হিসেবে পরিবারের দায়িত্ব এসে বর্তায় তাঁর উপর। সামন্ততান্ত্রিক কাঠামো ভিত্তিক তাঁর পরিবারের আয়ের উৎস ছিল কৃষি। শিল্প সংস্কৃতি চর্চার পাশাপাশি কৃষি কর্মের এই পেশায় তিনি নিজেকে অত্যন্ত গৌরবান্বিত মনে করতেন।
শাহজাহান শাহ রচিত ও নির্দেশিত নাটকগুলির মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হলো- ১) অন্ধকারে একজন, ২) আত্মহননের গান, ৩) ক্ষুধা, ৪) জানদেব জবান দেব না, ৫) ইত্যাদি ধরণের প্রভৃতি, ৬) বেহান কান্দে যেই আন্ধারে, ৭) আবহমান বাংলা, ৮) রাম সাগর, ৯) বিহঙ্গী বোন আমার, ১০) বাড়ি এলো ইয়াসমিন, ১১) বুলেট বৃদ্ধ ইতিহাস ১২) বিপ্লব হে সুন্দর, ১৩) একুশের পালা (যাত্রা), ১৪) পৃথিবী আমার পৃথিবী, ১৫) হুলহুল, ১৬) ফিরে আয় মাটির কোলে, ১৭) কার টোপে?, ১৮) রক্ত গোলাপের, যাদুকর (রচনা সৈয়দ শামসুল হক নাট্য রূপ শাহজাহান শাহ), ১৯)বির্বণ , ২০) এও সম্ভব, ২১) তারপর, ২২) ঝাঁসীর রানী, ২৩) আগুনের উৎস্য ও ২৪) নজরুল ও নুরজাহান।
প্রকাশনা গ্রন্থঃ মুক্তিযুদ্ধ দিনাজপুরÑ শাহজাহান ও মাসুদুল হক
সম্পাদনাঃ ১) উদীচী (এস. এন. কলেজ বার্ষিক সাহিত্যপত্র)
২) নবরূপী (নবরূপী সূর্বণ জয়ন্তী প্রকাশনা)
৩) মৃত্যুহীনঃ ইয়াসমীন (যৌথ সম্পাদনা)
৪) কবিতা নয় কাল ¯্রাোত (যৌথ সম্পাদনা)
৫) শাহনেওয়াজ ঝন্টু (স্মারক পত্র)
প্রাপ্ত সম্মননা ও পুরষ্কারঃ ১) ১৯৭৬-৭৭ খ্রিষ্টাব্দে শিল্প কলা একাডেমী আয়োজিত জাতীয় নাট্যোৎসবে তাঁর রচিত নাটক “ইত্যাদি ধরনের প্রভৃতি” জাতীয় পুরষ্কারে ভূষিত হয়। “ইত্যাদি ধরনের প্রভৃতি” নাটকটি ঐ বছরেই (১৯৭৭খ্রি.) বাংলা দেশ টেলিভিশনে ও রেডিওতে নবরূপী শিল্পী গোষ্ঠীর দ্বারা অভিনীত ও প্রচারিত হয়।
২) রংপুর নাট্যচক্র আয়োজিত আন্তঃজেলা নাট্যোৎসব ৯৩’ এ শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে পুরষ্কৃত হয়।
৩) অ্যামেচার থিয়েটার এসোসিয়েশন কর্তৃক “থিয়েটার অ্যাওয়ার্ড”-২০০৪ খ্রি.
৪) জেলা শিল্প কলা একাডেমী সম্মাননা- ২০১৫ খ্রি.
৫) বটতলা সম্মাননা- ২০১৬ খ্রি.
শাহজাহান শাহ ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বরিশাল, যশোর, কুষ্টিয়া, কুমিল্লা, চাঁদপুর, রংপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, রাজশাহী, খুলনা, পটুয়াখালী, নড়াইল, জয়পুর হাট, বগুড়া, নীলফামারী অঞ্চলে নাটক ও রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মিলনে পরিষদের বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপলক্ষে ব্যাপক ভ্রমণ করেন।
১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুরের বিভিন্ন অঞ্চলে শরনার্থী শিবির ও মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পসমূহে তাঁর নেতৃত্বে নবরূপী সহ বিভিন্ন সংগঠনের শিল্পীরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ধুদ্ধ করণের লক্ষ্যে গান ও নাটক সহ নানা মুখী সাংস্কৃতিক পরিবেশনার আয়োজন করেছিলেন।
২০১১ খ্রিষ্টাব্দের ২১ ফেব্রæয়ারি মূর্শিদাবাদ “বরকত কেন্দ্র” অমর একুশে প্রসঙ্গে শাহজাহান শাহ এক হৃদয় গ্রাহী বক্তৃতা করেন।
২০০৬ খ্রিষ্টাব্দে অক্সফ্যাম এর উদ্যোগে “আন্তর্জাতিক নারী দিবস” উপলক্ষে আয়োজিত ৭ দেশীয় কনভেনশনে বাংলাদেশ দলের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি শ্রীলংকার রাজধানী কলম্বো সফর করেন। এছাড়াও তিনি ব্যক্তিগত সফরে ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দে ভুটান গমন করেন।
শাহজাহান শাহ যখন নবরূপীর সফল সাধারণ সম্পাদক ছিলেন (১৯৬৯-২০১৭ খ্রি.) তখন দেশ ও বিদেশের গুনীব্যক্তি, বরেণ্য শিল্পী, সাহিত্যিক, কবি, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব যারা নবরূপীতে পদার্পন করেছেন ও ধন্য করেছেন প্রতিষ্ঠানটিকে এবং যাঁদের সান্নিধ্যে শাহজাহান শাহ ও নবরূপী ধন্য হয়েছে তাদের মধ্যে উল্লেখ যোগ্যরা হলেন – কথাসাহিত্যিক শওকত আলী, শামসুজ্জামান খান, আবুল হাসনাত, রফিক আজাদ, হাসান আজিজুল হক, শাহেদ কামাল, চলচ্চিত্রকার সুভাষ দত্ত, জাদুকর জুয়েল আইচ, কুমার বিশ্বজিৎ, সংবাদ পাঠক সরকার কবির উদ্দীন, এ্যান্ড্রু কিশোর, ফিরোজ সাই, কামাল লোহানী, মোস্তফা জামান আব্বাসী, গাজীউল হক, আজিজুল হাকিম, মামুনুর রশীদ, হুমাযুন ফরিদী, রইসুল ইসলাম আসাদ, নাসির উদ্দীন ইউসুফ, বেগম মমতাজ হোসেন, সৈয়দ আবুল মকসুদ, খাদেমুল ইসলাম বসুনিয়া, খোন্দকার আলী আশরাফ, কবি শামসুর রহমান, ফরহাদ মোজাহার, ভিক্টর ব্যানার্জী, নিলীমা ইব্রাহীম, ড. হায়াৎ মামুদ, পুরবী বসু, নাজমা আনোয়ার, শিমুল ইউসুফ, শামীম আরা নিপা, শিবলী মোহাম্মদ, বুলবন ওসমান ও জ্যোতি প্রকাশ দত্ত সহ আরো অসংখ্য গুণী ব্যক্তি।
পরিবার ভাবনায় শাহজাহান শাহ ছিলেন সমবায় ভিত্তিক ও একান্নবর্তী। রবীন্দ্র পরিবারের মতো বিশাল লট বহর নিয়ে থাকতে তিনি সব সময় ভালবাসতেন। তাঁর সহধর্মিনী সুরাইয়া বেগম, একমাত্র কন্যা সিফাত-ই-জাহান শিউ, পুত্রদ্বয় হলেন শাহ মো: শিহাব ও শাহ্ মো. নিশতার জাহান। মা বোনসহ পরিবারের অনেকেই তাঁর সঙ্গে একই অন্নে পালিত ও বসবাস করে গেছেন। সেই সঙ্গে তাঁর সহোদর ভাই শাহ মো. জালাল, স্ত্রী রহিমা বেগম ও তিন সন্তান শোয়েব, শিশির, শামস্ ও একই পরিবারের অর্ন্তভূক্ত রয়েছে আজও।
প্রথিত যশা নাট্যকার, নাট্য পরিচালক, অভিনেতা, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, মুক্তিযুদ্ধের শব্দ সৈনিক ও সংগঠক শাহজাহান শাহ ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দে (২১ ভাদ্র ১৪২৪ বঙ্গাব্দ) ভোর ৪ টা বেজে ৪৫ মিনিটে দিনাজপুর জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল এন্ড রিসার্চ ইন্সটিটিউটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাহী রাজিউন) তিনি দীর্ঘ দিন ধরে লিভার ক্যান্সারে ভূগছিলেন। মৃত্যু কালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭১ বছর (১৯৪৬-২০১৭ খ্রি.)। আজ তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে (৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭ খ্রি. মৃত্যু) তাঁকে জানাই হৃদয়ের অফুরন্ত ভালবাসা। তাঁর আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।
(লেখক : কলামিষ্ট, সাহিত্যিক, গবেষক, ইতিহাসবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা )।
নন্দিত নাট্যকার, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শাহজাহান শাহ্ ও নবরূপী (৫ সেপ্টেম্বর শাহজাহান শাহ্রে সপ্তম মৃত্যু বার্ষিকী স্মরণে) :
জানুয়ারি ১১, ২০২৫


































