মো. জোবায়ের আলী জুয়েল :
পৃথিবীব্যাপী মহামূল্যবান হীরক খন্ড আজও মানুষের কাছে অত্যন্ত আকর্ষনীয় ও লোভনীয় অলঙ্কার হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে। রাজকন্যার মাথার মুকুটে, নববিবাহিত বর ও বধূর হাতের আংটি অথবা অপরুপ সুন্দরী কোনো রমণীর গলায় পরা অলঙ্কারটি তখনই সার্থক হয়ে ওঠে যখন তাতে বসানো থাকে মহামূল্যবান চকচকে এক টুকরো হীরক খন্ড। প্রেম ও প্রণয়ের প্রতীক হিসেবে হীরাকে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় অলঙ্কারে পরিণত করেছে। প্রাচীনকাল থেকে রোমানরা হীরক খন্ডকে তাদের জীবনী শক্তি বলে মনে করে আসছে। হীরক হলো সুন্দরী রমণীদের সবচেয়ে আকর্ষনীয় বস্তু। মধ্য যুগে, যুদ্ধ বিগ্রহ অথবা জাদুটোনার মোকাবিলার জন্য সে আমল থেকে হীরাকে একটি অত্যন্ত কার্যকর শক্তি বলে গণ্য করা হতো। রাজা-বাদশাহরা তাদের মুকুটে বা তরবারির বাঁটে হীরকখচিত পাথর ব্যবহার করতেন। বীর হায়দার আলীর পুত্র মহিশুরের টিপু সুলতান তার তঁরবারির বাঁটে হীরকখচিত পাথর ব্যবহার করেছেন। চিকিৎসা শাস্ত্রেও সে যুগে এ পাথরটির বিস্তর ব্যবহার দেখা গেছে।
প্রতি বছর বিশ্বে হাজার হাজার কোটি ডলারের হীরা অলঙ্কার হিসেবে ব্যবসা হয়ে আসছে। বিশ্বে ‘ডি. বিয়ার্স’নামক কোম্পানি তাদের উৎপাদিত হীরার সবচেয়ে বড় বাজার দখল করে রেখেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার‘কিমবারলি হীরক খনি’পৃথিবীর মধ্যে সর্ববৃহৎ হীরক খনি হিসেবে বিশ্বে পরিচিতি লাভ করেছে। পৃথিবীর শতকরা ৬০ ভাগ হীরা উত্তোলন করা হয় এ দক্ষিণ আফ্রিকার কিমবারলি হীরক খনি থেকে। যুগে যুগে হীরা আবার দূর্ভাগ্যও ডেকে এনেছে অসংখ্য রাজা-বাদশাহর জীবনে। এটি ধারণ করে থাকা অবস্থায় মুত্যুবরণ করেছেন অনেকেই। অতীতে অনেক সম্রাজ্ঞী হীরার অঙ্গুরী ধারণ করে যুদ্ধক্ষেত্রে হাজির হতেন। যুদ্ধবিগ্রহে পরাজিত বা সতীত্ব হারানোর ভয়ে তাৎক্ষণিক হীরা চুম্বন করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তেন। চিতর রানী কর্ণবতী এভাবেই যুদ্ধ ক্ষেত্রেই জহরব্রতে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন। পৃথিবীতে নীলাভ সাদা বর্ণের হীরা বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান হীরা বলে পরিচিত। এরপরেই রয়েছে সবুজ, হলুদ ও বাদামি রঙের হীরার অবস্থান। হীরা একটি মূল্যবান অলঙ্কারে পরিণত হওয়ার সবচেয়ে অন্যতম কারণ হলো এর দু®প্রাপ্যতা। আসলে একটি হীরাকে কতটা নিপুণ দক্ষতার সঙ্গে কাটা হয়েছে তার উপরই নির্ভর করে এর প্রকৃত গুণাগুণ ও সঠিক মূল্য। আমাদের দেশের ধনীর গৃহে ও বিয়ের এনগেজমেন্ট রিং-এ হীরার আংটি একটি অপরিহার্য মূল্যবান রতœ সামগ্রী হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে।
ইতিহাস কী বলে?
মোগল সম্রাট শাহজাহানের (১৬২৭-১৬৫৮ খ্রি.) অপূর্ব নিদর্শন দিলি¬র ময়ুর সিংহাসন। এটি স্বর্ণ, হীরা, চুনি-পান্না ও নানা ধরণের দুর্লভ মণি-মাণিক্য দ্বারা নির্মিত ছিল। শাহজাহানের এই ময়ুর সিংহাসনে বিশ্বখ্যাত কোহিনূর ‘হীরক খন্ড’টি বসানো ছিল। দিলি¬র সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বকালেই শিল্পাধ্যক্ষ বেবাদল খাঁর তত্ত¡াবধানে প্রায় ৮ বছর ধরে (১৬৩৪-১৬৪২ খ্রি.) প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে এর নির্মাণকার্য সম্পন্ন হয়েছিল ( আগ্রার তাজমহলের দ্বিগুণ অর্থ ব্যয়ে)। ময়ূর সিংহাসনের ৪টি পায়া নিরেট স্বর্ণ দ্বারা নির্মিত এবং ১২টি মরকতমণির স্তম্ভের ওপর এর চন্দ্রাতাপ ছাদ উপস্থাপন করা ছিল। এছাড়াও সম্পূর্ন ছাদটি উপরের দিকে স্বর্ণ দ্বারা মীনা করা হয়েছিল এবং মধ্যে মধ্যে মণি,মুক্তা নিখুঁতভাবে বসিয়ে এর ভিতরের দিকটা চুনি-পান্নার দ্বারা একেবারে মুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। প্রতিটি স্তম্ভের মাথা মণি-মাণিক্য খচিত এক জোড়া ময়ুর মুখোমুখি বসনো ছাড়াও এর প্রতি জোড়া ময়ূরের মধ্যস্থলে এক একটি স্বর্ণনির্মিত গাছ এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছিল যেন মনে হতো ময়ূর দুটি ঠোকরিয়ে গাছের ফল খাচ্ছে। হীরা, পান্না দ্বারা সুসজ্জিত ৩টি সিঁড়ির সাহায্যে সিংহাসনে উঠবার ব্যবস্থা ছিল। ১৭৩৯ খ্রিস্টাব্দে পারস্য সম্রাট নাদির শাহ ভারতবর্ষ অভিযানকালে এর সৌন্দর্র্যে পাগল হয়ে এই দুর্লভ মহামুল্যবান ময়ূর সিংহাসনটি পারস্যে নিয়ে যান। সিংহাসনটি লম্বায় ১০ ফুট, প্রস্থে ৭ ফুট এবং উচ্চতায় সর্বোচ্চ ১৫ ফুট ছিল। সম্রাট শাহজাহানের স্বর্ণনির্মিত ও নানা ধরণের মণি-মানিক্যখচিত ময়ূর সিংহাসনে এ বিশ্বখ্যাত কোহিনূর হীরক খন্ডটি অপূর্ব দ্যুতিময় হয়ে ওঠে। ১৭৩৯ খ্রিস্টাব্দে পারস্য সম্রাট (বর্তমান ইরান) দুর্ধর্ষ নাদির শাহ দিলি¬ আক্রমণ করেন এবং নগরীর প্রায় ৩০ হাজার মানুষকে হত্যা করে দিলি¬র মোগলদের ধন-ভান্ডার ও ময়ূর সিংহাসনসহ সর্বস্ব লুট করে নিয়ে যান। কিন্তু নাদির শাহ পরবর্তীকালে দেখতে পান তার লুট করা সব ধনসম্পদের মধ্যে বিশ্বখ্যাত কোহিনূর হীরক খন্ডটি অনুপস্থিত। তৎক্ষণাৎ চারদিকে তল¬াশি ও খোঁজাখুঁজির পর মোগল হেরেমের এক সুন্দরী রমণীর কাছে জানতে পারেন মোগল সম্রাট মোহাম্মদ শাহ তার পাগড়ির ভেতরে কোহিনূর লুকিয়ে রেখেছেন। ধূর্ত নাদির শাহ এক জাঁকজমকপুর্ণ রাজকীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মোহাম্মদ শাহকে দাওয়াত করেন এবং পরাজিত বাদশাহ হিসেবে তাকে তার পাগড়িটা বদল করতে বাধ্য করেন। মোগল বাদশাহ তার পাগড়ি খোলার সঙ্গে সঙ্গে তৎক্ষনাৎ কোহিনূর বেরিয়ে এলে নাদির শাহ ্ এটি দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে তার অজান্তেই মুখ ফুটে বেরিয়ে আসে কোহ-ই-নূর এই শব্দটি। এর প্রকৃত অর্থ হলো আলোর পাহাড়। সেই থেকে পরবর্তীকালে চোখ ধাঁধানো এই রতœটির নাম হয় কোহিনূর। নাদির শাহ ময়ূর সিংহাসনসহ বিশ্বখ্যাত কোহিনূর নিয়ে ফিরে যান নিজ দেশ পারস্যে। কিন্তু অদৃষ্টের নির্মম পরিহাস কিছুদিন পরেই তিনি তার প্রতিপক্ষের দ্বারা নৃশংসভাবে খুন হন। শুধু তাই নয় পরবর্তীকালে তার সিংহাসনের এবং কোহিনূরের উত্তরাধিকারীদের অধিকাংশরেই পতন ঘটেছে অত্যন্ত করুনভাবে। এদের কেউ কেউ হয়েছেন অন্ধ, কেউবা হয়েছেন প্রজাবিদ্রোহে নিহত অথবা পরিবারের সদস্যদের হাতে নৃশংসভাবে খুন হয়। ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দে বিশ্বখ্যাত সাদ্দোজাই রাজ্য ভেঙে গেলে মোগল সম্রাট শাহ সুজার কাছ থেকে কোহিনূরটি নিয়ে যান শিখ সম্রাট মহারাজা রঞ্জিত সিং। কোহিনূরের মালিকানার দাবিদার একের পর এক হাতবদল হয়েছে সুদীর্ঘ ৭০০ শত বছর ধরে। ১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডের রানী ভিক্টোরিয়া ব্রিটেনের সিংহাসনে আরোহন করেন। লর্ড ডালহৌসি ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে এ দেশে গভর্নর জেনারেল নিযুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশদের সঙ্গে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পরাজিত হন। শিখ রাজ্যের সর্বশেষ উত্তারিধাকারী দিলীপ সিংহ। এ বছরেই ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দের ২৯ মার্চ লর্ড ডালহৌসি সমগ্র পাঞ্জাবকে ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত করে ঘোষনাপত্র প্রচার করেন। লর্ড ডালহৌসি শেষ পর্যন্ত ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দের এটা কেড়ে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন ১০ বছর বয়স্ক শিখ সম্রাট দিলীপ সিংহকে যুদ্ধে পরাস্ত করে। সেই অবধি ঘটনাক্রমে এই কোহিনূরের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হস্তগত হয়। যুগের পর যুগ ধরে সেই দিলীপ সিংহের উত্তরসূরিরা কোহিনূরকে নিজেদের সম্পদ বলে দাবী করে এসেছেন। লাহোর কোষাগার থেকে জগৎবিখ্যাত কোহিনূর হীরাকে লর্ড ডালহৌসি নিয়ে আসেন মুম্বাইযে। ব্রিটিশ ভারতীয় গভর্নর জেনারেল লর্ড ডালহৌসি স্বয়ং নিজের বুকের জামার সঙ্গে একটি গোপন বেল্টে ডাবল সেলাই দিয়ে অতি সন্তর্পনে লুকিয়ে এই কোহিনূর পাথরটিকে তার নিজ শরীরের সঙ্গে আটকিয়ে অতি যতেœ মুম্বাইয়ে নিয়ে আসতে সামর্থ্য হয়েছিলেন। ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে এটিকে ভারতীয় কোষাগার থেকে ব্রিটেনে নিয়ে যাওয়া হয় এবং বিশ্বখ্যাত এ কোহিনূর হীরাটি মহারানী ভিক্টোরিয়াকে উপহার দেওয়া হয়। সেই থেকে মহারানী ভিক্টোরিয়ার গলার হারে এই মহামূল্যবান হীরক খন্ডটিকে ব্যবহার করতে দেখা গেছে।
কোহিনূর বৃত্তান্তঃ
বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান হীরক খন্ডের নাম হলো ‘কোহিনূর’। এর জন্ম দক্ষিণ ভারতে। এছাড়াও রয়েছে ভারতের বিখ্যাত নীলকান্ত হীরা (১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে হেনরী ফিলিপ হোপ নামক এক ধনাঢ্য ব্যক্তি লন্ডনে ৯০ হাজার ডলারের বিনিময়ে নীলকান্ত হীরাটি কিনে নেন। পরবর্তীকালে তার নামানুসারেই এর নামকরণ করা হয় ‘হোপ’।) তুরস্কের ইস্তাম্বুলের ‘ক্যাসিকি ডায়মন্ড’ ও ঢাকার নবাব পরিবারের ‘দরিয়া-এ-নূর’ পৃথিবীর জগৎ বিখ্যাত হীরক খন্ড বলে বিশ্বে পরিচিতি লাভ করেছে।
বিশ্বখ্যাত মহামূল্যবান কোহিনূরের কথা না বললে হীরা সম্পর্কিত যে কোনো লেখাই যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। প্রচলিত লোককাহিনী অনুযায়ী জানা যায়, এই জগৎবিখ্যাত হীরক খন্ডটি প্রায় আনুমানিক পাঁচ হাজার বছর আগে পাওয়া গেছে বলে ধারণা করা হয়। অবশ্য বিভিৃন্ন দলিল-দস্তাবেজ রেকর্ডপত্র ঘেটে ১৩০৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে এর অস্তিত্বের কথা জানা যায়। তখন ভারতবর্ষের শাসন ক্ষমতায় ছিলেন মোগলরা।
কোহ-ই-নূর শব্দের অর্থ হলো ‘পর্বতের আলো’। কোহিনূর সম্পর্কে সর্বপ্রথম জানতে পারা যায় মোগল সম্রাট বাবর প্রণীত ফারসী গ্রন্থ ‘বাবরনামায়’। মোগল সম্রাট বাবর তার গর্বের ধন এই কোহিনূর সম্পর্কে দাবি করেছিলেন ‘এটি অত্যন্ত মূল্যবান এক দুর্লভ রতœ’। পৃথিবীর সমগ্র মানুষ একদিনে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেন তার প্রায় সমপরিমাণ দাম কোহিনূরের।
১৮৫১ খ্রিস্টাব্দে কোহিনূরকে কেটে বসানো হয় একটি আর্মলেটে। সমস্ত লন্ডন জুড়ে সে সময় বিরাট এক প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল। কোহিনূর সে সময় হয়ে ওঠে বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় বস্তু। ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে কোহিনূর স্থান পায় মহারানী ভিক্টোরিয়ার ‘টায়রাতে’। (১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডের মহারানী ভিক্টোরিয়া নিজ হস্তে ভারতের শাসনভার গ্রহণ করেন)। পরবর্তীকালে ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে রানী মেরির স্বর্ণ মুকুটে আলোকিত হয়ে ওঠে কোহিনূর। ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট ৬ষ্ঠ জর্জের করোনেশনের দিনে রানী মাতার মুকুটে স্থান পেল সর্বকালের সেরা হীরক খন্ড কোহিনূর। সেই থেকে আজ অবধি ইংল্যান্ডের রানীর মুকুটে বংশপরম্পরায় আজও শোভা পাচ্ছে কোহিনূর। জনশ্রæতি রয়েছে, হীরা পুরুষদের জীবনে কেবলই দুর্ভোগ ডেকে আনে বিধায় ব্রিটিশরাজ তাই রানীর মুকুটেই এর যোগ্য স্থান বলে বিবেচিত করেছেন। বিগত প্রায় পৌনে দুশ বছর ধরে বিশ্বখ্যাত কোহিনূর ইংল্যান্ডের রানীর মুকুটে আজ অবধি শোভা পাচ্ছে।
কোহিনূর হচ্ছে আসলে আমাদের অধুনালুপ্ত সমগ্র ভারতবর্ষের সম্পত্তি। দক্ষিণ ভারতের মাটিতে এর গৌরবোজ্জ্বল জন্ম। মোগলরা দুই শতাব্দী ধরে ছিল এর প্রকৃত মালিক বা দাবিদার। আজ এটি গৃহহারা।
লন্ডন প্রবাসী এক ভারতীয় আইনজীবী গরপেদ রায় এবং ২৫ ভারতীয় পার্লামেন্ট সদস্য মিলে বেশকিছু দিন আগে কোহিনূরকে একবার তাদের দেশের মাটিতে ফিরিয়ে আনার জন্য জোর প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। সমগ্র ভারতবর্ষ তখন হয়ে উঠেছিল উত্তপ্ত। পরবর্তীকালে এ আন্দোলনে উঠে পড়ে লেগে ছিলেন ব্রিটেনে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও বিখ্যাত কলামিষ্ট কুলদীপ নায়ার। পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশে কোহিনূর হীরাটির অনেক দাবিদারই সে সময় হইচই শুরু করে দিয়েছিলেন র্এ প্রকৃত মালিকানা নিয়ে। এ নিয়ে বিতর্কও কম হয়নি সেসময়। এর আগেও পাকিস্তান একবার কোহিনূরকে তাদের দেশের মাটিতে ফিরিয়ে আনতে তৎপর হয়েছিল। দাবি জানিয়েছিল এটি পাকিস্তানের সম্পদ। কোহিনূর আন্দোলনকে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী জেমস কালাহান সেই দাবি নাকচ করে দিয়েছিলেন এই বলে যে, ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দে লাহোর কোষাগার থেকে কোহিনূরকে ব্রিটেনে আনা হয়। এই তথ্য কোনভাবেই প্রমাণ করে না যে এটি পাকিস্তানের সম্পদ। তাছাড়াও এই মহামূল্যাবান হীরক খন্ডটি আমরা পেয়েছিলাম উপহার সামগ্রী হিসেবে। সুতরাং এই উপহার সামগ্রী ফিরিয়ে দেওয়ার কোন প্রশ্নই আসে না। * কোহিনূর ফিরিয়ে আনতে আধুনিক ভারত পাকিস্তান কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও চালিয়েছিল উচ্চ পর্যায়ে। শুধু পাকিস্তানই নয় কোহিনূরের জোর দাবী ইরান ও আফগানিস্তানও করে এসেছে ব্রিটিশ সরকারের কাছে। কিন্তু ব্রিটিশ কাগজপত্রে যে কোহিনূরের ৯০০ বছরের ইতিহাস রয়েছে তার মালিকানা ব্রিটেনও ছাড়তে নারাজ। উপসংহারে বলা যায়; ১৮৬ দশমিক ২ ক্যারেট ওজনের এই আশ্চর্য কোহিনূর হীরাটির প্রকৃত মালিকানার দাবিদার কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠি বা স¤প্রদায় নয়। কোহিনূর হচ্ছে সমগ্র ভারতবর্ষের সম্পদ । বিগত পৌনে দুশ বছর ধরে কোহিনূর ইংল্যান্ডের রানীর মুকুটে বসে তার দ্যুতি ছড়ালেও ব্রিটিশ সম্রাজ্যের দ্যুতি কিন্তু আজ ম্রিয়মাণ। বিশ্বের সা¤প্রতিক ঘটনাই তার জ্বলন্ত প্রমাণ।
শেকড়ের সন্ধানে : সম্রাট শাহজাহানের ময়ূর সিংহাসন
মোগল সম্রাট শাহজাহান বিশ্বের সবচেয়ে জঁমকালো ও সূ² রুচিবোধসম্পন্ন নির্মাতা হিসেবে খ্যাত। তাঁর নির্মিত তাজমহল এখনো বিশ্বের সেরা স্থাপত্য নিদর্শন হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত। সেই সঙ্গে দিওয়ান-ই খাস, দিওয়ান-ই আম, চাঁদনি চক, মোতি মসজিদ, জামে মসজিদ ও দিল্লীর অদূরে শাহজাহানাবাদ নগরী সহ অসংখ্য স্থাপত্য শিল্পে ভরে তুলেছিলেন তিনি তাঁর সাম্রাজ্যে। এসব কারণে সারা বিশ্বে তিনি “স্থাপত্যকলার বিশ্ব-শাসক” হিসেবে পরিচিত। এরকমই তাঁর আরেকটি সৃষ্টি ছিল “ময়ূর সিংহাসন”। একে বলা হতো “তখ্ত-ই তাউস” শব্দটি ফারসি। “তখ্ত” মানে সিংহাসন, ই’ হলো সংযোজন পদ এবং “তাউস” শব্দের অর্থ হলো ময়ূর। সর্বকালের সবচেয়ে দামি সিংহাসন। তবে সেটি এখন শুধু অতীত ইতিহাস। প্রায় আড়াইশ’ বছর আগে ময়ূর সিংহাসন পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে গেছে। তার খোঁজ আর শত চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।
সম্রাট শাহজাহানের রতœময় সিংহাসনের সংখ্যা ছিল ৭টি। তবে এদের মধ্যে ময়ূর সিংহাসনই ছিল সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও জঁমকালো। শিল্পের সমজদার বেবাদল খাঁর তত্ত¡াবধানে ১৬২৮ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৬৩৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় ৮ বছর সময়ে ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে তিনি এটি নির্মাণ করেছিলেন। বিস্মিত হতে হয় এই ভেবে যে, সে’ সময়ে আগ্রার তাজমহলের চেয়ে দ্বিগুণ অর্থ ব্যয়ে সম্রাট শাহজাহান নির্মাণ করেছিলেন এই অপূর্ব ময়ূর সিংহাসনটি। এটি ছিল স্বর্ণ, হীরা ও দূর্লভ মরকত মণি খঁচিত। সিংহাসনের ৪টি পায়া নিরেট স্বর্ণ দ্বারা নির্মিত ছিল এবং ১২টি মরকত মণির স্তম্ভের উপর চন্দ্রাতপ ছাদ আচ্ছাদন করা হয়েছিল। ছাদের চারদিকে মীনা করা মণি-মুক্তা বসানো ছিল। এর ভেতরের দিকটা সবটাই মহামূল্যবান চুনী ও পান্নার দ্বারা মুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। প্রত্যেক স্তম্ভের মাথায় মণি-মাণিক্য খঁচিত একজোড়া ময়ূর মুখো-মুখি বসানো হয়েছিল এবং প্রতিজোড়া ময়ূরের মধ্যস্থলে এক একটি মণি-মাণিক্য নির্মিত গাছ এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছিল যেন ময়ূর দুটি ঠোক্রে গাছের ফল খাচ্ছে এরূপ প্রতীয়মান হতো। পুরো সিংহাসনে অনেকগুলো স্বর্ণ দ্বারা নকশা করা এবং নকশার মাঝে ফাঁকা অংশটুকু কারুকার্য করা হয় ক্ষুদ্রাকৃতির মূল্যবান হীরা দিয়ে। হীরা-পান্না দ্বারা সুসজ্জিত তিনটি সিঁড়ির সাহায্যে উঠানামার ব্যবস্থা ছিল। সিংহাসনের উপরের চাঁদোয়ার চারকোণে বসানো হয়েছিল সারিবদ্ধ মুক্তা। চাঁদোয়াটির নিচেও ছিল হীরা আর মুক্তার বাহারি নকশা। রকমারি জহরত দিয়ে সাজানো ময়ূরগুলোর লেজ ছিল নীল রঙের মনি দিয়ে তৈরি। এক একটি বিরাট আকারের চুনি বসানো ছিল ময়ূরের বুকে। সেখান থেকে ৫০ ক্যারটের একটি হলুদ রঙের মুক্তা ঝুলে থাকতো। সিংহাসনটিতে ঠেস দিয়ে বসবার জন্য ভিন্ন ভিন্ন দিকে অগণিত মণি-মুক্ত শোভা পেতো।
১৫৮৭ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে পারস্যের মহামান্য সম্রাট আব্বাস তৎকালীন ১ লক্ষ টাকা মূল্যের একটি হীরা বাদশাহ জাহাঙ্গীর কে উপহার দেন। সম্রাট শাহজাহান এই হীরাটি কেও ময়ূর সিংহাসনে সংযোগ করেছিলেন। এই ময়ূর সিংহাসনের নির্মাণ ব্যয় নিয়ে দুটি তথ্য পাওয়া যায়।
সেকালে এটি নির্মাণ ব্যয় হয়েছিল ৮ কোটি টাকা। যা’ এই প্রবন্ধের গোড়াতেই উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে তৎকালীন ইউরোপীয় পর্যটক টাভেরনিয়া উল্লেখ করেছেন এই শিল্পমÐিত বহুমূল্যের রতœখচিত সিংহাসনটি নির্মাণ ব্যয় হয়েছিল ৫ কোটি টাকার হীরা-মুক্তা-পান্না, ৯০ লক্ষ টাকার জহরত, ২০ লক্ষ টাকা মূল্যের ১ লক্ষ তোলা ওজনের স্বর্ণ। টাভেরনিয়ারের মতে সব মিলিয়ে সিংহাসনটির লম্বা ছিল ৪.৫ ফুট। চওড়া ছিল ৩.৫ ফুট। তবে বার্ণিয়ারের মতে তা’ছিল ৬ ফুট। বিশেষজ্ঞরা এ ব্যাপারে টাভেরনিয়ারের মতকে সঠিক বলে মনে করেছেন। ২০ থেকে ২৫ ইঞ্চি উচুতে ছিল আসনটির বসার স্থান। মজার ব্যাপার হলো সম্রাট সিংহাসনে আরোহন করার পরই মনে হতো, ময়ূর পেখম মেলে নাচতে শুরু করেছে। পেখমে বসানো রতœরাজি ভাগে ভাগে দেখা যেত। সিংহাসনের আশেপাশেই থাকতো একটি রাজদÐ, তলোয়ার, একটি ঢাল, একটি ধনুক এবং কিছু তীর। প্রতিটি অস্ত্রই ছিল বহুমূল্যবান প্রস্তর দ্বারা নির্মিত। সিংহাসনের দুপাশে ছিল দুটি লাল ভেলভেটের ছাতা। ৮ থেকে ৯ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট ছাতা দুটির ডাট ছিল হীরা ও মণিমুক্তা বসানো। এর ঝালরও ছিল মুক্তাখঁচিত। আরও একটি তথ্যে জানা যায় সিংহাসনটি লম্বায় ১০ ফুট, প্রস্থে ৭ ফুট এবং উচ্চতায় সর্বোচ্চ ১৫ ফুট ছিল। সম্রাট শাহজাহানের স্বর্ণনির্মিত ও নানা ধরণের মণি-মাণিক্য খঁচিত ময়ূর সিংহাসনে বিশ্বখ্যাত কোহিনূর হীরক খÐটি অপূর্ব দ্যুতিময় হয়ে ওঠে। ১৭৩৯ খ্রিষ্টাব্দে পারস্য সম্রাট (বর্তমান ইরান) দুর্ধর্ষ নাদির শাহ দিল্লি আক্রমন করেন এবং নগরীর প্রায় ৩০ হাজার মানুষকে হত্যা করে দিল্লির মোগলদের ধন-ভাÐার ও ময়ূর সিংহাসন সহ সর্বস্ব লুট করে নিয়ে যান। কিন্তু নাদির শাহ পরবর্তীকালে দেখতে পান তার লুট করা সব ধন-সম্পদের মধ্যে বিশ্বখ্যাত হীরক খÐটি অনুপস্থিত (কোহিনূর)। তৎক্ষণাৎ চারিদিকে তল্লাশি ও খোজাখুঁজির পর মোগল হেরেমের এক সুন্দরী রমনীর কাছে জানতে পারেন মোগল সম্রাট মোহাম্মদ শাহ তাঁর পাগড়ির ভেতরে কোহিনূর লুকিয়ে রেখেছেন। ধূর্ত নাদির শাহ এক জাঁকজমকপূর্ণ রাজকীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মোহাম্মদ শাহকে দাওয়াত করেন এবং পরাজিত বাদশাহ হিসেবে তাঁকে তার পাগড়িটা বদল করতে বাধ্য করেন। মোগল বাদশাহ তাঁর পাগড়ি খোলার সঙ্গে সঙ্গে তৎক্ষণাৎ কোহিনূর বেরিয়ে এলে নাদির শাহ এটি দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে তার অজান্তেই মুখ ফুটে বেরিয়ে আসে কোহ-ই-নূর এই শব্দটি। এর প্রকৃত অর্থ হলো আলোর পাহাড়। সেই থেকে পরবর্তী কালে চোখ ধাঁধাঁনো এই রতœটির নাম হয় কোহিনূর।
ময়ূর সিংহাসনে সর্বমোট ১০৮টি বড় চুনি এবং ১২০টি মূল্যবান পান্না ছিল। অসংখ্য হীরা, মুক্তা, মোতিও ছিল। অত্যন্ত দক্ষতা ও সৌন্দর্য্যবোধের পরিচয় দিয়ে এটি তৈরি করা হয়েছিল। স্বর্ণ কতটুকু ব্যবহার করা হয়েছিল, সে হিসাব কেউ আর রাখেনি। এতোসব দামি পাথরের উপস্থিতিতে স্বর্ণও হয়ে পড়তো নি¯প্রভ।
ময়ূর সিংহাসনের যে সব তথ্য, বিবরণ এখন পাওয়া যায় তার সবই ইউরোপিয়ান বণিক, জহরত ব্যবসায়ীদের। মোগলরা তাদের এই অনবদ্য সৃষ্টির ছবি এঁকে রাখলেও কোনো লিখিত বিবরণ রেখে যায়নি। সম্রাট শাহজাহান নিজেও তাঁর পিতা জাহাঙ্গীর কিংবা পূর্বসূরী বাবরের মতো কোনো স্মৃতিকথা লিখে জাননি। সম্রাট আকবরের মতো তার দরবারে আবুল ফজলের মতো কোনো ইতিহাসবিদ ছিলেন না। ফলে তাঁর সৃষ্ট তাজমহল, ময়ূর সিংহাসন সহ অনেক শিল্পকর্ম সম্পর্কে অস্পষ্টতা রয়ে গেছে।
ময়ূর সিংহাসনের শেষ পরিণয় অত্যন্ত রহস্যময়। দিল্লীর বাদশাহ আওরঙ্গজেব ১৭০৭ সালে মৃত্যুমুখে পতিত হলে মোগলদের শক্তি হ্রাস পেতে থাকে। এমনি এক প্রেক্ষাপটে এই মহামূল্যবান ময়ূর সিংহাসনটি আগেই উল্লেখ করা হয়েছে ১৭৩৯ খ্রিষ্টাব্দে পারস্য সম্রাট নাদির শাহ ভারতবর্ষ অভিযানকালে লুণ্ঠন করেন। দিল্লি থেকে ফিরে যাবার সময় তিনি বিখ্যাত কোহিনূর হীরা ও লুণ্ঠন করেন। এর অবর্ণনীয় সৌন্দর্যে পাগল-পারা হয়ে নাদির শাহ এটাকে নিয়ে যান নিজ দেশ পারস্যে। অনেকের মতে নাদির শাহ দিল্লিতে অবস্থানের সময় ময়ূর সিংহাসনের মতো আরেকটি সিংহাসন বানিয়েছিলেন। তবে যাওয়ার সময় তিনি দুটি সিংহাসনই নিয়ে যান নিজ দেশ পারস্যে। বলা হয়ে থাকে নাদির শাহ কোহিনুরকে নিজের কাছে অতি যতেœ রেখেছিলেন। পরবর্তীতে এই ময়ূর সিংহাসনও কোহিনূর হীরার জন্য তার প্রতিপক্ষের কাছে নিদারুনভাবে খুন হন তিনি। যদিও আজ এ দুটি ভারতছাড়া তবুও পারস্যে এখন আর এটা নেই। অনেক রাজার রাজত্বে হাত বদল হয়ে ময়ূর সিংহাসন কালের গর্ভে ধ্বংস হয়ে গেছে। বিশ্বখ্যাত কোহিনূর হীরা ময়ূর সিংহাসনে বসানো ছিল। পরবর্তীতে বৃটিশের হাতে কোহিনূর হীরাটি চলে যায়।
বংশ পরস্পরায় মহারাণী এলিজাবেথের মুকুটে শোভা পাচ্ছে। বর্তমানে এটি লন্ডনের টাওয়ারে রক্ষিত আছে। বিশ্ববিখ্যাত কোহিনূর হীরা একসময় আমাদের ভারতবর্ষের সম্পদ ছিল। নাদির শাহ যখন ভারতবর্ষ আক্রমন করেন তখন দিল্লির সম্রাট ছিলেন মুহাম্মদ শাহ। মুহাম্মদ শাহ ২৯ বৎসর রাজত্ব করেন (১৭১৯-১৭৪৮ খ্রি.)।
তবে ইংরেজ আমলে মাঝে মাঝে গুজব উঠতো ময়ূর সিংহাসন টিকে আছে। লর্ড কার্জনের সময় প্রবল গুঞ্জনের সৃষ্টি হয়, ইরানের শাহের খাজাঞ্চি খানায় ময়ূর সিংহাসন আজো অক্ষত অবস্থায় আছে। ইংরেজ শাসকদের তখন পৃথিবীতে দোর্দÐ প্রতাপ। তারা খোঁজ লাগালো। কিন্তু খুঁজে পাওয়া গেলোনা ময়ূর সিংহাসন। শেষে লর্ড কার্জন নিজে জানালেন, না’ এটি নেই। তবে গবেষকরা মনে করেন ময়ূর সিংহাসনের কোনো টুকরা থাকলে থাকতেও পারে।
ময়ূর সিংহাসন এখন আর নেই। তবে তার স্মৃতি এখনো জাগরুক। কবিতা, মহাকাব্য, গল্প, উপকথা ও গানে এখনো ময়ূর সিংহাসন একটি বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছে। এখনো রাজকীয়, জমকালো কোনো আসন কিংবা বড় মূল্যবান পদ বোঝাতে আমরা তখ্্ত্-ই-তাউস (ময়ূর সিংহাসন) বলে থাকি।
(লেখক : কলামিষ্ট, সাহিত্যিক, গবেষক, ইতিহাসবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা )।
মোগলদের অহঙ্কারের অলংকার সম্রাট শাহ জাহানের কোহিনূর ও ময়ূর সিংহাসন
জানুয়ারি ১১, ২০২৫
































