[চলচিত্র নায়ক দিনাজপুরের রহমান (জন্ম ১৯৩৭ খ্রি.- মৃত্যু ২০০৫ খ্রি.]
মো. জোবায়ের আলী জুয়েল :
১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ ফেব্রæয়ারি পঞ্চগড় জেলার আটোয়ারী থানার রসেয়া গ্রামে চিত্র নায়ক রহমান জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মরহুম হাফিজ উদ্দীন আহমেদ ও মাতার নাম হাবিবা খাতুন। তাঁর পিতা স্থানীয় ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট ছিলেন এবং মাতা হাবিবা খাতুন ছিলেন সরকারী চাকুরে। ৩ ভাই ৮ বোনের মধ্যে রহমান ছিলেন ৪র্থ।
রহমানের শৈশব কাল কাটে রসেয়া গ্রামে, পরবর্তীতে পাশ্ববর্তী ঠাকুরগাও হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে রাজশাহী সরকারি কলেজে ভর্তি হন। কিছুকাল তিনি পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে লেখা-পড়া করেন। পরবর্তীতে জগন্নাথ কলেজ থেকে শিক্ষা জীবন সমাপ্ত করেন এবং গ্রাজুয়েশন ডিগ্রী নেন।
এহতেশাম পরিচালিত বাংলা চলচ্চিত্র “এদেশ তোমার আমার” ছবিতে নায়কের ভূমিকায় ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দে রহমানের আবির্ভাব ঘটে বাংলা চলচ্চিত্রে। এ ছবিটি মুক্তি পাবার পরে তাঁকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয় নাই। রহমান প্রায় ২৬টি ছবিতে অভিনয় করেছেন। (১) এদেশ তোমার আমার, (২) রাজধানীর বুকে, (৩) হারানো দিন, (৪) চান্দা, (৫) নতুন সুর, (৬) নতুন দিগন্ত, (৭) তালাশ, (৮) মিলন, (৯) দর্শন, (১০) জাহা বাজে শেহনাই, (১১) চলো মান গায়, (১২) কংগন (১৩) জোয়ার-ভাটা, (১৪) চাহাত, (১৫) দোরাহা, (১৬) লগণ, (১৭), মেঘের পর মেঘ, (১৮) অংশীদার, (১৯) দেবদাস, (২০) দেনা-পাওনা, (২১) স্বর্গ-নরক, (২২) নিকাহ, (২৩) বাহানা, (২৪) পরসে, (২৫) ইন্ধন ও (২৬) উত্তরণ।
রাজধানীর বুকে চলচ্চিত্রে নায়ক চরিত্রে রূপদানকারী বেকার স্বপ্নতাড়িত যুবকের বাস্তবানুগ অভিনয়, আকর্ষনীয় চেহারা আর তাঁর ঠোটে পরিবেশিত তালাত মাহমুদের গাওয়া গান- “তোমারে লেগেছে এত যে ভালো চাঁদ বুঝি তা জানে” এই গানের মাধ্যমে রহমান বাংলাদেশের দর্শকদের কাছে নায়ক হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। এখনকার ছেলে মেয়েরা শাহরুখ খান সম্পর্কে যে আবেগ বা ভালোবাসা বুকে ধারণ করেন ষাটের দশকে রহমানের প্রতি ভালোবাসা ও আবেগও ছিল প্রায় সে রকম। সে কালে নানা দেশেই দু’একজন জনপ্রিয় নায়ক নায়িকা থাকতেন। যাঁদের নামে তরুন সমাজ আত্মহারা হয়ে যেতেন। বাংলাদেশে ষাটের দশকে কলকাতার নায়ক উত্তম কুমারের প্রভাব ছিল সেই রকম। উত্তম কুমারের প্রবল প্রভাবের মধ্যেও আমাদের নায়ক রহমান তাঁর জায়গা করে নিতে পেরেছিলেন। তাঁকে সে সময় বলা হতো “পাকিস্তানী উত্তম”। তাঁর ব্যক্তিত্ব, সূ-দর্শন চেহারা, স্মার্টনেস, সুন্দর বাংলা উচ্চারণ, চমৎকার অভিনয়, নায়কোচিত চাহনী তাঁকে জনপ্রিয় নায়কে পরিণত করেছিল। অপ্রিয় হলেও একথা সত্য, রহমানের পর এত গুন সম্পন্ন নায়ক ঢাকার ছবিতে আর পাওয়া যায় না। এটা আমাদের দূর্ভাগ্য। ¯œাতক পাশ করার পর চাকরি নিয়েছিলেন ঢাকার তৎকালীন হোটেল শাহবাগে অভ্যর্থনা কারীর পদে। এই সময় সবে মাত্র এফ.ডি.সি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শুরু হয়েছে “আসিয়া”, জাগো হুয়া সাভেরা”, “আকাশ আর মাটি”, “মাটির পাহাড়” প্রভৃতি চলচ্চিত্রের কাজ। নবাগত পরিচালক এহতেশাম শুরু করেন “এদেশ তোমার আমার” নামে একটি চিত্রের কাজ। ঐ চিত্রের জমিদার পুত্র “ভিলেন” চরিত্রে রূপদানের জন্য মনোনীত হন রহমান। তাঁর সঙ্গে ছিলেন আনিস (খান আতা) ও সূমিতা। ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৫৯ সালে। একই বছর ফজলুল হক পরিচালিত “আজান” ছবিতেও তিনি নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেন। তবে ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৭৬ সালে “উত্তরণ” নামে। পরিচালক এহতেশাম ১৯৬০ সালে নির্মাণ করেন চলচ্চিত্র “রাজধানীর বুকে”। সেই ছবির নায়ক চরিত্রে রহমান, নায়িকা চিত্রা সিনহা ও সহশিল্পী সুভাষ দত্ত, নার্গিস প্রমূখের সঙ্গে অভিনয় করে সুপারহিট হন। রহমান অভিনীত দ্বিতীয় চলচ্চিত্র এহতেশামের ভাই মুস্তাফিজের “হারানো দিনও (১৯৬১ খ্রি.) হিট হয়। ১৯৬২ সালে তৈরী হয় এহতেশামের উর্দূ ছবি “চান্দা”। ছবিতে অঙ্কন শিল্পী হিসেবে তিনি অভিনয় করেন অভিনেত্রী সুলতানা জামানের বিপরীতে। “চান্দা” সারা পাকিস্তানে সুপারহিট হয়। সেই সঙ্গে রহমানও উর্দূ ভাষী পাকিস্তানীদের হৃদয়ও জয় করেন রহমান। তাঁর অভিনীত অন্য ছবি গুলিও হিট হয়। এসবের মধ্যে নতুন সুর (১৯৬২খ্রি.), তালাশ (১৯৬৩ খ্রি.), পরসে (১৯৬৪ খ্রি.), মিলন (১৯৬৪ খ্রি.), বাহানা (১৯৬৫ খ্রি.), ইন্ধন (১৯৬৬ খ্রি.) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এসব জনপ্রিয় ছবিতে অভিনয় করে রহমান হয়ে ওঠেন চলচ্চিত্রের হার্ট থ্রব নায়ক, স্বপ্নের রাজকুমার। অপ্রিয় হলেও একথা সত্য রহমানের পর এত গুন সম্পন্ন নায়ক ঢাকার ছবিতে আর পাওয়া যায়নি। আমাদের দূর্ভাগ্য, সেই জনপ্রিয় নায়ক রহমান ১৯৬৪ সালে সিলেটে “প্রীত না জানে রীত” ছবির শুটিং করতে গিয়ে এক সড়ক দূর্ঘটনায় তাঁর একটি পা’ হারান এরপর মৃত্যু পর্যন্ত রহমান একটি নকল পা নিয়ে জীবন যাপন করেছেন। একটি পা’ হারালেও রহমান অনবদ্য জীবন শক্তির পরিচয় দিয়েছেন। হাল ছাড়েন নি কোন দিন। তবে তাঁর আগের সেই দাপট আর থাকে নি। তিনি আর কখনো দাপুটে অভিনয়ে ফিরে আসতে পারেন নি।
সিলেটে দূর্ঘটনার পর তিনি নকল পা নিয়ে “মিলন” নামে একটি ছবিতে আবার নায়কের ভূমিকায় চমৎকার অভিনয় করেছিলেন। এরপর তিনি কিছু ছবিতে চরিত্রাভিনেতা হিসেবে অভিনয় করেন। “দেবদাস” ছবিতে চুনিলাল চরিত্রে তাঁর অভিনয় শেষ বারের মতো ঝিলিক দিয়ে উঠেছিল।
উর্দূ ছবি “তালাশ” এ রহমান শবনম জুটি খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল পাকিস্তানের দুই অংশেই। “হারানো দিন”, “চান্দা”, “তালাশ” সহ আরো কয়েকটি ছবির মাধ্যমে “রহমান-শবনম” জুটি সেকালে খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল। বলা যায় বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে প্রথম সার্থক ও জনপ্রিয় রোমান্টিক জুটি। তিনি পাকিস্তানসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পুরষ্কারও পেয়েছিলেন এ সবের মধ্যে রয়েছে “নিগার” ও “বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি পুরষ্কার”। এছাড়া বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব ও তাঁকে বিশেষ সম্মানে ভূষিত করে। জীবনের শেষ দিকে এসে রহমান সময় কাটাতেন প্রায় নিঃসঙ্গ অবস্থায়।
১৮ জুলাই ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দে সকাল ৯ টায় গ্রীণ রোড সংলগ্ন সেন্ট্রাল হাসপাতালে রহমান শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর। বলা বাহুল্য তাঁর স্ত্রী কুমকুমও কিছুদিন আগে মারা যান। রহমান ৫ কন্যা সন্তান রেখে গেছেন। গ্রামের বাড়ি আটোয়ারীর রসেয়ার পারিবারিক গোরস্তানে এখন তাঁর শেষ ঠিকানা। ঢাকার কোলাহল পূর্ণ পরিবেশ ছেড়ে রসেয়ার এই গ্রামেই তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত রয়েছেন।
ষাটের দশকে কিশোর ও তরুণদের কাছে রহমান ছিলেন এক স্বপ্নের নায়ক। স্বাধীনতার পর রহমান আস্তে আস্তে হারিয়ে গেছেন। নতুন নায়করা এসে চলচ্চিত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। রহমান অনেক দিন পাকিস্তানে ছিলেন। কেনো ছিলেন জানি না। পাকিস্তান থেকে ফেরার পর তিনি আর চলচ্চিত্র অঙ্গনে সুবিধা করতে পারেন নাই। তাঁর প্রতি সবাই সুবিচার করেছেন এমন দাবী করা যাবে না। রহমান তাঁর সময়ের দাবী পূরণ করেছিলেন। নায়ক হিসেবে চলচ্চিত্র জগতে মাতিয়ে গিয়েছিলেন। রহমানের অভিনয় জীবন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে একটি সোনালী অধ্যায়।
তাঁর পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে ষাটের দশকের জনপ্রিয় এই অভিনেতা মৃত্যুর পূর্ব সময় পর্যন্ত অত্যন্ত করুণভাবে জীবন অতিবাহিত করতেন। তাঁর বনানীর বিলাশ বহুল বাড়ির নীচ তলার একটি ছোট কক্ষে জীবনের শেষ দুটি বছর অতিবাহিত করেছেন। তাঁর স্ত্রী এবং কন্যারাই তাঁকে এই কক্ষে ঠাঁই দিয়েছিলেন। বাড়ির লোকজন অভিনেতা রহমানকে “পাগল” হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতের প্রথম সফল ও জনপ্রিয় নায়ক হিসেবে রহমান চিরকাল বাংলাদেশ ও বাঙালির মণি কোঠায় চির অ¤øান ও অক্ষয় হয়ে থাকবেন এ কথা নিঃসংশয়ে বলা যেতে পারে।
লেখক : সাহিত্যিক, কলামিস্ট, গবেষক, ইতিহাসবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্ত।
১৮ জুলাই মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণে: চলচ্চিত্র নায়ক রহমান দিনাজপুরের গর্ব
জুলাই ১৫, ২০২৫


































