রীতা রানী কানু :
দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার ৫নং খয়েরবাড়ী ইউনিয়নের নলডাঙ্গা গ্রামের ১৬ জন নারীশ্রমিক দৈনিক হাজিরার চুক্তিতে মেয়েদের ঝরে পড়া চুলের গুটি থেকে চুল বাছাই এবং পরিস্কারের কাজ করছেন। এতে দিন মজুরি হিসেবে তারা পাছেন ৭০ টাকা। সেই হিসেবে একজন নারী শ্রমিক মাসে এই কাজ করে আয় করছেন দুই হাজার ১০০ টাকা। তবে দলনেত্রীর মজুরি ৮০ টাকা এবং মাসে আয় হচ্ছে দুই হাজার ৪০০ টাকা।
সরেজমিনে নলডাঙ্গা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের জহুরম্নল শেখের খোলানের এক পার্শ্বে ওই গ্রামেরই একদল নারী দল বেঁধে মেয়েদের ঝরে পড়া চুলের গুটি থেকে চুল ঝেরে বাছাই এবং পরিস্কার করছেন। এ কাজের দলনেত্রী হিসেবে কাজ করছেন একই গ্রামের নূর আলমের স্ত্রী জহুরা বেগম। তিনিই মূলত এ কাজের পুরোটাই দেখভাল করেন।
চুল বাছাই কাজে নিয়োজিত রাজিয়া বেগম বলেন, গত এক মাস থেকে এ কাজে যোগ দিয়েছেন। সকাল ৭ টা থেকে দুপুর ২ টা পর্যন্ত গুটির চুল ঝারার কাজ করতে হয় তাদেরকে। চুল কারখানার লোকজন সকালে গুটি চুল দিয়ে যান এবং দুপুর ২টার পর ঝারা চুল নিয়ে যান। দীর্ঘ সময় কাজ করলেও মজুরি খুবই কম। তবুও বেকার থাকার চেয়ে এ কাজ করে হলেও কিছু আয় হচ্ছে বলে কাজ করছেন তারা।
মনিকা বেগম বলেন, আগে কোনো কাজ না থাকায় বাড়ীর রান্নাবান্নার পর অলস সময় কাটতো। সময় না কাটলে এ বাড়ী ও বাড়ী গিয়ে সময় কাটাতে হতো। কিন্তু চুল ঝারা কাজে যোগ দিয়ে সকাল থেকে সারাদিন ব্যস্ততার মধ্যে দিন কাটছে এবং কিছু আয়ও হচ্ছে। যা সংসারের অনেক কাজে লাগছে।
দলনেত্রী জহুরা বেগম বলেন, শুধু নলডাঙ্গা নয়, চুল পার্শ্ববর্তী গোয়ালপাড়া, খয়েরবাড়ী ডাঙ্গা, শিবপুরসহ উপজেলার প্রায় সব গ্রামেই গ্রামের নারীরা মেয়েদের ঝরে পড়া চুল ঝাড়ার কাজ করছেন। আমরা গরীব মানুষ দিন আনি দিন খাই। বাসায় বসে না থেকে এখানে চুলের কাজ করি। সারাদিন কাজ করে ৮০ টাকা পাই। মাসে ৩০ দিন কাজ করলে দুই হাজার ৪০০ টাকা পাই। বর্তমান বাজারে সবকিছুর দাম বেশি কিন্তু আমাদের মত নারী শ্রমিকদের মজুরি কম। মেয়েদের মাথা থেকে পড়ে যাওয়া চুলের কাজ করি। এ চুলগুলো জটলা লেগে থাকে সেগুলো আমরা কাটা দিয়ে আস্তে আস্তে খুলি। সকাল বেলা বাড়ীর কাজ করে ৭টার দিকে খোলানে আসি। আবার নাস্তার জন্য ১০টার সময় ৩০ মিনিট ছুটি পাই। নাস্তা খেয়ে আমার বসি কাজে। এর পরে দুপুর ২টায় কাজ শেষ করে নিজ নিজ বাড়ী চলে যাই। এ টাকা দিয়ে সংসার চলে না। কিন্তু উপায় না পেয়ে কষ্ট হলেও কাজ করতে হয়। জানা যায়, এই গুটি চুল প্রথমে নারীশ্রমিকের মাধ্যমে গুটি ছাড়িয়ে আলাদা করে প্রাথমিক পরিষ্কার এবং বাছাই করা হয়। এরপর এই বাছাই করা চুলগুলো ডিটারজেন্ট পাউডার ও শ্যাম্পু দিয়ে পানিতে ভিজিয়ে রেখে পরিষ্কার করা হয়। দ্বিতীয়বারের মতো পরিষ্কার করা এই চুল কারখানার ভেতরে নিয়ে কাটিং মেশিনের মাধ্যমে কাচি করা হয়। কাচি করা চুলগুলোকে একইসঙ্গে রাবার দিয়ে ছোট ছোট গোছায় বেঁধে আলাদা করা হয়। কারখানায় এই ছোট ছোট গোছা করা চুলগুলোকে বলা হয় লাচি। প্রক্রিয়াজাতকরণ চুলের দৈর্ঘ্যের উপরই এর মূল্য নির্ভর করে। চুল যত লম্বা হবে বাজার দরও তত বেশি হবে। চুলের এই দৈর্ঘ্যের উপর ভিত্তি করে এর বাজার মূল্য সর্বনিম্ন ৬ ইঞ্চি চুল ১ হাজার ২০০ টাকা থেকে শুরম্ন করে সর্বোচ্চ ২২-৩২ ইঞ্চি সাইজের চুল প্রতিকেজি ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ২২ ইঞ্চি থেকে ৩২ মাপের লম্বা চুলকে সর্বোচ্চ গ্রেডের চুল বলা হয়।
চুল বাঝাই কাজের কারখানার স্থানীয় ম্যানেজার আরজন আলী বলেন, গত ১৫ দিন আগে ফুলবাড়ী উপজেলার ১২ টি কেন্দ্রে চুল ঝারার কাজ শুরম্ন করা হয়েছে। প্রতি কেন্দ্রে ৮ থেকে ১৬ জন নারীর এক একটি গ্রম্নপ রয়েছে। এদের একজন রয়েছেন দলনেত্রী। স্থানীয়ভাবে চুলগুলো ঝারার পর নবাবগঞ্জ মতিহারা কারখানায় নিয়ে সেগুলো আরো কিছু কাজ করে তারপর সেগুলো ঢাকায় পাঠানো হয়। ঢাকা থেকে চীনসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানী করা হয়ে থাকছে। ফুলবাড়ী ও নবাবগঞ্জসহ কয়েকটি উপজেলায় এ কাজে অন্তত চার হাজার নারী নিয়োজিত রয়েছেন।


































