প্রদীপ মোহন্ত, বগুড়া :
বগুড়ায় গাবতলীতে দুইশ বছরের ঐতিহ্যবাহী পোড়াদহ বা জামাই মেলার পরেরদিন জমজমাটভাবে অনুষ্ঠিত হলো বউ মেলা। মেলায় ক্রেতা-বিক্রেতারা নারী হওয়ায় বিভিন্ন বয়সের নারীরা স্বাচ্ছন্দ্যে পছন্দের জিনিস কেনাটাকা করতে দেখা গেছে। তবে এ মেলার গেটে পুরুষরা থাকলেও ভেতরে প্রবেশ করতে পারেন না। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে গাবতলী উপজেলার মহিষাবান গ্রামে বসে ব্যতিক্রমী এই মেলা। ৩০ বছর ধরে পোড়াদহ মেলার পরের দিন ধারাবাহিকভাবে হয়ে আসছে এই মেলাটি।
মহিষাবান ইউনিয়নের গোলাবাড়ী বাজার সংলগ্ন ইছামতি নদীর শাখা গাড়ীদহ খালের তীরঘেঁষে প্রায় দুশ বছর আগে থেকে মাঘ মাসের শেষ বুধবার সন্ন্যাসী পূজা উপলক্ষে বসে ঐতিহ্যবাহী পোড়াদহ মেলা। বিশাল আকৃতির মাছের জন্য বিখ্যাত এ মেলা উপলক্ষ্যে প্রতিটি বাড়িতে নতুন বউ-জামাই যেমন আসেন, তেমনি পুরোনো আত্মীয়স্বজনও কেউ বাদ পড়েন না। কিন্তু সেসব আত্মীয়স্বজনের মধ্যে শুধু পুরুষরাই পোড়াদহ মেলায় যাওয়ার সুযোগ পান। নিরাপত্তা এবং বিশৃঙ্খলার আশঙ্কায় মেলায় নারীরা প্রবেশ করতে পারেন না। এ অবস্থায় নারীদের জন্য পোড়াদহ মেলার পরেরদিন বউ মেলার আয়োজন করা হয়।

মেলায় ত্রিপল ও সামিয়ানা টানিয়ে পসরা সাজিয়ে বসেছিল দোকানিরা। সকাল থেকেই এলাকার সব বয়সী মেয়েরা কেনাকাটার জন্য আসতে থাকে। দুপুরের দিকে মেলা পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। মেয়েদের প্রসাধনী সামগ্রীই মেলার প্রধান আকর্ষণ হলেও তার সঙ্গে স্থান পায় হরেক রকমের সাজ-সরঞ্জাম, চুড়ি, মালা, ফিতা ছাড়াও ঘর সাজানোর শৌখিন জিনিসপত্র এমনকি বাসনপত্রও পাওয়া যায় এই মেলায়। মূলত নারীদের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সরঞ্জাম দিয়ে সাজানো হলেও মায়েদের কোলে চড়ে কিংবা হাত ধরে মেলায় বেড়াতে আসা শিশুদের জন্য নানারকম খেলনা, বেলুন, খাদ্য সামগ্রী, নাগরদোলা ইত্যাদিও পাওয়া যায়।
চট্টগ্রাম থেকে মেলায় চুড়ি-ফিতার দোকান নিয়ে আসা আঙ্গুরী বেগম বলেন, পোড়াদহ মেলার পরদিন বউমেলা হয়। বেচাকেনা ভালো। ১২/১৩ বছর ধরে এই মেলায় দোকান নিয়ে আসছি। বগুড়া সদরের চেলোপাড়া এলাকার অজিরন বেওয়া নামে এক নারী বিক্রেতা জানান, জিনিস পত্রের দাম বেশি। তাই চুড়ি-ফিতা সবকিছুই বেশি দামে কিনতে হয়। তাই বেশি দামে বেচতে হয়। স্থানীয় রতন পাল, রাজিবুল বলেন, বাড়ির বউদের নিয়ে মেলা এসেছি। ওরা ভেতরে মেলায় কেনাকাটা করছে। যেহেতু মেলায় পুরুষদের ঢোকা নিষেধ। তাই বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। মেলায় ঘুরতে আশা জমিলা খাতুন বলেন, পোড়াদহ মেলার পরেরদিন এই বউমেলা অনুষ্ঠিত হয়। এখানে কোন পুরুষ আসেনা। আর এখানে বিক্রেতারাও নারী। তাই এই মেলায় আমরা নির্বিঘেœ কেনাকাটা করতে পারি। জমিলা আখতার নামে আরেক গৃহবধূ বলেন, মেয়েকে নিয়ে মেলায় এসেছি। মেয়ের সাজসজ্জার কিছু জিনিস কিনে দিব।

বউমেলার আয়োজক জাহিদুল ইসলাম বলেন, পোড়াদহের মেলায় পুরুষদের ভীড়ের কারণে এলাকায় নারীরা তেমন যেতে পারেনা। তাই শুধুমাত্র নারীদের জন্য এই বউমেলার আয়োজন করা হয়। এখানে ক্রেতা বিক্রেতা সবাই নারী। এখানে কোন দোকানীকে টোল দিতে হয় না। তাই প্রতি বছর দোকানের সংখ্যা বাড়ছে। মেলায় পরিদর্শনকালে গাবতলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ জানান, পোড়াদহ জামাই মেলার পরদিন বউমেলা হয়ে আসছে। যেহেতু নারীদের মেলা তাই এখানে নিরাপত্তায় নারী পুলিশ সদস্যরা কাজ করছেন। গাবতলী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা নুসরাত জাহান বন্যা বলেন, বউমেলা ব্যতিক্রম একটি আয়োজন। যেহেতু আমি নারী, তাই এখানে পরিদর্শন করতে এসে ভালো লাগল। মেলার দোকানদার ও ক্রেতা সবাই নারী। আমরা মেলার শৃঙ্খলা ঠিক রাখতে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি।


































