রীতা রানী কানু :
দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে সনাতন ধর্মালম্বীদের শারদীয় দুর্গোৎসবের শেষ দিন গত রবিবার (১৩ অক্টোবর) বিজয়া দশমীকে কেন্দ্র করে ছোট যমুনার পশ্চিম তীরে বসেছিল শত বছরের এতিহ্যবাহী সর্বজনীন দুর্গা মেলা।
দুর্গাপূজার দশমীর মেলাকে কেন্দ্র করে মেলার মূল কেন্দ্র স্থল ফুলবাড়ী সরকারি কলেজ মাঠ যেন সকল ধর্ম-বর্ণের সব বয়সী নারী ও পুরুষের মিলন মেলায় পরিণত হয়েছিল। মেলাকে কেন্দ্র করে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছিল আগত দর্শনার্থীদের প্রাণে।
জানা যায়, শারদীয় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে পূজার শেষ দিন দশমীতে সকার থেকেই প্রতিটি মন্ডপে মন্ডপে চলে সনাতন ধর্মালম্বী নারীদের সিঁদুর খেলাসহ প্রতীমা নিয়ে শোভাযাত্রাসহ বিসর্জন আয়োজন। শোভাযাত্রা শেষে পৌর এলাকাসহ আশপাশের প্রতীমাগুলো নিয়ে রাখা হয় দুর্গাপূজার দশমীর মেলা স্থল সরকারি কলেজ মাঠে পূর্বপ্রান্তে এবং ছোট যমুনা নদীর পশ্চিম প্রান্তে। আগত সনাতন ধর্মীলম্বী সব বয়সী নারী-পুরুষ বেদী দর্শনসহ অশ্রুসজল চোখে বিদায় জানান দেবী দুর্গাকে। পুরো সরকারি কলেজ মাঠ জুড়ে সব বয়সী নারী ও পুরুষের উপস্থিতিতে সরগম হয়ে ওঠে মেলার মাঠ। মেলায় মাটির খেলনা-পাতি, বেগুন, বিভিন্ন খাবার, ফলমূলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির দোকান বসেছিল। এসব দোকানে ক্রেতাদের মধ্যে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারী ক্রেতাদের আধিক্য ছিল বেশি।
এদিকে মেলাকে কেন্দ্র করে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারী-পুরুষ, কিশোর-কিশোর ও তরুণ-তরুণীরা নিজস্ব সংস্কৃতিতে নৃত্য পরিবেশের মাধ্যমে মেলার আকর্ষণ আরো বাড়িয়ে তোলেন।
ফুলবাড়ী উপজেলা আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন সমিতির সভাপতি শ্রী চুন্নু টুডু বলেন, সনাতন ধর্মালম্বী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারী ও পুরুষরা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতিতে দুর্গাদেবীর বিদায় উপলক্ষে মেলায় উপস্থিত হয়ে ঢোল-কর্তালসহ অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র নিয়ে নৃত্য পরিবেশন করে মেলায় আগত দর্শনার্থীদের মনোরঞ্জন দিয়ে থাকেন।
ফুলবাড়ীর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক চন্দ্রনাথ গুপ্ত চাঁন্দা বলেন, এটি একটি ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী মেলা। কবে থেকে এটি শুরু হয়েছে তা দশ বছর আগে যাঁরা জীবিত ছিলেন তারাও বলতে পারতেন না। ধরে নেওয়া হয় শত বছরের বেশি সময় ধরে দুর্গাপূজার দশমীতে এই মেলা চলে আসছে। এটি একটি ফুলবাড়ীর ঐহিত্যবাহী মেলা হিসেবেই সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষের কাছে পরিচিত। মেলায় সকল ধর্ম ও বর্ণের সহ¯্রাধিক নারী ও পুরুষের শতস্ফুর্ত উপস্থিতি এক অনন্য সম্প্রীতির মিলনমেলা হিসেবে চলে আসছে। মেলাকে কেন্দ্র করে ছোটবড় অন্তত শতাধিকের বেশি ব্যবসায়ী তাদের ব্যবসার জন্য প্রস্তুত করেন নানা ধরনের খাদ্যসামগ্রী থেকে খেলাপাতি। বিনোদনের জন্য বসানো হয় চরকি ও নাগর দোলা। শুধুমাত্র ফুলবাড়ী উপজেলারই নয়, আশপাশের উপজেলার সনাতন ধর্মালম্বী নারী-পুরুষসহ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারী-পুরুষরা তাদের আত্মীয়-স্বজন নিয়ে আসেন এই মেলায়।
মেলার মিষ্টি দোকানী উপজেলার চককবির গ্রামের রুপ চাঁদ মিয়া (৫০), পুটকিয়া নয়াপাড়া গ্রামের সোহরাব হোসেন (৫২), পৌর এলাকার কাঁটাবাড়ী গ্রামের সঞ্জিত কুমার, মৌসুমী মিষ্টিমন্ডা বিক্রেতা তরিকুল ইসলাম ও কাজল মোহন্ত বলেন, ঐতিহ্যবাহী দুর্গা দেবীর মেলাকে কেন্দ্র করে ১৫ দিন আগে থেকেই নানান ধরণের মিষ্টিমন্ডা তৈরি করে রাখেন। আর মেলায় শুধুমাত্র গরম গরম জিলাপি ভেজে বিক্রি করেন। এই মেলার একদিনের আয় দিয়ে সংসারের ৩ থেকে ৪ মাসের সংসারের খরচের সংস্থান হয়ে যায়। এজন্য প্রতি বছর এ মেলার জন্য অপেক্ষায় থাকেন তারা।
ফুলবাড়ী উপজেলা শাখা পূজা উদযাপন পরিষদের আহবায়ক অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন দাস ও ফুলবাড়ী কেন্দ্রীয় কালী মন্দিরের সভাপতি জয় প্রকাশ গুপ্ত বলেন, শত বছরেরও পুরনো এই মেলাটি ফুলবাড়ীর ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। বাপ-দাদার আমল থেকেই এ মেলা চলে আসছে এটি সর্বজনীন মেলা। কালের পরিবর্তে আধুনিকতার ছোঁয়ায় কিছু ঐতিহ্য হারিয়ে গেলেও প্রতিবছরই বেশ বড় আকারেই জমে ওঠে মেলাটি। এবারও দূরদুরান্তের দর্শনার্থীদের সমাগম ঘটে এই মেলায়।
এদিকে মেলার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সার্বক্ষণিকভাবে নিয়োজিত ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যসহ আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য। তদারকি ছিল উপজেলা প্রশাসনের।
থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মোস্তাফিজার রহমান বলেন, ঐতিহ্যবাহী এই মেলাকে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সার্বিক ব্যবস্থা ছিল পুলিশ সদস্যসহ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মীর মো. আল কামাহ তমাল বলেন, দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে সর্বজনীন দুর্গাপূজার মেলাটি ফুলবাড়ীর একটি ঐতিহ্যবাহী মেলা। মেলার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে শারদীয় দুর্গাপূজা ও দুর্গাপূজার মেলা সম্পন্ন হয়েছে। কোথাও কোন প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। এটিও ফুলবাড়ীবাসীর এতিহ্য।
আমন্ত্রণ/এসিজি
ফুলবাড়ীতে বিজয়া দশমীকে কেন্দ্র করে ছোট যমুনার পশ্চিম তীরে বসেছিল শত বছরের ঐতিহ্যবাহী দুর্গা মেলা
অক্টোবর ১৪, ২০২৪


































