আমন্ত্রণ প্রতিবেদক :
হঠাৎ করে চোখে পড়ে সড়কের ধারে বিশেষভাবে তৈরি একটি রিকশা ওপর থরে থরে ঝুলছে বাদাম, বুট আর চিপসের প্যাকেট। আর সেই রিকশার আসনে বসে আছেন ৩৭ বছর বয়সী আসাদুল হক নামের এক যুবক। তার দুই পা নেই, তবুও এই শারীরিক অক্ষমতা তাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। বরং ওই রিকশা হয়ে উঠেছে তার জীবনের প্রধান অবলম্বন এবং বেঁচে থাকার লড়াইয়ের শক্তি।
দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার ৭নং শিবনগর ইউনিয়নের দাদপুর গ্রামের আ. ছামাদের ছেলে দু’পা হারানো আসাদুল। তার সংসারে রয়েছেন স্ত্রী, দুই সন্তান ও বৃদ্ধ মা। পাঁচ সদস্যের এই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তিনি নিজেই। বিশেষভাবে তৈরি রিকশার প্যাডেল হাত দিয়ে চালান আসাদুল। প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিভিন্ন গ্রামে, পাড়া মহল্লায়, বাজারে ঘুরে ঘুরে বাদাম, বুট ও চিপস বিক্রি করেন। এতে খুব বেশি আয় হয় না, তবু সেই অল্প আয়ের মধ্যেই চালাতে হয় সংসারের খরচ, সন্তানের পড়াশোনা আর মায়ের চিকিৎসা।
রিকশায় বসেই করেন সব কাজ। পণ্য সাজানো, ক্রেতার হাতে তুলে দেওয়া, হাত আর শরীরের কৌশলে। পথচলার কষ্ট, মানুষের কৌত‚হলী দৃষ্টি, কখনো অবহেলা-সবকিছু নীরবে সয়ে নেন তিনি। তবু মুখে নেই কোনো অভিযোগ। বরং নিজের শ্রমে বেঁচে থাকার দৃঢ় প্রত্যয়ই ফুটে ওঠে তার চোখেমুখে।
নিজের জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়ের কথা বলতে গিয়ে আসাদুল কিছুক্ষণ নীরব হয়ে যান। তারপর ধীর কণ্ঠে আসাদুল বলেন, প্রায় ১৭ থেকে ১৮ বছর আগে ফুলবাড়ী রেলস্টেশনে চলন্ত ট্রেনে বাদাম বিক্রি করতেন তিনি। একদিন অসাবধানতায় চলন্ত ট্রেনের নিচে পড়ে যান। মুহূর্তের মধ্যেই বদলে যায় তার জীবন। সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় শরীরের অত্যাবশ্যকীয় অঙ্গ-দু’টি পা চিরতরে হারিয়ে যায় তার শরীর থেকে। দুর্ঘটনার পর দীর্ঘদিন হাসপাতালে কাটাতে হয়েছে তাকে। শারীরিক যন্ত্রণা তো ছিলই, তার চেয়েও বড় ছিল মানসিক কষ্ট। ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, সংসারের দায়-সব মিলিয়ে একসময় মনে হয়েছিল জীবন বুঝি এখানেই থেমে গেল। কিন্তু পরিবারের মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, ভেঙে পড়লে চলবে না।
সেই সিদ্ধান্ত থেকেই শুরু হয় নতুন সংগ্রাম। ভিক্ষার পথ বেছে না নিয়ে তিনি বেছে নেন পরিশ্রমের পথ। ধীরে ধীরে রিকশায় করে পণ্য বিক্রির কাজ শুরু করেন। শুরুটা ছিল কঠিন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অভ্যাস, ধৈর্য আর আত্মবিশ^াসই হয়ে ওঠে তার সবচেয়ে বড় শক্তি।
স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান ও খয়রুল ইসলামসহ আরও অনেকে বলেন, আসাদুল শুধু একজন প্রতিবন্ধী মানুষ নন, তিনি একজন সংগ্রামী যোদ্ধা। অনেক সুস্থ মানুষ যেখানে কাজ করতে অনীহা প্রকাশ করেন, সেখানে দুই পা না থাকা সত্তে¡ও তিনি প্রতিদিন জীবিকার তাগিদে রাস্তায় বের হন। তার জীবনকাহিনি নতুন প্রজন্মের জন্য বড় এক অনুপ্রেরণা।
আসাদুলের স্বপ্ন খুব বড় নয়, তিনি চান, সন্তানরা লেখাপড়া শিখে ভালো মানুষ হোক। চান, বৃদ্ধ মা যেন নিয়মিত চিকিৎসা পায়। আর চান-সমাজ যেন অক্ষম মানুষদের করুণা নয়, সম্মানের চোখে দেখে। তিনি বলেন, সরকারি সহায়তা বলতে নামমাত্র প্রতিবন্ধী ভাতা পান, তাও তিন মাস পরপর। এতে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। হাতে চালানো রিক্সার বদলে যদি একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা ভ্যান পেতেন, তাহলে কাজ করা অনেক সহজ হতো বলে জানান তিনি।
দুই পা না থাকলেও আসাদুলের জীবন থেমে নেই। সীমাহীন কষ্ট আর প্রতিক‚লতার মাঝেও তিনি প্রমাণ করে চলেছেন-অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে কোনো দুর্ঘটনাই মানুষের জীবনকে পুরোপুরি থামিয়ে দিতে পারে না।
এ বিষয়ে শিবনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সামেদুল ইসলাম বলেন, “আসাদুলের বিষয়টি আগে জানা ছিল না। আপনার মাধ্যমে জানলাম। এখন খোঁজ নিয়ে সাধ্যমতো তার জন্য কী করা যায় তা করা হবে।
আমন্ত্রণ/এজি
প্রতিবন্ধকতাকে জয় : ভিক্ষে নয়, বাদাম বিক্রির ব্যবসায় সংসার চালান প্রতিবন্ধী আসাদুল
জানুয়ারি ৩১, ২০২৬


































