বগুড়া ব্যুরো :
বগুড়া শহরের ক্লিনিক থেকে নার্স ও চিকিৎসকের সহায়তায় তার ছেলে আহসান হাবিব চুরি হয়েছে দাবি করে তাকে ফিরে পেতে মা ইতালির নাগরিক তাজমিনা আক্তার এক যুগ ধরে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। ছেলেকে ছাড়া প্রবাসেও যেতে পারছেন না। ছেলেকে ফিরে পেতে কয়েক দফা কারাভোগও করেছেন। প্রশাসন তাকে ‘নিজ সন্তানকে’ছিনতাইয়ের অপরাধে জেলেও পাঠিয়েছে।
সর্বশেষ বুধবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে বগুড়া শহরের সাতমাথায় মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করছেন। তিনি সন্তানকে ফিরে পেতে সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
শহরের সাতমাথায় মানববন্ধনে বগুড়া সদর থানার ওসি, সদর ফাঁড়ির দুই এসআই এর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন তাজমীনা আক্তার। তিনি বলেন, বগুড়া সদর থানার ওসি একএম মঈনুউদ্দিন এর নির্দেশে তাকে পুরুষ এসআই রাজিব হোসেন, শহিদুল গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে আসেন। পরে ওসি কোন কিছু জিজ্ঞাসা না করে মামলা সম্পর্কে না বুঝে আমার চুরিকৃত সন্তানটি আসামীর হাতে উঠিয়ে দেয় এবং আমাকে অন্য রুমে বন্ধ করে রেখে শরীরের বোরখা, হিজাব, ওড়না, সব খুলে নেয় এবং সারা রাত খালি ফ্লোরে রাখেন বলে জানান।
মানববন্ধনে তাজমিনা আক্তার বলেন, তাঁর মামলা থেকে আসামিদের রেহাই পেতে নানা ষড়যন্ত্র চলছে। এমনকি আসামিরা তাঁর সন্তানসহ বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টাও করছে। তাঁকে মুঠোফোনে হুমকি দিয়ে বলা হচ্ছে, বেশি বাড়াবাড়ি করলে প্রাণনাশের শিকার হতে পারেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বগুড়ার গাবতলী উপজেলার শালুকগাড়ি গ্রামের ইতালি প্রবাসী হেলাল উদ্দিনের স্ত্রী তাজমিনা আক্তার। তিনি জানান, ২০১৩ সালের ২৮ জুলাই বগুড়া শহরের নূরানী মোড় এলাকায় আইভি ক্লিনিকে দুটি যমজ সন্তান প্রসব করেন। একটি ছেলে ও একটি মেয়ে। ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের সহায়তায় তার ছেলেকে চুরি করা হয়। তাকে বলা হয়, ছেলে সন্তানটি মৃত; তাকে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এরপর ছেলেকে গাবতলী উপজেলার ঈশ্বরপুর গ্রামের আনোয়ার হোসেনের কাছে বিক্রি করা হয়। পরে উপজেলার নেপালতলি ইউনিয়ন পরিষদ থেকে চুরি যাওয়া ছেলের সন্ধান পান। স্থানীয়ভাবে সালিশ করেও ছেলে ফিরে পেতে ব্যর্থ হন।
তিনি জানান, এরপর নেপালতলি ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের সহায়তায় গত ২০১৯ সালে বগুড়ার দ্বিতীয় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন। আদালত ডিএনএ পরীক্ষার আদেশ দেন। তাকে ২০১৯ সালের ২৫ মার্চ থেকে দুই দিন কারাগারে রাখা হয়। সেখান থেকে ঢাকার কাশিমপুর কারাগারে চালান দেওয়া হয়। সাতদিন রাখার পর ডিএনএ করার পর বগুড়া কারাগারে পাঠানো হয়। বগুড়া কারাগারে একদিন থাকার পর জামিন লাভ করেন। তিন মাস পর ডিএনএ রিপোর্টে পজিটিভ আসে। কিন্তু ডিএনএ রিপোর্ট জালিয়াতি করে নেগেটিভ করা হয় বলে দাবি করেন তিনি।
তাজমিনা আক্তারের নারাজি দিলে পুনরায় ডিএনএ করার জন্য ২০ হাজার টাকা জমা নেওয়া হয়। ডিএনএ করানোর জন্য গত ২০২২ সালের ৯ জানুয়ারি তাকে আবারো বগুড়া কারাগারে নেওয়া হয়। পরদিন তাকে ঢাকার ডিএনএ কার্যালয়ে পাঠানো হয়। ওই কার্যালয় থেকে জানানো হয়, আগের রিপোর্ট পজিটিভ। তাকে বগুড়া কারাগারে পাঠানো হলে জামিন লাভ করেন। ডিএনএ পজিটিভ রিপোর্ট আদালতে জমা দিয়ে ছেলে ফিরে পেতে আবেদন করেন। কিন্তু আদালত থেকে তাকে বাচ্চার পরিবর্তে পিটিশন ও রিপোর্ট ফেরত দেওয়া হয়।
তার দাবি, নিরুপায় হয়ে তিনি হাইকোর্টে রিট করেন। ২০২২ সালের ১২ ডিসেম্বর বিচারপতিরা তার পক্ষে আদেশ দেন ও আসামিদের বিরুদ্ধে সমন জারি করেন। এরপর ১৪ ডিসেম্বর বগুড়ার আদালতে হাজির হন। বিচারক নথিতে নেগেটিভ রিপোর্ট দাখিল করেন। পরে তার আইনজীবী ডিএনএ অফিস থেকে পজিটিভ রিপোর্ট সংগ্রহ করেন। এতেও লাভ হয়নি। বগুড়ার দ্বিতীয় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের সাবেক স্পেশাল পিপি আশেকুর রহমান সুজন, আইভি ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ ও অনেকে জালিয়াতি করেছেন। আদালতের পক্ষ নিয়ে তার আইনজীবী রনি তাকে বাড়িতে ডেকে নিয়ে ভয়ভীতি দেখান। এ ছাড়া জজ কোর্টের আইনজীবীকেও হুমকি দেন। তাকে না জানিয়ে হাইকোর্টে রিট মামলাটি প্রত্যাহার করা হয়েছে।
এই নারী আরও দাবি করেন, এত হয়রানির পরও বাচ্চা ফিরে না পাওয়ায় তাজমিনা আক্তার হতাশ হয়ে পড়েন। গত ৩১ অক্টোবর বগুড়া জেলা পরিষদের সামনে থেকে চুরি করা ছেলেকে আসামির কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যান। ছেলে বাসায় এক সপ্তাহ থাকার পর আসামিপক্ষের দালাল মতিয়ার রহমান, বাবলু, রফিক, ডা. আমিনুল ইসলাম, আমজাদ হোসেন লুদুর সহযোগিতায় সদর থানা পুলিশ বাচ্চাসহ তাকে (তাজমিনা) গ্রেফতার করে। এরপর সদর থানা পুলিশ তার ছেলেকে আসামিদের হাতে তুলে দেয়। পুলিশ তার বোরকা, হিজাব ও ওড়না খুলে নিয়ে সারা রাত মেঝেতে রাখে। নিজ সন্তানকে অপহরণের অপরাধে ৭ নভেম্বর তাকে আদালতের মাধ্যমে বগুড়া জেল হাজতে পাঠানো হয়। ১৫ দিন জেলে থাকার পর ১৩ নভেম্বর জেলা ও দায়রা জজ আদালতে মিসকেস করেন। ২০ নভেম্বর বগুড়া জেলা ও দায়রা জজ মো. শাহজাহান কবির ডিএনএ রিপোর্ট দেখার পর তাকে জামিন দেন।
তাজমিনা আক্তার আরও জানান, ছেলেকে ফিরে পেতে গত ১২ বছর অনেক লড়াই সংগ্রাম করেছেন। তার পুরো পরিবার ইতালির নাগরিক। শুধু ছেলেকে ফিরে পাওয়ার জন্য প্রবাসে যেতে পারছেন না। কয়েক দফা কারাভোগ করেছেন। তিনি তার চুরি হওয়া সন্তান দ্রæত ফিরিয়ে পেতে প্রধান উপদেষ্টা ও জনগণের সহযোগিতা কামনা করেছেন।
তাজমিনা আক্তারের আইনজীবী রবিউল ইসলাম বলেন, ‘আমার মক্কেলের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার আছে। কিন্তু প্রতিপক্ষের প্রভাব ও হুমকির কারণে মামলার সুষ্ঠুভাবে পরিচালনায় বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। আমরা চাই, এ মামলার যথাযথ তদন্ত ও বিচার হোক, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো মা তাঁর সন্তান হারানোর ভয় না পান।’ মানববন্ধনে স্থানীয়দের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।
অভিযোগ প্রসঙ্গে বগুড়া সদর থানার ওসি একেএম মঈনুউদ্দিনের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।
আমন্ত্রণ/এসিজি


































