আমন্ত্রণ জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক :
দেশের একমাত্র দিনাজপুরের মধ্যপাড়া কঠিন শিলা পাথর খনি থেকে বিপুল পরিমাণ পাথর উত্তোলন হচ্ছে। বর্তমানে খনির ৯টি ইয়ার্ডে প্রায় ১০ লাখ মেট্রিকটন পাথর মজুদ থাকলেও দেশের বাহির থেকে লাখ লাখ টন পাথর আমদানী করা হচ্ছে। এতে আশঙ্কাজনকভাবে খনির পাথর বিক্রি কমে গেছে, ফলে প্রতি মাসেই মজুতের পরিমাণ বাড়ছে। সেকারনে খনিটি দেনার মুখে পড়েছে। এ অবস্থায় খনির ওপর নির্ভরশীল শ্রমিক ও খনি সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসীর জীবন ও জীবিকা নির্বাহে অপূরণীয় ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জানা যায়, দেশে পাথরের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ২ কোটি ১৬ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে শুধুমাত্র রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে ২ হাজার ৯৫৫ কিলোমিটার রেলপথে প্রতিবছর ১ কোটি সিএফটি পাথর প্রয়োজন হয়। এছাড়া নদী শাসনসহ অন্যন্য সরকারী উন্নয়ন কাজে পাথর ব্যবহার হয়ে থাকে। এর সিংহভাগ পাথর আমদানি করা হয় ভারত, ভুটান, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, আরবআমিরাত ও থাইল্যান্ড থেকে। এসব পাথর হিলি, সোনারহাট, সোনা মসজিদ, নকুগাঁও, বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরসহ পানি পথে আমদানী করা হয়। হিলিস্থলবন্দর কাষ্টম এর তথ্য অনুযায়ী ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে ৯৭হাজার ৮৯৪ দশমিক ১০ মেট্রিকটন এবং ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে জুলাই থেকে সেপ্টম্বর পর্যন্ত ২হাজার ৫৩১ দশমিক ৫০ মেট্রিকটন পাথর আমদানী করা হয়েছে। যা গড়ে প্রতিমাসে ৮ হাজার ১৫৭ দশমিক ৮৪ মেট্রিকটন। শুল্কসহ এক টন পাথরের আমদানি খরচ পড়ছে গড়ে ৩ হাজার ২০০ টাকা।
খনিকতৃপক্ষ বলছেন, দেশিও পাথর গুনে মানে ভালো এবং আন্তর্জাতিক মানের হলেও মধ্যপাড়া পাথর না নিয়ে দেশের বাইরে থেকে আমদানী করা হচ্ছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য দরপত্রে মধ্যপাড়া পাথরের ব্যবহারের নির্দেশনা থাকা সত্বেও তা পালন করা হচ্ছে না। এতে করে সরকার হারাচ্ছে লাখ লাখ টাকা রাজস্ব। এদিকে বিক্রি কমে যাওয়ার ফলে অর্থ সংকটে পড়েছে খনি কর্তৃপক্ষ । এতে করে ধারদেনা করে খনির ঠিকাদারের বিল এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনভাতা পরিশোধ করতে হচ্ছে। গত মাসে পেট্রো বাংলার অপর প্রতিষ্ঠান বড়পুকুরিয়া খনি থেকে ৩০ কোটি টাকা ধার করে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে পরিশোধ করা হয়েছে।
খনি সুত্রে জানাগেছে, ১৯৭৩-৭৪ সালে জিওলজিক্যাল সার্ভে অব বাংলাদেশ খনিটি আবিষ্কার করে। উন্নয়ন কাজ শেষে ২০০৭ সালের ২৫ মে দেশের একমাত্র মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনিটি বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়। উৎপাদন শুরুর পর থেকে নানা প্রতিক‚লতার কারণে পেট্রোবাংলা প্রতিদিন তিন শিফটে ৫ হাজার মেট্রিক টন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে মাত্র এক শিফটে ৭০০-৮০০ মেট্রিক টনের বেশি পাথর উত্তোলন করতে পারেনি। ফলে ২০১৩ সালের জুন পর্যন্ত ৬ বছরে খনিটি লোকসান গুনতে হয়েছে প্রায় শত কোটি টাকা। সে কারনে ২০১৪ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ছয় বছরের জন্য খনির উৎপাদন, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা কাজে দায়িত্ব দেওয়া হয় জার্মানিয়া ট্রেস্ট কনসোর্টিয়াম (জিটিসি) কে। পূর্ণমাত্রায় পাথর উৎপাদন করায় ২০১৮-২০১৯ অর্থবছর থেকে চারবার মুনাফা অর্জন করে অসছে খনিটি। জিটিসির প্রথম দফা চুক্তির মেয়াদ শেষ হয় ২০২১ সালের ২ সেপ্টেম্বর। এরপর আবারও দ্বিতীয় দফায় ২০২১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ৬ বছর মেয়াদী চুক্তি হয়। বর্তমানে খনি থেকে চুক্তি অনুযায়ী তিন শিফটে প্রতিদিন সাড়ে ৫ হাজার মেট্রিকটন পাথর উত্তোলন করছেন তারা। খনির উত্তোলিত পাথর বিক্রির দায়িত্বে রয়েছেন পেট্রোবাংলার নিয়ন্ত্রণাধীন মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড (এমজিএমসিএল)। এই খনির পাথর সরাসরি ক্রেতার কাছে বিক্রি করা হয় না। নির্ধারিত ডিলারদের মাধ্যমে পাথর বিক্রি করা হয়। বর্তমানে ১৫০ জন ডিলার রয়েছেন। পাথর উৎপাদন স্বাভাবিক থাকলেও বিক্রি নিয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছে। সে কারনে সংকটে পড়েছে খনিটি।
সুত্রটি আরও জানায়, ২০২২-২৩ অর্থ বছরে পাথর উৎপাদন হয়েছে ১০লাখ ৬৩ হাজার ৩৩২ মেট্রিক টন, বিক্রি হয়েছে ৫ লাখ ৭১হাজার ৭২০ মেট্রিক টন। একইভাবে ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে ১৩লাখ ১৫হাজার ৫০০ মেট্রিক টন উৎপাদন হয়েছে। বিক্রি হয়েছে ৯ লাখ ৬হাজার ৫০৯ মেট্রিক টন । সে অনুযায়ী গড়ে প্রতিদিন পাথর বিক্রি হয় ২৫-৩০ মেট্রিকটন । বাকি পাথরগুলো অবিক্রীত থেকে যায়। বর্তমানে খনির ৯টি ইয়ার্ডে প্রায় ১০ লাখ মেট্রিকটন পাথর মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে রেলপথে ব্যবহারে জন্য ৫ লাখ ৭০ হাজার টন ব্লাস্ট পাথর এবং নদী শাসন কাজে ব্যবহার করার জন্য ২ লাখ ৮০ হাজার টন বোল্ডার পাথর প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তিনি আরও জানান, বর্তমানে খনিতে ৫টি সাইজের পাথর উৎপাদন হচ্ছে। খনির উৎপাদিত ০-৫ মি.মি/স্টোন ডাস্ট পাথর প্রতিটন ১হাজার ১৫০টাকা, ৫ থেকে ২০ মিলিমিটার (মিমি) পাথর প্রতি টন ৩ হাজার ২৫০ টাকা, ২০ থেকে ৪০ মিমি ৩ হাজার ৬০০ টাকা এবং ৪০ থেকে ৬০ মিমি ৩ হাজার ৬৫০ টাকা,৬০-৮০মিমি ২হাজার ৬শত,বোল্ডার ৩হাজার ২শত এবং ফাইন ডাষ্ট ৭৪০টাকা দরে প্রতিটন বিক্রি হচ্ছে। এর সঙ্গে প্রতিটন ক্রাশড পাথর ট্রাকে লোড খরচ ৬০ টাকা এবং বোল্ডার পাথর লোডের জন্য ৮০টাকা যুক্ত হবে।
এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানী লিমিটেড এর মহাব্যবস্থাপক (পিইপিএন্ডএম) মোঃ আবু তালেব ফরাজী। খনি কতৃপক্ষ জানান, খনির পাথর সরবরাহের জন্য নির্মিত মধ্যপাড়া খনি থেকে পার্বতিপুরের ভবানিপুর রেল স্টেশন পর্যন্ত ১৪ কিলোমিটার রেল পথটি দির্ঘদিন ধরে অচল হয়ে পড়ে রয়েছে। রেল পথটি সংস্কার করে সচল করলে সড়ক পথের চেয়ে অনেক আংশে খরচ কমে আসবে, এতে পাথর বিক্রিও বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া আমদানি পাথরের ওপর শুল্ক বৃদ্ধি এবং মধ্যপাড়ার পাথরের ট্যারিফ ভ্যালু বৃদ্ধি প্রয়োজন। তারা মনে করেন, এতে পাথরের বিক্রিতে ‘সুবিধা হবে এবং দেশের একমাত্র ভ‚গর্ভস্থ পাথর খনিটিকেও বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হবে।
এদিকে মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক একাধিক ডিলার জানান, আগে ১০ চাকার ট্রাক (ট্রাকের ওজনসহ) ৪২ থেকে ৪৬ মেট্রিক টন ও ৬ চাকার ট্রাক (ট্রাকের ওজনসহ) ৩০ থেকে ৩২ মেট্রিক টন পাথর পরিবহন করত। কিন্ত ২০১৮ সালের মোটরযান এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ বিধি অনুযায়ী ১০ চাকার ট্রাক (ট্রাকের ওজনসহ) ৩২ মেট্রিক টন ও ৬ চাকার ট্রাক (ট্রাকের ওজনসহ) ২২ মেট্রিক টনের বেশি পাথর বহন করতে পারছে না। পাথর কম লোড হওয়ার কারণে পরিবহন খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। সেইসাথে দেশের মেঘা প্রককল্প গুলোসহ অন্যান্য কনষ্ট্রাকশন কাজ বন্ধ রয়েছে। ফলে পাথর বিক্রি অনেকটা কমেছে। এছাড়া আগে ৫ শতাংশ কমিশন দেওয়া হলেও এখন ৩ শতাংশ দেওয়া হচ্ছে। এই ৩ শতাংশের ওপর আবার ভ্যাট কাটছে ১৫ শতাংশ। ফলে সামগ্রিকভাবে লাভ কমে যাওয়ায় ডিলাররা পাথর বিক্রিতে আগ্রহ হারাচ্ছে। একাধিক ঠিকাদার জানান, খনির পাথর গুনে ভালো হলেও দাম এবং পরিবহন খরচ বেশি ওজনে ভারি। বাহির থেকে আমদানিকৃত পাথরের দাম কম পড়ে এবং ওজনে হালকা। তাই তারা বেশিভাগ আমদানীকৃত পাথর ব্যবহার করেন।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) প্রসেসিং পরিদপ্তর এর তত্ত¡াবধায়ক প্রকৌশলী (পুর) মুহাম্মদ আনোয়ার সাদাত জানান, বর্তমানে আমাদের ৮৮টি প্রকল্প চলমান। এই প্রকল্প গুলোর মধ্যে সিসি ব্যাগ ও জিওব্যাগ এর কাজ করা হয়। শুধুমাত্র সিসি ব্যাগের কাজে পাথর ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যার সিংহ ভাগ দেশের বাহির থেকে আমদানী করা হয়, মাঝে মাঝে অল্প কিছু পাথর মধ্যপাড়া খনি থেকে নেয়া হয়। দেশে পাথর থাকতে কেন বাহির থেকে আমদানী করা হয় ? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা প্রকল্পের কাজ গুলো করে থাকি খরা মৌসুমে । বর্ষা আসার আগে ৬ মাস প্রকল্পের কাজ করা যায়। ওই সময়ে খনি কতৃপক্ষ চাহিদা অনুযায়ী সময়মত পাথর দিতে পারেন না। সে কারনে দেশের বাহির থেকে আমদানি করতে হয়।
মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের (এমজিএমসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুর রহমান বলেন, দেশের বাইরে থেকে আমদানিকৃত পাথরের তুলনায় মধ্যপাড়া খনির উৎপাদিত পাথর গুণে মানে অনেক উন্নত। পাথর উত্তোলন বাড়লেও বিক্রি আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। খনি শুরু থেকে ভূগর্ভের ১৫টি পয়েন্ট থেকে প্রায় দেড় কোটি মে.টন পাথর উত্তোলন করা হয়েছে। খনি ভূ-গর্ভে যে পরিমান পাথর রয়েছে তা শত শত বছর ধরে উত্তোলন করা যাবে। দেশের রেল এবং নদী শ্বাসন কাজসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কাজে যদি খনির পাথর ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়, একদিকে দেশের একমাত্র খনিটি প্রাণ ফিরে পাবে, অন্যদিকে সরকারের লাখ লাখ টাকা রাজস্ব আয় হবে।
আমন্ত্রণ/এসিজি
মধ্যপাড়া কঠিন শিলা পাথরখনি : দেশেই মজুদ ১০ লাখ মেট্রিক টন পাথর, আমদানী হচ্ছে বাহির থেকে # দেশে বার্ষিক চাহিদা প্রায় ২ কোটি ১৬ লাখ মেট্রিক টন # চাহিদার সিংহভাগ পাথর আমদানি করা হয়। # উত্তোলনের তুলনায় পাথর বিক্রি কম। # প্রতি মাসেই মজুতের পরিমাণ বাড়ছে।
অক্টোবর ১৮, ২০২৪


































