অমর চাঁদ গুপ্ত অপু ও প্লাবন শুভ :
সনাতন ধর্মালম্বীদের লক্ষ্মীপূজা উপলক্ষে দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে শতবছরের ঐতিহ্যবাহী বউমেলা। এ মেলায় শুধু নারীরাই ক্রেতা ও দর্শনার্থী। মেলায় ঢুকতে পারেন না পুরুষরা।
আজ বৃহস্পতিবার (১৭ অক্টোবর) দুপুর ২টা থেকে সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত ফুলবাড়ী পৌর এলাকার সুজাপুর গ্রামের সর্বজনিন দুর্গাপূজা মন্ডপ চত্বরে দিনব্যাপী বসেছিল এই ঐতিহ্যবাহী বউমেলা। শতবছর ধরে প্রতিবছর লক্ষ্মীপূজার পরদিন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে এই ঐতিহ্যবাহী বউমেলাটি।
সরেজমিনে মেলায় গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকেই ত্রিপল ও শামিয়ানা টানিয়ে নিজ নিজ পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছিলেন দোকানিরা। নারীদের প্রসাধন সামগ্রীই মেলার প্রধান উপজীব্য হলেও ছোটদের খেলনা সামগ্রী, হস্তশিল্পের পণ্যসামগ্রী, গৃহস্থালির নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীসহ রকমারি মুখরোচক খাবারও ছিল। বিকেল গড়িয়ে এলে সেখানে ভিড় জমে বিভিন্ন বয়সী নারী ও শিশুদের। মেলার আশপাশে পুরুষদের ভিড় জমলেও তাদের মেলায় ঢোকার কোনো অনুমতি ছিল না। বিক্রেতাদের মধ্যে নারীদের পাশাপাশি পুরুষ থাকলেও বিভিন্ন বয়সী নারী ও শিশু, কিশোরী ও তরুণীদের নিয়েই জমে উঠেছিল ঐতিহ্যবাহী এই বউমেলা।
বউমেলায় কেনাকাটা করতে আসা গৃহবধূ হীরা প্রসাদ, ফাতেমা সানু, মল্লিকা গুপ্তা, মাধবী রানীসহ মেলায় আগত একাধিক নারী বলেন, লক্ষ্মীপূজা উপলক্ষে প্রতিবছর ঐতিহ্যবাহী এই বউমেলা হয়ে থাকে। মেলায় শুধু নারীরাই ক্রেতা হওয়ায় নিবিঘ্নে মেলায় অবস্থান করাসহ সাচ্ছন্দে কেনাকাটা করা যায়। তবে মেলায় আসলে খুব আনন্দ লাগে। অনেক পরিচিত নারী ও আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা স্বাক্ষাত হয়। জমিয়ে আড্ডা দেওয়া যায়। বউমেলাকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর বহু আত্মীয়-স্বজন বাড়ীতে আসেন। সবাই মিলে মেলায় ঘোরাঘুরি আর আড্ডা দেওয়া যায়, মেলার জন্যই এই আনন্দ উপভোগ করা যায়।
মেলায় আসা নববধূ চম্পা রানী বলেন, নতুন বিয়ে হয়েছে। বরসহ (স্বামী) এসেছিলেন বউমেলায়। কিন্তু মেলায় পুরুষের প্রবেশ নিষেধ থাকায় বরকে মেলার বাইরে ছেড়ে আসতে হয়েছে। মেলার এসে খুব ভালো লেগেছে।
বউমেলার বাইরে গেটে দাঁড়িয়ে থাকা সঞ্জয় রায়, পলাশ দাসসহ অনেক পুরুষ বলেন, মেলাতে পুরুষের প্রবেশ নিষেধ থাকে জানার পরও শুধুমাত্র নিজেদের বউ, বাচ্চাদের আনন্দের জন্য তাদের নিয়ে মেলায় আসতে হয়। বউ বাচ্চারা মেলার ভেতরে ঘোরাঘুরিসহ কেনাকাটা করছে। তাদের কাজ শেষ হলেই তাদেরকে নিয়ে বাড়ী ফিরতে হবে তাই অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকার মেলার বাইরে। তবে মেলাটি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এই নিয়ম চালু থাকায় এটিও একটি ঐতিহ্য। এটি আগামীতেও বজায় থাক।
মেলার প্রসাধন সামগ্রী বিক্রেতা হেলাল উদ্দিন বলেন, বউমেলার আগত ক্রেতা সকলেই নারীরা হওয়ায় মেলায় প্রসাধনী সামগ্রীই বেশি বিক্রি হয়। নারীদের প্রসাধনীর পাশাপাশি শিশুদের খেলনা সামগ্রীও বেচাবিক্রি ভালো হয়েছে।
মেলার আয়োজক সুজাপুর সর্বজনীন দুর্গামন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি অশেষ রঞ্জন দাস ও সাধারণ সম্পাদক গৌ চন্দ্র সরকার বলেন, লক্ষ্মীপূজা উপলক্ষে প্রতিবছর পূজার পরদিন বউমেলার আয়োজন করা হয়। এটি এলাকার তৎকালীন জমিদার বিমল বাবু মেলাটি শুরু করেন। জমিদার স্বপরিবারে ভারতে চলে গেলেও ঐতিহ্যবাহী বউমেলাটি সুজাপুর সর্বজনীন দুর্গামন্দির পরিচালনা কমিটির উদ্যোগে প্রতি বছর মেলাটি হয়ে আসছে। মেলাটি শুধু নারীদের জন্যই। তাই মেলায় পুরুষদের প্রবেশ নিষেধ থাকে। বাড়ীর বউয়েরা সবচেয়ে বেশি এই মেলায় আসেন বলে এই মেলার নাম বউমেলা। মেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশের পাশাপাশি মন্দিরের স্বেচ্ছাসেবকরা দায়িত্ব পালন করেন।
থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোস্তাফিজার রহমান বলেন, ঐতিহ্যবাহী বউমেলাটির আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মীর মো. আল কামাহ্ তমাল বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বউমেলায় সার্বিক বিষয়ে খোঁজ খবর রাখা হয়েছে। সেখানে কোন প্রকার সমস্যা হয়নি। পাশাপাশি পুলিশ সদস্যরাও সেখানে দায়িত্ব পালন করেছেন।
আমন্ত্রণ/এসিজি


































