অমর চাঁদ গুপ্ত অপু :
দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে পানি প্রবাহপথে অপরিকল্পিতভাবে পুকুর খননসহ জলাবদ্ধতা নিরসনে জমির মাটি থেকে উচু করে সাড়ে ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০৬ মিটার দীর্ঘ ক্যানেল নির্মাণ করায় পানির নিচেই তলিয়ে থাকছে দেড় হাজার বিঘা আবাদি জমি। ফলে দীর্ঘ ২০ বছর ধরে ইরি-বোরো ও আমন আবাদ হচ্ছে না পানির নিচে তলিয়ে থাকা জমিতে।
এতে করে এলাকার দশ গ্রামের দুইশতাধিক কৃষক তাদের জমিতে করে ইরি-বোরো এবং আমন চাষ মৌসুমে দুই শতাধিক কৃষক তাদের জমি থেকে কোনো প্রকার ফসল তুলতে পারছেন না। ফলে বছরে সাড়ে সাত কোটি টাকার ফসল উৎপাদন ও প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়ে আর্থিকভাবে লোকসানে পড়ে নিঃস্ব হয়ে পথে বসেছেন এসব কৃষক। পরিবার পরিজন নিয়ে দিন কাটছে খেয়ে না খেয়ে।
জানা যান, পানি নিষ্কাশনের পথ রোধ করে নিম্নএলাকা উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নের ঘোনাপাড়ায় অপরিকল্পিতভাবে অন্তত ১০টি পুকুর খনন করায় পানি প্রবাহ পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে করে দীর্ঘদিন ধরে এলাকার ১০ গ্রামের দুই শতাধিক কৃষকের প্রায় দেড় হাজার বিঘা আবাদি জমি জলাবদ্ধতার জন্য পানির নিচে নিমজ্জিত থাকছে। ফলে নিমজ্জিত জমিতে কেউ কেউ সামান্য কিছু এলাকায় ইরি-বোরো আবাদ করতে পারলেও আমন আবাদ একেবারেই হচ্ছে না।
ক্ষতিগ্রস্ত ভুক্তভোগী কৃষকরা জানান, পানি প্রবাহের পথে অপরিকল্পিতভাবে খননকৃত পুকুর বন্ধ করে পানি প্রবাহের পথ স্বাভাবিক রাখাসহ জলাবদ্ধ এলাকার পনি নিষ্কাশনের মাধ্যমে দেড় হাজার বিঘা জমির আবাদ স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন সময় উপজেলা প্রশাসন, জনপ্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন নিবেদন করেন। এরই প্রেক্ষিতে ফসলি জমির জলাবদ্ধতা নিরসনে জাইকা প্রকল্পের মাধ্যমে উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নের বারাইপাড়া এলাকায় ২০২০ সালে প্রথম পর্যায়ে ৪৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৬৩ মিটার দীর্ঘ একটি ক্যানেল নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করা হয়। একইভাবে ক্যানেলের পানি ছোট যমুনা নদীতে ফেলার জন্য একই বছরে দ্বিতীয় পর্যায়ে ১১ লাখ ৪৫ হাজার টাকা ব্যয়ে ৪৩ মিটার দীর্ঘ ক্যানেল নির্মাণ করা হয়। নির্মাণ কাজটি সম্পন্ন করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ফুলবাড়ী। সাড়ে ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০৬ মিটার দীর্ঘ ক্যানেল নির্মাণ হলেও শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর অজ্ঞতা ও দায়িত্বহীনতার জন্য ক্যানলটি ভুক্তভোগী কৃষকদের কোনো উপকারে আসছে না। কারণ জলবদ্ধতায় নিমজ্জিত আবাদি জমির চেয়ে অন্তত দুই ফুট উচু করে নির্মাণ করায় বর্ষা মৌসুমে সামান্য পানি বের হলেও অন্য সময়ে জলাবদ্ধতায় নিমজ্জিত হয়ে অনাবাদি থাকছে জমি।
সরেজমিনে জলাবদ্ধতার শিকার উপজেলার খয়েরবাড়ী ইউনিয়নের অম্রবাড়ী, কিসমত লালপুর, লালপুর, লক্ষীপুর, মহদিপুর, পূর্ব নারায়ণপুর, দৌলতপুর ইউনিয়নের গড়পিংলাই, বারাইপাড়া, ঘোনাপাড়া ও পলিপাড়া এলাকা গিয়ে দেখা যায়, এসব গ্রামের দেড় হাজার বিঘা আবাদি জমি এখন জলাবদ্ধতার জন্য পানির নিচে তলিয়ে রয়েছে। এজন্য জমিগুলোতে ধানের আবাদের বদলে মাঠজুড়ে ভেসে রয়েছে কচুরিপানা।
মহদীপুর গ্রামের মৃত বাতাসু মন্ডলের ছেলে বর্গাচাষি আইয়ুব আলী বলেন, ১৫ হাজার বিঘা জমি বছর চুক্তিতে আবাদের জন্য একই গ্রামের সাখাওয়াত হোসেনের ৪ বিঘা, বারাইপাড়া গ্রামের বারী মাস্টারের ২৫শতক, মহদীপুর মসজিদের ১৬ শতক জমি আবাদ করেন। এতে সার, বীজসহ চাষাবাদ খরচ হয় প্রায় ১৩ হাজার টাকা। এই আবাদের খরচ জোগান দিতে বাড়ীর গাভি বাছুরসহ ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি করেন। কিন্তু বন্যার পানিতে জমির আবাদকৃত পুরো ফসলই নষ্ট হওয়ায় গাই-বাছুরসহ তার পুরো অর্থই লোকসানে পড়ে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছে এই বর্গা চাষির।
এদিকে জলাবদ্ধতার জন্য পানির নিচে আবাদি জমি তলিয়ে থাকায় আবাদ করতে পারছেন না এমন চাষিদের মধ্যে মহদিপুর গ্রামের মৃত সাদেক আলীর ছেলে নাজিম উদ্দিনের চারভাইসহ ৬ বিঘা, একই গ্রামের মৃত আফসার আলীর ছেলে সোহরাব হোসেনের ৮ ভাইয়ের ১৬ বিঘা, বাতাসু মন্ডলের ছেলে নূরু মন্ডলের ৩ বিঘা, গড়পিংলাই গ্রামের মৃত ফজর আলীর ছেলে বাবলু মিয়ার ৩ বিঘা ও বারাইপাড়া গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য মোশাররফ হোসেনের অংশিদারদেরসহ প্রায় ১০০ বিঘা জমি রয়েছে।
মোশাররফ হোসেন মেম্বরের ছেলে ফেরদৌস রহমান বলেন, তাদের পরিবারের শত বিঘা জমি জলাবদ্ধতার পানির নিচে তলিয়ে থাকায় এক ছটাক ফসলও বাড়ীতে আসছে না দীর্ঘ ২০ বছর ধরে। শুধুমাত্র অপরিকল্পিতভাবে ক্যানেল নির্মাণ করার জন্য এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। ক্যানেলটি নির্মাণ হওয়ার পর থেকে কৃষকের দুগর্তি আরো বেশি হয়েছে। ক্যানেল নির্মাণের নামে সরকারি অর্থ লোপাট করা হয়েছে মাত্র। জমিগুলো পানির নিচে তলিয়ে থাকায় জরুরি প্রয়োজনে জমির মালিকরা জমিগুলো বেচাকেনাও করতে পারছেন না। এ সময় এসব জমিতে ইরি-বোরো ও আমন ধান চাষাবাদ হলেও এখন সেটি কৃষকদের কাছে শুধুই স্মৃতি হয়ে গেছে।
ভুক্তভোগী কৃষকদের তথ্যমতে, আবাদ মৌসুমে প্রতি বিঘায় গড়ে ২০ থেকে ২৫ মণ ধান উৎপাদন হতো। এ অনুযায়ী পানির নিচে তলিয়ে থাকা দেড় হাজার বিঘা জমিতে বছরে ৬০ হাজার মণ ধান উৎপাদন হতো। ৬০ হাজার মণ ধানের বর্তমান বাজার মূল্য সাড়ে সাত কোটি টাকা। এখন এক ছটাক ধানও উৎপাদন করা যাচ্ছে না।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ রুম্মান আক্তার বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসন করা হলে সেই জমিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদেরকে সার ও বীজ সরবরাহ করে চাষাবাদে জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) শফিকুল ইসলাম বলেন, সরেজমিনে পরিদর্শন পূর্বক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে কথা বলে পানি নিষ্কাশনের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ অবস্থায় ক্যানেলের সঙ্গে বড় পাইপ দিয়ে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মীর মো. আল কামাহ তমাল বলেন, যেহেতু একটি ক্যানেল নির্মাণ করা হয়েছে, সেটি এখন তো ভেঙ্গে ফেলা সম্ভব নয়, তাই পানি নিষ্কাশনের জন্য সেখানে বিকল্প কি করা যায় সেটি উপজেলা প্রকৌশলী এবং উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
আমন্ত্রণ/এসিজি
ফুলবাড়ীতে জমি থেকে উচু করে সাড়ে ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ক্যানেল নির্মাণ করায় পানির নিচে তলিয়ে থাকছে দেড় হাজার বিঘা আবাদি জমি : এলাকার কৃষকরা বছরে সাড়ে সাত কোটি টাকা মূল্যের ফসল উৎপাদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন
অক্টোবর ১, ২০২৪


































