বগুড়া ব্যুরো :
বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামের এক কৃষক পরিবারের সন্তান আরিফুল ইসলাম। শৈশব থেকেই অভাব-অনটন, সংগ্রাম আর নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে এগিয়ে গেছেন তিনি। অদম্য ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে অবশেষে তাঁর সেই দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণের পথে। তিনি জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (সিভিল জজ) পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।
আরিফুল ইসলাম নন্দীগ্রাম উপজেলার বুড়ইল ইউনিয়নের খেংসর উত্তরপাড়ার প্রয়াত আনসার আলীর ছেলে। তাঁর এই সাফল্যে পরিবার, স্বজন, শিক্ষক, বন্ধু-বান্ধবসহ পুরো নন্দীগ্রাম উপজেলায় বইছে আনন্দের আবহ।
আরিফুল ইসলামের শিক্ষাজীবনের শুরু হয় নিজ এলাকার খেংসর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে। ছোটবেলা থেকেই তাঁর পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব একটা সচ্ছল ছিল না। তাঁর বাবা প্রয়াত আনসার আলী কৃষিকাজের পাশাপাশি গ্রামে একটি ছোট পান-সুপারির দোকান পরিচালনা করতেন।
কৃষিকাজ ও দোকান থেকে যা আয় হতো, তা দিয়েই কোনোভাবে সংসারের ব্যয় মেটানোর পাশাপাশি সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ চালাতেন তিনি। সীমিত আয়, অভাব আর নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ছেলের পড়াশোনা যেন থেমে না যায়—এটাই ছিল বাবার অন্যতম স্বপ্ন।
সংসারের নানা সংকট পেরিয়ে আরিফুল ইসলাম নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যান। পরবর্তীতে তিনি কুষ্টিয়া ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে পড়াশোনা সম্পন্ন করেন।
আরিফুল ইসলামের বাবা প্রয়াত আনসার আলী স্বপ্ন দেখতেন, তাঁর ছেলে একদিন বড় হয়ে জজ বা ব্যারিস্টার হবে। অভাবের সংসারে থেকেও ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি স্বপ্ন দেখা বন্ধ করেননি।
জীবদ্দশায় ছেলের সাফল্য দেখে যেতে না পারলেও আজ সেই স্বপ্ন বাস্তব হওয়ার পথে। ছেলে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (সিভিল জজ) হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন—কিন্তু এই আনন্দের মুহূর্তে পাশে নেই সেই স্বপ্নদ্রষ্টা বাবা মা। ছেলের সাফল্যের সবচেয়ে আনন্দের দিনটি দেখার কথা ছিল মা বাবার। কিন্তু আজ বাবা মা নেই, তারা শুধু স্মৃতি হয়ে আছেন।
বাবা-মা হারা পাঁচ ভাই ও এক বোনের পরিবারের জীবনে নানা কষ্টের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছেন আরিফুল ইসলাম। আর্থিক সংকট, পারিবারিক প্রতিকূলতা কিংবা সীমিত সুযোগ—কোনো কিছুই তাঁর এগিয়ে যাওয়ার পথ থামাতে পারেনি।
নিজের লক্ষ্যকে সামনে রেখে তিনি নিয়মিত পড়াশোনা করেছেন এবং আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পর বিচার বিভাগে ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যান। তাঁর এই সাফল্য শুধু পরিবারের জন্য নয়, প্রত্যন্ত গ্রামের তরুণদের জন্যও একটি অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে উঠেছে।
আরিফুল ইসলাম জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (সিভিল জজ) হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর নন্দীগ্রামের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে আনন্দের সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাঁর সাফল্য নিয়ে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছেন অনেকে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, আরিফুল ইসলামের এই সাফল্য এলাকার শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় আরও উৎসাহিত করবে এবং প্রত্যন্ত গ্রামের সন্তানরাও যে কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে বড় স্বপ্ন পূরণ করতে পারে—তাঁর জীবন তারই উদাহরণ হয়ে থাকবে।
একজন কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বাবার ঘরে জন্ম নেওয়া আরিফুল ইসলামের এই সাফল্য তাই শুধু একটি চাকরি পাওয়ার গল্প নয়; এটি অভাবকে জয় করে স্বপ্ন পূরণের এক অনুপ্রেরণাদায়ক গল্প।
বাবার দেখা স্বপ্ন আজ পূরণের দ্বারপ্রান্তে। যে বাবা একদিন পান-সুপারির ছোট দোকানে বসে ছেলেকে নিয়ে জজ হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন, সেই বাবা আজ পৃথিবীতে নেই। তবে তাঁর স্বপ্ন বেঁচে আছে ছেলে আরিফুল ইসলামের সাফল্যের মধ্য দিয়ে।
আমন্ত্রণ/এজি
নন্দীগ্রামে কৃষকের সন্তান আরিফুল সিভিল জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত
সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২৬
































