অমর চাঁদ গুপ্ত অপু :
দিনাজপুর-গোবিন্দগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কটি চার বছর আগে ৮৮২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। সড়কের নির্মাণ কাজটি বাস্তবায়ন করেছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ। সড়কটি নির্মাণের পর থেকেই দিনাজপুর জেলা শহর থেকে ফুলবাড়ী, বিরামপুর ও ঘোড়াঘাট হয়ে গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ মহাসড়কের সঙ্গে সংযোগ হয়েছে। এই ৬৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কের বিভিন্ন স্থানে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। সড়কটির সংস্কার ও প্রশস্তকরণের চার বছর যেতে না যেতেই সড়কের বিভিন্ন স্থান দেবে সৃষ্টি হয়েছে উচুঁ-নিচু ঢেউ ও গর্ত। এতে ঝুঁকি নিয়েই প্রতিনিয়ত চলাচল করছে ছোটবড় যানবাহন। এতে ছোটবড় দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনা ঘটছে।
দিনাজপুর-গোবিন্দগঞ্জ মহাসড়কের ঢাকা মোড় থেকে গোবিন্দগঞ্জ চারমাথা মোড় পর্যন্ত প্রায় ৬৬ কিলোমিটার সড়কের অবস্থা বেশি খারাপ। এই মহাসড়ক নির্মাণের শুরুর দিকে এলাকার সাধারণ মানুষ ও পরিবহন ব্যবসায় যুক্ত ব্যক্তিরা অনেক খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু নির্মাণের দুই বছরের মাথায় সড়কের বিভিন্ন স্থান দেবে যাওয়া শুরু করে। কোথাও কোথাও সড়ক উঁচু নিচু হয়ে যায়। আবার কোথাও কোথাও বড় বড় গর্ত তৈরি হয়। এসব কারণে মহাসড়কটি পথচারীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
দিনাজপুর থেকে গোবিন্দগঞ্জ পর্যন্ত ব্যস্ততম আঞ্চলিক মহাসড়কটিতে রাজধানী ঢাকাসহ রাজশাহী, বগুড়া, জয়পুরহাট, হিলি স্থলবন্দরসহ সারাদেশ থেকে ছেড়ে আসা দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়গামী সকল যানবহন ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক দিয়ে এসে গোবিন্দগঞ্জ হয়ে এই আঞ্চলিক মহাসড়ক দিয়ে যাতায়াত করে থাকে। সেইসাথে এই সড়ক দিয়েই দেশের একমাত্র মধ্যপাড়া পাথরখনি, বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি এবং কয়লাভিত্তিক তাপ বিদুৎ কেন্দ্রে যাতায়াত করে থাকে। এছাড়া দিনাজপুরের দক্ষিণ-পূর্বাংশের ফুলবাড়ী, বিরামপুর, নবাবগঞ্জ, হাকিমপুর ও ঘোড়াটের সাথে দিনাজপুর জেলা সদরে যাতায়াতের একমাত্র পথ এই আঞ্চলিক মহাসড়টি। ফলে এই আঞ্চলিক মহাসড়কটি ব্যস্ততম সড়ক হিসেবে গণ্য হয়ে থাকছে।
ট্রাক চালক মমিনুল ইসলাম বলেন, রাস্তাটি দেবে গিয়ে উচুঁনিচু নালা খালে পরিণত হওয়ায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয়। নিচু স্থানে চাকা পড়লে নালা থেকে যানবহন সাইট দেয়া নেয়া কঠিন হয়ে পড়ে, এতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনা ঘটে। তখন দোষ হয় চালকের। সড়কটি দ্রুত সংস্কার করা দরকার।
সরেজমিনে দেখা যায়, দিনাজপুর-গোবিন্দগঞ্জ মহাসড়কের ফুলবাড়ী ঢাকা মোড় থেকে দক্ষিণে আম্রবাটি মাদ্রাসা মোড়, লক্ষ্মীপুর বাজার থেকে জয়নগর বাজার, চন্ডিপুর বাজার থেকে দুর্গাপুর ঢিবি, বিরামপুর পৌর শহরের ঢাকা মোড়, মির্জাপুরের ব্র্যাক চিলিং সেন্টার থেকে ঘোড়াঘাট রেলঘুমটি পর্যন্ত কোথাও কোথাও সড়ক উঁচু নিচু ঢেউ হয়ে আছে। পিচঢালাই উঠে কোথাও কোথাও খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে।
একই অবস্থা ফুলবাড়ী ঢাকা মোড় থেকে পশ্চিম দিকে রাঙ্গামাটি হয়ে বারাইহাটের কিছু অংশ এবং আমবাড়ী যাওয়ার আগে একইভাবে দিনাজপুর পর্যন্ত। এতে মহাসড়কের এসব স্থান দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স, পণ্যবাহী পরিবহন, ইজিবাইক, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনের চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। সন্ধ্যার পর মহাসড়কের এসব এলাকা দিয়ে চলাচল করা আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, যত্রতত্র উঁচু হয়ে থাকায় এসব অংশ দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে মোটরসাইকেল উল্টে দুর্ঘটনা বেশি ঘটে।
দিনাজপুর কোতোয়ারীসহ ফুলবাড়ী, বিরামপুর ও ঘোড়াঘাট থানার সূত্রে জানা যায়, গত এক বছরে এই আঞ্চলিক মহাসড়কটিতে ১১৮টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে, এতে ৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছে, তারমধ্যে ঘটনাস্থলে মৃত্যু হয়েছে ৪৫জনের। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত শুধুমাত্র ফুলবাড়ীতে ২০টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণ হারিয়েছেন ১৪ জন এবং আহত হয়েছে শতাধিক। এছাড়া চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৫ টি দুর্ঘটনা ঘটেছে, এতে ৫জনই নিহত হয়েছে।
দিনাজপুর সড়ক ও জনপদ কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, এই আঞ্চলিক মহাসড়কটির গুরুত্ব বিবেচনা করে ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরে গোবিন্দগঞ্জ থেকে দিনাজপুর ১০৬ কিলোমিটার ৪২ ফুট প্রস্তকরণে ৮৮২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। রাস্তাটি ৯টি গুচ্ছের মাধ্যমে ৮টি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ২০১৮ সালের ১ জুলাই থেকে নির্মাণ কাজ শুরু করে এবং সংস্কারসহ প্রশস্তকরণ কাজ ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে শেষ হয়। কিন্তু প্রশস্ত ও সংস্কারের কাজ শেষ করার দুই বছরের মাথায় আবারো রাস্তাটি দেবে গিয়ে উচুঁ-নিচু খানাখন্দে পরিণত হয়ে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।
এদিকে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান বলেছে, সড়ক নির্মাণের কাজ শেষ হওয়ার পরবর্তী তিন বছরের মধ্যে সড়কে কোনো সমস্য দেখা দিলে সেটি তারা সংস্কার করে দেবেন। যেহেতু এখন চুক্তির সময় পার হয়ে গেছে সেহেতু এখন তাদের কোনো দায় নেই এ বিষয়ে।
দিনাজপুর সড়ক ও জনপথ (সওজ) এর নির্বাহী প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান বলেন, ওই সড়কে অনেক সময় অভারলোড গাড়ী চলাচলের কারণে সড়কে এরকম হয়ে থাকে। এরপরেও ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব থাকে। কাজ শেষে সড়ক সংস্কারে জন্য প্রতিটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের জন্য তিন বছর ডিপিএল (ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড) থাকে। এই সময়ে মহাসড়কে এ রকম কোনো সমস্যা থাকলে তা সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সংস্কার করবে। এই সড়কটিতে ৮টি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান পৃথক পৃথক ভাবে কাজ করেছে। অনেকেরই চুক্তি শেষে হয়েছে এবং কিছু জায়গায় চুক্তির সময় আছে। সরেজমিনে দেখে ঠিকাদেরর মাধ্যমে সেই জায়গাগুলো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
আমন্ত্রণ/এসিজি
৮৮২ কোটি টাকার দিনাজপুর-গোবিন্দগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কে উচুঁ-নিচু ঢেউ, সড়ক তো নয় যেন মরণ ফাঁদ
মার্চ ১৮, ২০২৫


































