আব্দুর রাজ্জাক আশিক, ধুনট (বগুড়া) প্রতিবেদক :
গ্রামবাংলার আঙিনাজুড়ে এখন দোল খাচ্ছে সাজিনা গাছ। পুষ্টিগুণে ভরপুর এই সবজি আর কেবল পারিবারিক খাদ্য তালিকায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং বাজারে তৈরি করেছে উল্লেখযোগ্য চাহিদা। ফলে সাজিনা চাষকে ঘিরে কৃষকদের মাঝে সৃষ্টি হয়েছে নতুন আশাবাদ।
স্থানীয় বাজার সূত্রে জানা যায়, মৌসুমের শুরুতে আগাম সাজিনা প্রতি কেজি ১০০ টাকা দরে বিক্রি হলেও বর্তমানে তা ৫০ থেকে ৬০ টাকায় নেমে এসেছে। তবে দামের এ সামান্য পতন চাহিদায় কোনো প্রভাব ফেলেনি। প্রতিদিনই বাজারে দ্রুত বিক্রি হচ্ছে এই পুষ্টিকর সবজি।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, সাজিনা একটি স্বল্প খরচে সহজে উৎপাদনযোগ্য ফসল। বাড়ির আঙিনা কিংবা অনাবাদি জমিতে ডাল রোপণ করলেই অল্প সময়ের মধ্যে গাছ বড় হয়ে ফলন দিতে শুরু করে। এতে একদিকে পরিবারের পুষ্টি চাহিদা পূরণ হচ্ছে, অন্যদিকে অতিরিক্ত উৎপাদন বিক্রি করে বাড়তি আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।
ভাণ্ডারবাড়ী ইউনিয়নের ভুতবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা জিলু মিয়া বলেন, দুই বছর আগে বাড়ির পাশে দুটি সাজিনার ডাল লাগিয়েছিলাম। এবার ভালো ফলন হয়েছে। পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে প্রায় দুই থেকে তিন হাজার টাকার সাজিনা বিক্রি করতে পেরেছি।
একই গ্রামের চান মিয়া বলেন, অন্যান্য সবজির তুলনায় বাজারে সাজিনার চাহিদা বেশি। অল্প সময়ের মধ্যেই সব বিক্রি হয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞরা জানান, সাজিনা (মরিঙ্গা) পুষ্টিগুণে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এতে ভিটামিন এ ও সি, ক্যালসিয়াম, আয়রনসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান রয়েছে, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক।
এ ছাড়া সজিনার রয়েছে উল্লেখযোগ্য ঔষধি গুণাগুণ। আয়ুর্বেদিক শাস্ত্র মতে, এই গাছ প্রায় ৩০০ ধরনের রোগ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। আধুনিক বিজ্ঞানও এর বহু গুণাগুণের স্বীকৃতি দিয়েছে। সজিনার কচি ডাঁটা সবজি হিসেবে সর্বাধিক ব্যবহৃত হলেও এর বাকল, শিকড়, ফুল, ফল, পাতা, বীজ এমনকি আঠাতেও রয়েছে ঔষধি বৈশিষ্ট্য।
দেশি-বিদেশি পুষ্টিবিজ্ঞানীরা সজিনাকে ‘অত্যাশ্চর্য বৃক্ষ’হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এর পাতায় রয়েছে আট ধরনের অত্যাবশ্যকীয় অ্যামাইনো অ্যাসিড এবং প্রায় ৩৮ শতাংশ আমিষ, যা অনেক উদ্ভিদেই অনুপস্থিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, সবজির তুলনায় সজিনার পাতার পুষ্টিমান আরও বেশি।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও এর গুরুত্ব বাড়ছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় সজিনা গাছকে মায়েদের ‘উত্তম বন্ধু’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, কারণ এটি সহজলভ্য ও পুষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আব্দুল বারী বলেন, সাজিনায় অন্যান্য সবজির তুলনায় অধিক পুষ্টিগুণ রয়েছে। এর পাতা, ফুল ও ফল—সবই পুষ্টিসমৃদ্ধ এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ছামিদুল ইসলাম বলেন, পরিকল্পিতভাবে বাণিজ্যিক আকারে সজিনা চাষ করা গেলে পারিবারিক পুষ্টি চাহিদা মিটিয়ে এটি লাভজনক বাণিজ্যিক কৃষিতে রূপান্তরিত হতে পারে। বিশেষ করে অনাবাদি জমিকে কাজে লাগিয়ে সহজেই এই চাষ সম্প্রসারণ সম্ভব।
সব মিলিয়ে, সহজ চাষাবাদ, কম উৎপাদন খরচ, উচ্চ পুষ্টিমান ও ঔষধি গুণাগুণের কারণে সাজিনা এখন গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে। কৃষকদের আগ্রহ ও সচেতনতা বাড়লে এই খাত ভবিষ্যতে আরও সমৃদ্ধ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আমন্ত্রণ/এজি


































