দৈনিক আমন্ত্রণ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
শুক্রবার (১৯ এপ্রিল) থেকে শুরু হচ্ছে ভারতে অষ্টাদশ লোকসভা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ পর্ব। সারা দেশে সাত দফায় এবার ভোটগ্রহণ চলবে। শেষ দফার ভোটগ্রহণ হবে ১ জুন। ভোট গণনা এবং ফল ঘোষণা হবে ৪ জুন। ইতোমধ্যেই এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দলের প্রচার-প্রচারণাসহ দেশজুড়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা তুঙ্গে উঠেছে।
ভারত বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। তাই শুধু সেদেশেই নয়, বিদেশেও ভারতের সাধারণ নির্বাচনকে ঘিরে উত্তেজনা এবং আগ্রহ রয়েছে। এতদ্বতীত, এশিয়া মহাদেশে ভারত এই মুহূর্তে চিনের পাশাপাশি এক গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। সে কারণেও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, ফ্রান্সসহ পাশ্চাত্যের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোও ভারতের নির্বাচনের ওপর নজর রাখছে। প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা এ নির্বাচনের সংবাদ সংগ্রহ করতে ভারতে পৌঁছেছেন। নির্বাচনকে অবাধ এবং শান্তিপূর্ণ করার জন্য দেশটির নির্বাচন কমিশন বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
এবারের লোকসভা নির্বাচনে দেশটিতে মোট ভোটার সংখ্যা ৯৬ কোটি ৮৮ লাখ ২১ হাজার ৯২৬। ২০১৯ সালের তুলনায় পুরুষদের চেয়ে মহিলা ভোটারের সংখ্যা ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
নির্বাচন বরাবরই এক অনিশ্চয়তার খেলা। শেষ পর্যন্ত কে বাজিমাত করবে তা আগে থেকে ভবিষ্যৎ বাণী করা সম্ভব নয়। তবে বিভিন্ন সমীক্ষক সংস্থা সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে ভোটারদের মন বোঝার চেষ্টা করছে এবং প্রায় সবার সমীক্ষাতেই একটা বিষয় পরিষ্কার হয়েছে যে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি তৃতীয়বারের মতো কেন্দ্রে সরকার গড়তে যাচ্ছে। কোনো কোনো সমীক্ষা বলছে, গতবারের আসন সংখ্যার চেয়েও বিজেপি এবার বেশি আসন লাভ করবে। স্বয়ং নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, বিজেপি একাই এবার ৩৭০ আসন লাভ করবে। বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট পাবে ৪০০-এর বেশি আসন। নির্বাচনের ফল যদি তাই হয়, তবে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নায়ক ও দেশটির প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর পর নরেন্দ্র মোদি হবেন দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী যিনি টানা তিন মেয়াদে দেশ শাসন করবেন।
উল্লেখ্য, ভারতে লোকসভার আসনসংখ্যা ৫৪৩। সংখ্যা গরিষ্ঠতা লাভের জন্য ন্যূনতম ২৭৩টি আসন দরকার। বর্তমানে সপ্তদশ লোকসভায় বিজেপির একক আসন সংখ্যা ৩০৩। বিজেপির শরিকদের আসন সংখ্যা ৫০। বর্তমান লোকসভার মেয়াদ ১৬ জুন শেষ হবে। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন হাউস গঠন করতে হয়।
বিজেপির কাছে এবার প্রধান চ্যালেঞ্জ গত নির্বাচনের এই বিপুল সাফল্যকে ধরে রাখা এবং আরও বেশি সংখ্যক আসন জিতে আসা। নির্বাচনে সাফল্য পেতে বিজেপির প্রধান ভরসা নরেন্দ্র মোদির ভাবমূর্তি। এ কথা অনস্বীকার্য যে এই মুহূর্তে জাতীয় রাজনীতিতে নরেন্দ্র মোদির বিকল্প কোনো নেতা নেই। ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এখন মনে করেন, নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বেই ভারত প্রগতি এবং উন্নতির পথে এগিয়ে যেতে পারবে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মহলে নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তাও দেশের ভেতরে নরেন্দ্র মোদিকে এগিয়ে রেখেছে। নরেন্দ্র মোদির এই ভাবমূর্তির ওপর নির্ভর করে লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ বিজেপির কাছে কোনো কঠিন বিষয় নয়। অন্যদিকে কংগ্রেস এবং অন্য বিরোধীরা নরেন্দ্র মোদির বিকল্প হিসেবে কোনো গ্রহণযোগ্য মুখ তুলে ধরতে পারেননি। বরং ভোটগ্রহণের দিন যত এগিয়ে আসছে ততই তাদের দিশেহীন অবস্থা প্রকট হচ্ছে।
লোকসভায় বিজেপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া নিয়ে কারও কোনো দ্বিধা না থাকলেও, কোনো কোনো সমীক্ষক অবশ্য মনে করছেন বিজেপির আসন সংখ্যা এবার গতবারের তুলনায় কমতে পারে। এর কারণ হিসেবে তারা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে তুলে ধরছেন। তারা বলছেন, দেশে গত কয়েক বছরে ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের হার এবং তার সমাধানে কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যর্থতা, অস্বাভাবিক দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধি, সামাজিক ভারসাম্য ক্রমেই নষ্ট হতে বসা, উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের বাড়াবাড়ি এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উদ্বেগ এগুলোর খেসারত কিছুটা হলেও বিজেপির সরকারকে দিতে হবে। উত্তর-পূর্ব ভারতের মণিপুর, মিজোরাম, অরুণাচলপ্রদেশ, পূর্ব ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, বিহার, ওড়িশা, পশ্চিমে গুজরাট, মহারাষ্ট্র, দক্ষিণে কেরল, তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ, কর্ণাটকে বিজেপির আসন কমবে। উত্তরে হিমাচল প্রদেশেও বিজেপি আশানুরূপ ফল করবে না। দিল্লি, পাঞ্জাব এবং হরিয়ানাতেও বিজেপির ফল আশানুরূপ হবে না। বর্তমানে বিজেপি এককভাবে এবং শরিকদের সঙ্গে জোট গড়ে ১৮টি বিধানসভায় ক্ষমতায় রয়েছে। এ বিধানসভার প্রায় প্রত্যেকটিতেই বিজেপি বিরোধীদের ধূলিসাৎ করে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় আসনসংখ্যা জোগাড় করে নিতে পারে। কী হবে তা এখনই বলা যায় না। তার জন্য ৪ জুন পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে।
দুই বাংলার বাঙালিরা অবশ্য বেশি আগ্রহী পশ্চিমবঙ্গের ভোটের ফলাফল কী হবে তা নিয়ে। দেশের অন্যান্য অংশের মতোই পশ্চিমবঙ্গে ভোট গ্রহণ হবে সাত দফাতেই। প্রথম দফা শুরু হবে আজ। শেষ দফা ১ জুন। ফলাফল ৪ জুন। গত লোকসভা নির্বাচনে এই রাজ্যে বিজেপি উল্লেখযোগ্য ফল করেছিল। ১৮টি আসন লাভ করেছিল। ২২টি আসন লাভ করেছিল তৃণমূল কংগ্রেস। ২টি আসন গিয়েছিল কংগ্রেসের ঝুলিতে।
এবার বিজেপি তাদের ১৮ টি আসন ধরে রেখে আরও এগুতে পারে কি না সে দিকে সবার নজর রয়েছে। স্বয়ং অমিত শাহ নিজে এবার বাংলায় এসে দলের কাছে ৩৫ টি আসনের লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দিয়েছেন। নরেন্দ্র মোদি বলছেন ৪২ টি আসনে জেতার লক্ষ্য নিয়ে এবার এগোতে হবে। ৪০০ আসনের লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে গেলে যে বাংলা থেকে আরও আসন দখল করতে হবে সেটা মোদি-শাহ জানেন। সে জন্য পশ্চিমবঙ্গে জেতার ব্যাপারে তারা বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। ইতোমধ্যেই এই রাজ্যে ঘনঘন প্রচারে আসছেন মোদি-শাহ। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনেও মোদি-শাহ পশ্চিমবঙ্গের ওপর সবিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
বিজেপি নেতৃত্ব যতই দাবি করুণ না কেন, নির্বাচনী বিশেষজ্ঞ এবং সমীক্ষকরা সকলেই একমত হচ্ছেন যে, এবারের নির্বাচনে বাংলায় বিজেপির আসন কমবে। উত্তরবঙ্গে কিছু আসন বিজেপি পেলেও দক্ষিণবঙ্গে বিজেপির ভরাডুবি হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
নির্বাচনি বিশ্লেষক এবং সমীক্ষকরা বলছেন যে, জাতীয় স্তরে নরেন্দ্র মোদির বিকল্প যেমন কোনো নেতা নেই তেমনি বাংলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিকল্প কেউ নেই। ফলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অনেকটাই অপ্রতিরোধ্যভাবেই এগুবেন। জাতীয় স্তরে বিজেপি অনেক এগিয়ে থাকলেও বাংলায় তার প্রভাব তেমন পড়বে না।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই এগিয়ে থাকার অনেক কারণ রয়েছে। যার অন্যতম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের চালু করা বেশ কিছু সামাজিক প্রকল্প যার সুফল বাংলার গ্রামীণ এবং প্রান্তিক মানুষ পেয়েছেন। এই সব প্রকল্পের ভেতর লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রী, স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পগুলো রয়েছে। এ ছাড়া গ্রামীণ এলাকায় সড়ক ব্যবস্থার উন্নতি, বিদ্যুৎ এবং পানীয় জল সরবরাহ, সরকারি হাসপাতাল এবং স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোর উন্নতি সাধনও মমতার আমলেই হয়েছে। এসব কারণে গ্রামীণ এবং প্রান্তিক মানুষের বৃহদংশের সমর্থন তার প্রতি রয়েছে। এই রাজ্যের এক বড় অংশের ভোটার মুসলমান সম্প্রদায়ভুক্ত। তারা মনে করে, মমতার আমলে সামাজিকভাবে তারা নিরাপদ রয়েছে। ফলে তাদের বৃহদংশের ভোটও মমতার দিকে যাবে। মহিলাদের জন্য মমতার চালু করা নানা প্রকল্পে মহিলা ভোটারদের একটা বড় অংশের সমর্থন মমতা বরাবরই পান। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে বলে মনে করছেন না নির্বাচনী বিশ্লেষকরা।
এর উল্টোদিকে বিজেপির হাল যথেষ্টই খারাপ। গত লোকসভা নির্বাচনে মোদি হাওয়ায় ভর করে ১৮ টি আসন জেতার পরেও এ রাজ্য থেকে নির্বাচিত বিজেপি সাংসদরা তাদের নির্বাচনী কেন্দ্রের উন্নতিকল্পে কোনো কাজই প্রায় করেনি। তা নিয়ে ভোটারদের ভেতর ব্যাপক ক্ষোভ রয়েছে। তার কিছুটা আঁচ পাওয়া গিয়েছিল ২০২১ -এর বিধানসভা নির্বাচনে। ওই নির্বাচনে মোদি-শাহ বাংলায় এসে ২০০ আসন জেতার কথা বললেও ৭০-এর বেশি আসন পায়নি বিজেপি। সাংগঠনিক দিক দিয়েও বিজেপি এই রাজ্যে যথেষ্ট দুর্বল। উত্তরবঙ্গে কিছুটা সংগঠন থাকলেও, দক্ষিণবঙ্গে বিজেপির সংগঠন বলতে প্রায় কিছুই নেই। যেটুকু আছে তার ভেতর এত গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব যে তার ওপর ভর করে নির্বাচনে লড়া মুশকিল।
এ ছাড়া বিজেপির নেতৃত্বে অন্য রাজ্য থেকে আসা অবাঙালি নেতৃত্ব এবং বাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে তাদের আত্মস্থ না হতে পারাটিও বাংলার মানুষ ভালোভাবে নিচ্ছে না। ২০২১-এ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির এই রাজ্যে ভরাডুবি হওয়ার একটা অন্যতম কারণ ছিল এই অবাঙালি নেতৃত্ব।
পাশাপাশি বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি বাংলায় ব্যর্থ হয়েছে। চরিত্রগতভাবে অসাম্প্রদায়িক বাঙালি ধর্মীয় রাজনীতি কখনো মেনে নেয়নি। রাম মন্দির ইস্যু বাংলায় কোনো ছাপই ফেলেনি। অতি সম্প্রতি বিজেপি যে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন চালু করেছে তা শেষ পর্যন্ত বিজেপিকেই অস্বস্তিতে ফেলেছে। এই আইনের ফলে নাগরিকত্ব হারাতে হতে পারে বলে আশঙ্কিত হয়ে পড়েছে বাংলাদেশ থেকে চলে আসা বহু মানুষই। শেষ পর্যন্ত ভোটের ফলাফল কী হবে তা জানে একমাত্র ভোটাররাই। তারা কাকে সমর্থন করবে তা নিয়ে মুখ খুলতে নারাজ। যে যার নিজের ভোটটা নিঃশব্দেই দিয়ে আসবে। তবে এটুকু আঁচ করা যাচ্ছে দিল্লিতে মোদি আর বাংলায় দিদি তাদের কর্তৃত্ব বজায় রাখবেন এবারও।


































