বগুড়া ব্যুরো :
বগুড়ার শিবগঞ্জে ৪০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে লাপাত্তা হয়েছেন দেশবন্ধু সোলার অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ও সূর্যের আলো সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি লিমিটেডের পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম। গত ১০ দিন ধরে তিনি লাপাত্তা রয়েছেন। বর্তমানে তিনি অফিসের কর্মীদের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছেন। গ্রাহকরা তাদের ডিপোজিটের লাভের টাকা না পেয়ে কর্মীদের ওপর চাপ দিচ্ছে। এসব কারণে সাধারণ গ্রাহকরা ক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিষ্ঠানটির সব শাখায় তালা ঝুলিয়ে দেয়। এদিকে টাকা ফেরতের দাবিতে বৃহস্পতিবার শত শত গ্রাহক অফিসের সামনে মানববন্ধন করেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশবন্ধু সোলার অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ও সূর্যের আলো সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি লিমিটেডের পরিচালক জাহাঙ্গীর আলমের শ্বশুরবাড়ি শিবগঞ্জ উপজেলার শিবগঞ্জ ইউনিয়নের হুদাবালা দক্ষিণপাড়া গ্রামে। সেই গ্রামের পাশে গুজিয়া বন্দরে গড়ে তোলেন দেশবন্ধু ও সূর্যের আলো সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি। পরে সূর্যের আলো সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতির নামে রেজি নম্বর নেন। যার নম্বর বগুড়া/৪৯/২০১৭।
রবিবার দুপুরে গ্রাহকরা অভিযোগ করে বলেন, জাহাঙ্গীর আলম এই সমিতি চালু করার পর শিবগঞ্জের আনাচে কানাচে একাধিক নারী মাঠকর্মীদের নিয়োগ দিয়ে ননজুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়ে চুক্তিনামা করে প্রতি মাসে ডিপোজিটের মাধ্যমে প্রতি লাখে ২ হাজার টাকা লাভের লোভনীয় প্রলোভন দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রায় ৪০ কোটি টাকা তুলে নিয়ে লাপাত্তা হয়েছেন।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয় শিবগঞ্জ সদর ইউনিয়নের গুজিয়ায়। দেশবন্ধু সোলার অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স তার ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান হলেও কৌশলে সমবায় থেকে রেজিস্ট্রেশন নেওয়া সূর্যের আলো সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি লিমিটেডকে সাইনবোর্ড হিসেবে ব্যবহার করে এ প্রতারণা করেছে। প্রতিষ্ঠানটির সারা উপজেলায় বেশ কয়েকটি শাখা রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির নারী মাঠকর্মী ফেন্সি বেগম ও রাজিয়া বেগম বলেন, গত ১০ দিন ধরে আমাদের এমডি জাহাঙ্গীর আলম লাপাত্তা হয়েছেন। তিনি আমাদের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছেন। গ্রাহকরা তাদের ডিপোজিটের লাভের টাকা না পেয়ে আমাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। আমরা টাকা দিতে না পেরে নিরূপায় হয়ে আছি। সাধারণ গ্রাহকরা আমাদের শাখা অফিসসহ প্রতিষ্ঠানটির সব শাখায় তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন। আরেক নারী কর্মী রাফিয়া বেগম বলেন, আমি ৩৫ লক্ষাধিক টাকা জাহাঙ্গীর আলমকে মাঠ পর্যায় থেকে সংগ্রহ করে দিয়েছি। প্রতিষ্ঠানের পরিচালক আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছেন। গ্রাহকরা আমাদের কাছে টাকার জন্য ভিড় করছে। এমডি একজন প্রতারক। সে আমাদের ও সাধারণ গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। তিনি শিবগঞ্জে বেশ কয়েকটি এজেন্ট ব্যাংকিংক সেবা পরিচালনা করতো বলেও জানান।
ওই প্রতিষ্ঠানে ৭ লাখ টাকা ডিপোজিট রাখা ভুক্তভোগী রেকসোনা বেগম, ৫ লাখ ৩০ হাজার টাকা ডিপোজিট রাখা ভুক্তভোগী জাহেদুল ইসলাম, ৩লাখ টাকা ডিপোজিট রাখা ভুক্তভোগী আবু মুসা, ৪লাখ টাকা ডিপোজিট রাখা ভুক্তভোগী আজগর আলী, ৪০ হাজার টাকা ডিপোজিট রাখা ভুক্তভোগী শিউলী বেগম বলেন, আমানতের লাভ না দিয়ে প্রতিষ্ঠানের পরিচালক জাহাঙ্গীর পালিয়ে গেছেন। তারা আসল টাকা হারাতে বসেছেন। এখন তাদের পথে বসার উপক্রম হয়েছে।
গুজিয়া বন্দর ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবু জাফর মন্ডল বলেন, জাহাঙ্গীর আলম দেশবন্ধু নামে সুপার সপসহ বেশ কয়েকটি ব্যাংকিং সেবা ও সমবায় সমিতি পরিচালনা করতো। গত কয়েক দিন ধরে সে গা ঢাকা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানের সাধারণ গ্রাহকরা তার প্রতিষ্ঠানে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে। তিনি এ এলাকা থেকে কয়েক কোটি টাকা নিয়ে তুলে নিয়ে নিজেকে আড়াল করে রেখেছেন। শুধু তাই নয়, তার স্ত্রী সুলতানা পারভীন পলিকে নিয়ে তিনি বিদেশে পারি জমানোর জন্য অপচেষ্টা করছেন। তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অনুরোধ করেন যাতে জাহাঙ্গীর তার সহপরিবারে বিদেশে যেতে না পারে তাদের আটক করে আইনের আওতায় আনার জন্য।
শিবগঞ্জ উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা রাজিয়া সুলতানা বলেন, সমবায় সমিতির আইনে ফিক্সড ডিপোজিট রাখার কোনো নিয়ম নেই। সে সমিতির সদস্যদের বাইরে কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না। সমিতি রেজিস্ট্রেশনের সময় যে সদস্য দেখিয়েছে তারা অভিযোগ করলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু যারা সদস্য নয় তাদের দায় আমাদের না।
সূর্যের আলো সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি লিমিটেডের পরিচালক দেশবন্ধু জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার জন্য তার শ্বশুর বাড়িতে গেলে ঘরে তালা ঝোলানো দেখা যায়।
প্রতিবেশীরা জানান, কিছু দিন ধরেই তাদের বাড়িতে দেখা যাচ্ছে না। তারা গা ঢাকা দিয়েছে। পরবর্তীতে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে ফোন বন্ধ থাকায় তা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে শিবগঞ্জ থানার ওসি আবদুল হান্নানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি শুনেছি। তবে এখন কেউ অভিযোগ দেননি। অভিযোগ পেরে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আমন্ত্রণ/এসিজি


































