বগুড়া ব্যুরো ও গাবতলী প্রতিবেদক :
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে বগুড়ার গাবতলীতে ৪০০ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী পোড়াদহ মেলা স্থগিত করা হয়েছে।
প্রতি বছরের বাংলা সনের শেষ বুধবার অথবা ফাল্গুন মাসের প্রথম বুধবার এক দিনের জন্য এই মেলা হয়ে থাকে। এই দিনটির জন্য অপেক্ষায় থাকে ইছামতী নদী পাড়ের পোড়াদহ গ্রাম। এই সময়টাতেই নদীপাড়ে বাজে উৎসবের সুর, নামে মানুষের ঢল। শুধু একটি গ্রাম নয়, পুরো বগুড়ার গাবতলী উপজেলা যেন রঙিন হয়ে ওঠে ঐতিহ্যবাহী পোড়াদহ মেলাকে ঘিরে। স্থানীয়ভাবে যা পরিচিত ‘জামাই মেলা’ নামে। কিন্তু এবার আর দেখা যাবে না সেই চিরচেনা দৃশ্য। থমকে গেছে শতবর্ষী ঐতিহ্যের স্রোত। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে চলতি বছর স্থগিত করা হয়েছে এই ঐতিহ্যবাহী মেলা।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগের দিন পড়েছে মাঘ মাসের শেষ বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি)। এ কারণে এ বছর পোড়াদহ মেলা আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। পাশাপাশি ফাল্গুনের প্রথম বুধবারেও মেলা করার সুযোগ নেই। কারণ, বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ১৯৫৯ সালের আদালতের একটি পুরোনো রায়।
পোড়াদহ মেলার আয়োজকদের (জমির মালিক) একজন ও গাবতলী উপজেলার মহিষাবান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ মণ্ডল বলেন, ১৯৫৯ সালে তৎকালীন সরকারের সঙ্গে মেলার আয়োজকদের একটি মামলা হয়। সেই মামলার রায়ে আদালত নির্দেশ দেন মাঘের শেষ বুধবার অথবা ফাল্গুনের প্রথম বুধবারের মধ্যেই পোড়াদহ মেলা আয়োজন করতে হবে। এর ব্যতিক্রম হলে মেলার খাজনা সরকার গ্রহণ করবে এবং মেলাটি সরকারি ব্যবস্থাপনায় চলে যাবে।
তিনি আরও জানান, নিয়ম অনুযায়ী যদি মাঘ মাসের শেষ বুধবার ২৫ তারিখে পড়ে, তাহলে ফাল্গুনের প্রথম বুধবার মেলা হয়। আর যদি ২৬ তারিখ বা তার পরে পড়ে, তাহলে মাঘের শেষ বুধবারেই মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এবার মাঘের শেষ বুধবার পড়েছে ২৮ তারিখে। সে অনুযায়ী ওই দিনেই মেলা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যেহেতু সেটি জাতীয় নির্বাচনের আগের দিন, তাই মেলা আয়োজন সম্ভব হয়নি।
আব্দুল মজিদ মণ্ডল জানান, পোড়াদহ মেলার পরদিন অনুষ্ঠিত হয় আরেকটি ঐতিহ্যবাহী আয়োজন ‘বউ মেলা’। কিন্তু নির্বাচনের কারণে ওই দুই দিন সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ থাকবে, যানবাহন চলাচলও সীমিত থাকবে। মানুষ ভোট নিয়ে ব্যস্ত থাকবে নাকি মেলায় যাবে এই দ্বিধা থেকেই মেলা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আদালতের রায় অনুযায়ী পরে মেলা আয়োজনের সুযোগও নেই।
পোড়াদহ মেলার ইতিহাস শুধু একটি উৎসবের নয়, এটি কয়েক শতাব্দীর ঐতিহ্যের বাহক।
জানা যায়, প্রায় ৪০০ বছর আগে গাবতলীর পোড়াদহ গ্রামে এক সন্ন্যাসীর আবির্ভাব ঘটে। তাঁর আগমনকে কেন্দ্র করে গ্রামের একটি বটগাছের নিচে গড়ে ওঠে আশ্রম। সেখানে শুরু হয় পূজা। সেই পূজাকে কেন্দ্র করেই পরবর্তীতে পোড়াদহ মেলার সূচনা।
প্রায় আড়াই শতাব্দীর বেশি সময় ধরে নিয়মিতভাবে এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। মেলাকে কেন্দ্র করে জামাইরা শ্বশুরবাড়িতে আসেন, বাড়ি বাড়ি চলে আপ্যায়ন। পরদিন নারীদের জন্য থাকে আলাদা আনন্দের আয়োজন বউ মেলা’।
পোড়াদহ মেলা মানেই ইছামতী নদীর তীরে কেনাকাটা, গল্প আর হাসির মিলনমেলা। কিন্তু এবার সেই গল্প নেই। থাকবে না মানুষের ভিড়, বাজবে না উৎসবের সুর। একটি নির্বাচন আর আদালতের পুরোনো রায়ে থমকে গেল শতবর্ষী এই ঐতিহ্য।
আমন্ত্রণ/এজি


































