অমর চাঁদ গুপ্ত অপু :
দিনাজপুরের ফুলাড়ীতে বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পানি প্রবাহের ক্যানেলের পানি থেকে সঞ্জিত চন্দ্র রায়ের (৩৫) মরদেহ উদ্ধার ঘটনায় অজ্ঞাতনামা ৬-৭ জন যুবকের বিরুদ্ধে থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। ঘটনার পরদিন শুক্রবার (১২ এপ্রিল) নিহত সঞ্জিত চন্দ্র রায়ের স্ত্রী শ্রীমতি প্রিয়াংকা রানী পিংকি বাদী হয়ে ওই হত্যা মামলাটি দায়ের করেছেন। যার থানার মামলা নং-০৭। ধারা-৩০২/৩৪ পেনাল কোড ১৮৬০।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার (১১ এপ্রিল) বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পানি প্রবাহের ক্যানেলের ফুলবাড়ী উপজেলার ৭নং শিবনগর ইউনিয়নের দুধিপুর এলাকায় ঈদ উপলক্ষে কিছু দোকান বসে। ওইদিন বিকেল ৫টার দিকে সঞ্জিত চন্দ্র রায় তার স্ত্রী শ্রীমতি প্রিয়াংকা রানী পিংকি ও শ্যালিকা বৃষ্টি রায়কে সাথে নিয়ে সেখানে কেনাকাটা করতে যান। সেখান থেকে সাড়ে ৬ টার দিকে স্ত্রী ও শ্যালিকাকে বাড়ীতে রেখে পুনরায় মোটরসাইকেল যোগে সেখানে যাওয়ার সময় ক্যানেলের ফুটব্রিজের রাখা তিনটি মোটরসাইকেলের একটিতে সঞ্জিত চন্দ্র রায়ের মোটরসাইকেল দিয়ে সামান্য ধাক্কা (ঘসা) লাগে। এতে ব্রিজের ওপর অবস্থানকারী অজ্ঞাত পরিচয়ের ৬-৭ জন যুবক সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে সঞ্জিত চন্দ্র রায়কে বেধড়ক মারপিট করে ক্যানেলে প্রায় ৩০ ফুট গভীরের ভেতর ফেলে দেয়। এতে ক্যানেলের মধ্যেই সঞ্জিত চন্দ্র রায়ের মৃতু্য হয়।
মামলার বাদী শ্রীমতি প্রিয়াংকা রানী পিংকি বলেন, ঈদের দোকান থেকে কেনাকাটা করে বাড়ীতে এসে রাতের রান্না করার এক পর্যায়ে গ্রামের কয়েকজন আত্মীয় জানান, স্বামী সঞ্জিত চন্দ্র রয়ের মরদেহ তাপবিদু্যতের ক্যানেলের পানিতে ভাসছে। বিষয়টি জানার পরপরই বাড়ীর সকলে সেখান গিয়ে পানি থেকে সঞ্জিত চন্দ্র রায়কে উদ্ধার করে ফুলবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ওইরাতেরই ঘটনাস্থল থেকে স্বামী সঞ্জিত চন্দ্র রায়ের মোটরসাইকেলসহ ঘাতকদের একটি এ্যাপাচি আরটিআর ১৬০ সিসি এর মোটরসাইকেল থানায় জমা দেন গ্রামের লোকজন। পরদিন শুক্রবার (১২ এপ্রিল) থানা পুলিশ লাশ ময়না তদন্তের জন্য দিনাজপুর এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। বাড়ীতে এসে জানতে পারেন তাদেরকে বাড়ীতে পৌঁছে দিয়ে পুনরায় ঈদ বাজারে যাওয়ার সময় ক্যানেলের ফুটব্রিজের ওপর আড্ডা দিতে অবস্থানকারী অজ্ঞাত পরিচয়ের ৬-৭ জন যুবকের ব্রিজের ওপর রাখা তিনটি মোটরসাইকেলের একটিতে সঞ্জিত চন্দ্র রায়ের মোটরসাইকেল দিয়ে সামান্য ধাক্কা (ঘসা) লাগে। এ সময় ওই যুবকরা সঞ্জিত চন্দ্র রায়কে বেধড়ক পিটিয়ে প্রায় ৩০ ফুট গভীরের ক্যানেলে ভেতর ফেলে দিয়ে হত্যা করেছে। এমন তথ্য ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী একই গ্রামের মৃত গোষ্ট বিহারীর ছেলে শ্রী কোকিল বিহারী (৫০), বাঘাচড়া গ্রামের খিতিশ চন্দ্র রায়ের ছেলে তপন চন্দ্র রায় (৩০) ও পাবর্তীপুর উপজেলার শেরপুর (মহেন্দ্রপাড়া) গ্রামের অমূল্য রায়ের ছেলে শ্রী সুমনসহ আরো বেশ কয়েকজন জানিয়েছেন। স্বামীকে হত্যার পর তাদের ৬ বছরের একমাত্র ছেলে শিশির রায় ধ্বনি সব সময় বাবাকে খুঁঁজছে। বাবাকে না পেয়ে খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। সেসব সময় তার বাবার সঙ্গেই খাওয়া করতো। এই এতিম ছেলেকে কিভাবে মানুষ করবেন এমন চিন্তাই তিনি বিচলিত হয়ে পড়েছেন।
ঘটনার প্রত্যেক্ষদর্শী ও মামলার সাক্ষী ও কোকিল বিহারী (৫০) বলেন, ঈদ বাজারে থাকার সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে দেখতে পান ক্যানেলের ফুট ব্রিজের ওপর কয়েকজন অজ্ঞাত পরিচয়ের যুবক সঞ্জিত চন্দ্র রায়কে মারপিট করছে। ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদেরকে নিবৃত করার চেষ্টা করেন। যুবকরা তার কথায় কর্ণপাত না করে সঞ্জিত চন্দ্র রায়কে মারপিট করার এক পর্যায়ে তারা তাকে ক্যানেলের নিচে ফেলে দেয়। এরপরই যুবকরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেয়। এ সময় তাদের তিনটি মোটরসাইকেলের মধ্যেই চাবি লাগানো থাকায় তিনি চাবি তিনটি নিয়ে এলাকা থেকে চলে যেতে বাধা দেওয়ার পাশাপাশি চিৎকার দেন। এ সময় যুবকরা তার কাছ থেকে জোরপূর্বক দুইটি মোটরসাইকেলের চাবি নিতে পারলেও একটি মোটরসাইকেলে চাবি তিনি পার্শ্বে ফেলে দেন। ফলে একটি মোটরসাইকেল ফেলে দিয়েই ঘাতকরা পালিয়ে যায়। পরে মোটরসাইকেলটি থানায় জমা দেওয়া হয়েছে।
নিহত সঞ্জিত চন্দ্র রায়ের বাবা খগেশ্বর রায় (৫৫) বলেন, ‘আমার ছেলে কারো সাথে কোনোদিন ঝগড়া করেনি। এরপরও আমার ছেলেকে কেন মেরে ফেললো ঘাতকরা। আমি কাকে নিয়ে বাঁচবো। একটাই ছেলে ছিল পরিবারের অবলম্বন তাকেও কেড়ে নিল ঘাতকরা। আমি ঘাতকদের ফাঁসি চাই। তাদের ফাঁসি হলে আমার ছেলের আত্মা শান্তি পাবে।’
নিহত সঞ্জিত চন্দ্র রায়ের মা বীনা রানী (৪৮) বলেন, আমাদের বৃদ্ধ বয়সের অবলম্বন ছিল একমাত্র বুকের ধন সঞ্জিত। তাকেও আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিল ঘাতকরা। এদের যেন বিচার হয়। বিচার না হলে আমার ছেলের আত্মা শান্তি পাবে না। আপনারা সবাই মিলে ঘাতকদের বিচারের ব্যবস্থা করেন।
ফুলবাড়ী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মোস্তাফিজার রহমান বলেন, যেহেতু মামলার আসামীরা অজ্ঞাতনামা। তবুও আটক মোটরসাইকেলের সূত্র ধরে হত্যাকারিদের অনেকটাই সনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। খুব শিঘ্রই তাদেরকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।
উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার (১১ এপ্রিল) সন্ধ্যায় বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক তাপবিদু্যৎ কেন্দ্রের পানি প্রবাহের ক্যানেলের ফুলবাড়ী উপজেলার শিবনগর ইউনিয়নের দুধিপুর এলাকা থেকে সঞ্জিত চন্দ্র রায়ের (৩৫) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত সঞ্জিত চন্দ্র রায় ফুলবাড়ী উপজেলার শিবনগর ইউনিয়নের দুধিপুর (হিন্দুপাড়া) গ্রামের খগেশ্বর রায়ের ছেলে।
ফুলবাড়ীতে তাপবিদু্যতের ক্যানেল থেকে মরদেহ উদ্ধার ঘটনায় অজ্ঞাতনামা ৬-৭ জন যুবকের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের, ঘাতকদের ১টি মোটরসাইকেল জব্দ
এপ্রিল ১৫, ২০২৪


































