আজহার ইমাম, বিরামপুর (দিনাজপুর) প্রতিবেদক :
বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখে দিনাজপুরের বিরামপুরে বসেছে প্রায় ৪০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী শিব পূজা ও বৈশাখী মেলা। বিরামপুর পৌর এলাকার মির্জাপুর শিব মন্দির চত্বরে আয়োজিত এ মেলাকে ঘিরে সকাল থেকেই মানুষের ঢল নেমেছে। দূর-দূরান্ত থেকে আগত হাজারো দর্শনার্থী ও ভক্তদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা।
ভোর থেকেই মন্দির প্রাঙ্গণে শুরু হয় শিব পূজা ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা। পূজা শেষে মেলার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলে একে একে ভিড় বাড়তে থাকে। দুপুর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মেলা প্রাঙ্গণ জনসমুদ্রে পরিণত হয়। নারী, পুরুষ, শিশু—সব বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে এক প্রাণবন্ত উৎসবে রূপ নেয় পুরো আয়োজন।
আয়োজক সূত্রে জানা গেছে, বিরামপুরের তৎকালীন রাজা ভৈরব চন্দ্র বাংলা ১১১১ সনে মির্জাপুর জামলেশ্বর মন্দিরে চৈত্র সংক্রান্তির দিনে শিব পূজা ও মেলার সূচনা করেন। সেই সময় প্রজারা খাজনা দিতে এসে পূজা ও মেলায় অংশ নিতেন। দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে এ মেলা শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এটি এখন বৃহৎ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। পার্শ্ববর্তী জেলা থেকেও মানুষ এ মেলায় অংশ নিতে আসেন।
মন্দির কমিটির সভাপতি (অবসরপ্রাপ্ত) অধ্যক্ষ শিশির কুমার সরকার বলেন, “প্রতিবছরের মতো এবারও যথাযোগ্য মর্যাদায় শিব পূজা ও বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়েছে। শত বছরের ঐতিহ্য ধরে রাখতে আমরা বদ্ধপরিকর। আজ সকাল থেকেই মানুষের ব্যাপক সাড়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে।”
বাংলাদেশ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের বিরামপুর উপজেলা আহ্বায়ক পবন কুমার শীল বলেন, “পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে এ মেলাকে ঘিরে এলাকায় উৎসবের আমেজ তৈরি হয়েছে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই এখানে অংশ নিচ্ছেন। স্থানীয় প্রশাসন ও এলাকাবাসীর সার্বিক সহযোগিতায় অনুষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে চলছে।”
মেলায় গ্রামীণ ঐতিহ্যের নানা উপকরণে সাজানো হয়েছে অসংখ্য দোকানপাট। মাটির তৈরি খেলনা, বাঁশ ও কাঠের জিনিসপত্র, হস্তশিল্প, কাঁচের চুড়ি, রঙিন সামগ্রী, মিষ্টি ও বিভিন্ন খাবারের দোকান ক্রেতাদের আকর্ষণ করছে। শিশুদের জন্য রয়েছে নাগরদোলা, দোলনা ও বিভিন্ন বিনোদনমূলক আয়োজন। পরিবার-পরিজন নিয়ে আগত দর্শনার্থীরা আনন্দঘন পরিবেশে সময় কাটাচ্ছেন।
মেলায় আগত দর্শনার্থীদের মধ্যে অনেকেই জানান, এ মেলা তাদের কাছে শুধু বিনোদনের স্থান নয়, বরং শেকড়ের টানে ফিরে আসার এক অনন্য উপলক্ষ। বছরের এই একটি দিনে পুরোনো বন্ধু-স্বজনদের সঙ্গে দেখা হওয়ার আনন্দও মেলাটিকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়ে বিরামপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাইফুল ইসলাম সরকার বলেন, “মেলায় আগত সকলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। সার্বক্ষণিক নজরদারির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে।”
শতবর্ষের ঐতিহ্য, ধর্মীয় আবহ ও গ্রামীণ সংস্কৃতির অপূর্ব সমন্বয়ে বিরামপুরের এই বৈশাখী মেলা এখন উত্তরাঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। পহেলা বৈশাখের আনন্দকে ঘিরে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এ মেলা আবারও প্রমাণ করেছে—ঐতিহ্য কখনো হারিয়ে যায় না, বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে নতুন রূপে বেঁচে থাকে।
আমন্ত্রণ/এজি
পহেলা বৈশাখে বিরামপুরে ঐতিহ্যবাহী মেলায় মানুষের ঢল
এপ্রিল ১৪, ২০২৬


































