দিনাজপুর সংবাদদাতা :
দিনাজপুরের হিন্দু জনসাধারনের ব্যবহারের জন্য মহারাজা জগদীশ নাথ রায় বাহাদুরের গোশালার সম্পত্তি জাল কাগজপত্র তৈরী করে বিক্রির ষড়যন্ত্র শুরু করেছে একটি কু-চক্রী মহল। এ ষড়যন্ত্রের কথা প্রকাশ হতেই সকল শ্রেণির হিন্দু জনসাধারণের মাঝে ক্ষোভের সৃস্টি হয়েছে।
গোয়েন্দা বিভাগের লোকজনের নড়াচড়া শুরু হওয়ায় ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত কু-চক্রী মহলের কেউ কেউ ইতিমধ্যে গা ঢাকা দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। কুচক্রী মহলের এই ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র রুখতে হিন্দু জনসাধারনের পক্ষে আদালতে একটি মামলা (যার নং ৭৫/২০২৪ অন্য) দায়ের করা হয়েছে।
হিন্দু জনসাধারণের পক্ষে দিনাজপুর যুগ্ম জেলা জজ (১ম) আদালতে দায়ের করা মামলার বাদী ও পিঞ্জরাপোল সোসাইটির (গোশালা) সভাপতি এ্যাডভোকেট দ্বিজেন্দ্র নাথ রায় মামলার আরজীতে উল্লেখ করেন, দিনাজপুর সদর থানার উত্তর গোসাইপুর মৌজায় সি.এস-৬৫, এস.এ-১৮৫ এবং আর.এস-১৪নং খতিয়ানে ১৭.৭৯ একর সম্পত্তি বিদ্যমান ছিল। উক্ত সম্পত্তি আর.এস-১৪নং খতিয়ানে ৮.১৫২৯ একর সম্পত্তিসহ অপরাপর সম্পত্তি তৎকালে দিনাজপুরের অনারেবল মহারাজা জগদীশ নাথ রায় বাহাদুর জমিদারী এস্টেটের সম্পত্তি ছিল। বৃটিশ জরীপের পূর্বে মহারাজা জগদীশ নাথ রায় বাহাদুর উক্ত সম্পত্তি গবাদি পশু প্রতিপালনের জন্য একটি গোশালা স্থাপনের উদ্দেশ্যে ‘পিঞ্জরাপোল সোসাইটি’ নামে একটি সোসাইটি গঠন করেন। সোসাইটির অধীনে ১৭.৭৯ একর নিষ্কন্টক সম্পত্তি উৎসর্গ করেন। তৎকালে মহারাজা জগদীশ নাথ রায় বাহাদুর নিজে উক্ত সোসাইটির প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত হন। ওই কমিটিতে দিনাজপুরের তৎকালীন প্রতীথযশা আইনজীবী বাবু যোগেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী, গোপাল ভৌমিক, অধ্যাপক হরিদাস বসু অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। বৃটিশ জরিপ আমলে সি.এস-৬৫ নং খতিয়ানে ১৭.৭৯ একর সম্পত্তি উক্ত “পিঞ্জরাপোল সোসাইটি” এর নামে এবং সোসাইটির প্রেসিডেন্ট অনারেবল মহারাজা জগদীশ নাথ রায় বাহাদুরের শিরোনামে সি.এস রেকর্ড সঠিকভাবে প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়। জমিদারী উচ্ছেদের পর মহারাজা দিনাজপুর ত্যাগ করেন। তৎপর বাবু গোপাল ভৌমিক পিঞ্জরাপোল সোসাইটির প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত হয়ে জনৈক সত্যম্বর রায় ম্যানেজারের মাধ্যমে পিঞ্জরাপোল সোসাইটির কার্য্য পরিচালনা করেন। পিঞ্জরাপোল সোসাইটির গোশালা পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ, তত্ত¡াবধান করতে থাকেন। সেই সময়ও গোশালায় প্রায় শতাধিক গরু পালন এবং গরুর দুধ দিনাজপুরের বিভিন্ন পূজা মন্ডপে দুঃস্থদের মধ্যে বিতরণ করা হতো। এস.এ খতিয়ানে জরীপ কার্যক্রম চলাকালীন করনীক ভুলের কারণে নালিশী খতিয়ানের ১৭.৭৯ একর জমি ছুট হিসেবে রেকর্ড হওয়ায় সোসাইটির ম্যানেজার সত্যম্বর রায়, সার্কেল অফিসার (রেভিনিউ) সমীপে ঢ ১১১/২২/১৯৬৫-৬৬ নম্বর মিস কেস এর মাধ্যমে পিঞ্জরাপোল সোসাইটির নামে পৃথক খতিয়ান খোলার জন্য আবেদন করলে তৎকালীন সার্কেল অফিসার (রেভিনিউ) প্রজাস্বত্ব আইনের ১৪৩ ধারা মতে ১৭.৭৯ একর সম্পত্তি বাবদ ৪১ টাকা ১৫ আনা জমা ধার্য্যে পিঞ্জরাপোল সোসাইটির নামে রেকর্ড সংশোধনের আদেশ দেন। দেশ স্বাধীনের পরেও গোপাল ভৌমিক সত্যম্বর রায়কে নিয়ে পিঞ্জরাপোল সোসাইটি পরিচালনা করতে থাকেন। এরপর তারা উভয়েই পরলোকগমন করলে স্থানীয়ভাবে হিন্দু জনসাধারণ কমিটি গঠন করে উক্ত পিঞ্জরাপোল সোসাইটি পরিচালনা করেন। এরপর পিঞ্জরাপোল সোসাইটির সম্পত্তি সুনীল চক্রবর্তী তা দেখাশোনার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন। গত বি.এস জরিপে পিঞ্জরাপোল সোসাইটি ১৭.৭৯ একর সম্পত্তি হতে ৯.৫৪ একর সম্পত্তি পার্শ্ববর্তী প্রতিষ্ঠান যথা রাইফেল ক্লাব, আনসার ক্লাব দখল করে নেয়। শুধুমাত্র ৮.২৫২৯ একর সম্পত্তি পিঞ্জরাপোল সোসাইটির নামে বি.এস রেকর্ড হয়। ওই সম্পত্তি অনারেবল মহারাজা জগদীশ নাথ রায় বাহাদুর হিন্দু জনসাধারনে ব্যবহার্যে ধর্মীয় ও দাতব্য কাজে উৎসর্গ করে যান। ওই সম্পত্তির ৪৬২ নং দাগে দুইটি ঘর মহারাজা নির্মান করেন। ২টি ঘরের মধ্যে ১টি ঘরে ম্যানেজার সত্যম্বর রায় ব্যবহার করতেন, অপর ঘরটিতে ভগবান শিবের উপাসনার জন্য রাখা হয়। ফলে ওই সম্পত্তি ধর্মীয় ও দাতব্য কাজে ব্যবহৃত হওয়ায় ওই সম্পত্তি ন্যায়তঃ ও আইনতঃ কোন ভাবেই হস্তান্তরযোগ্য নয় এবং তা কোন ব্যক্তি মালিকানা সম্পত্তি নয়। বাদীগণ গত ২০২১ সাল হতে পিঞ্জরাপোল সোসাইটির সভাপতি ও যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত আছেন। সোসাইটির অব্যবহৃত জায়গায় যাতে অন্য কেউ দখল করতে না পারে সেজন্য সোসাইটির বর্তমান কমিটি সিদ্ধান্ত মতে ৪০টি দরিদ্র ব্যক্তি/ পরিবারকে তফশীল বর্ণিত সম্পত্তির পশ্চিমাংশে আশ্রয় দেয়া হয়। তারা বর্তমানে ওইসব ঘরে স্বপরিবারে বসবাস করছেন এবং সোসাইটির উন্নতি সাধনের জন্য পশু পালন ও দুগ্ধ বিতরণের নিমিত্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন। বাদীগণের উক্ত কার্যক্রম দেখে একটি মহল সোসাইটির উক্ত সম্পত্তি গ্রাস করিবার মহাপরিকল্পনায় ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন। গত ২০/১১/২০২৪ ইং তারিখে জনৈক ব্যক্তি সোসাইটির সম্পত্তির পার্শ্বে উপস্থিত হয়ে প্রকাশ করেন যে, তিনি সোসাইটির ৭.৫০ একর সম্পত্তি খরিদ করার নিমিত্তে বায়না করেছেন। সমিতির সেক্রেটারী তা শুনে বিস্মিত ও হতচকিত হন এবং তার কাছ হতে অত্র আদালতের ০৭/২৪ অন্য নং মোকদ্দমার রায় ও ডিক্রির ফটোকপি সংগ্রহ করেন। পরবর্তীতে বাদীগণ বিজ্ঞ আদালতে অনুসন্ধানে ০৭/২৪ অন্য নং মোকদ্দমার রায় ও ডিক্রির জাবেদা নকল গত ২৭/১১/২০২৪ তারিখে প্রাপ্ত হন এবং তা পাঠ করে অবগত হন যে, মোকদ্দমার ১নং বিবাদী রূপচাঁদ আগরওয়ালা পিঞ্জরাপোল সোসাইটির সেক্রেটারীর পক্ষে পিঞ্জরাপোল সোসাইটির সম্পত্তি জাল কাগজপত্র তৈরি করে গ্রাস করার নিমিত্তে একটি চক্র তৎপর হয়ে উঠেছে।
বাদীগণ অবগত হয়েছেন যে, জাল কাগজপত্র তৈরি করে উক্ত সম্পত্তি বিক্রির ষড়যন্ত্রে ইতিমধ্যে রেজিষ্ট্রেশনের নিমিত্তে পিঞ্জরাপোল সোসাইটির নাম ব্যবহার করে ইনকাম টেক্স সার্টিফিকেটও গ্রহণ করেছেন। উক্ত সার্টিফিকেটে বর্ণিত ০৭/২৪ অন্য নং মোকদ্দমায় দাখিল করেছেন। ওই সম্পত্তি এককভাবে মাড়োয়াড়ী স¤প্রদায়ের নয়, তা দিনাজপুরের হিন্দু জনসাধারনের কল্যানার্থে ব্যবহারের নিমিত্তে পিঞ্জরাপোল সোসাইটি নামে গোশালা স্থাপনের জন্য দান করেন। অনারেবল মহারাজা জগদীশ নাথ রায় বাহাদুর পিঞ্জরাপোল সোসাইটি কোন গঠনতন্ত্র তৈরি বা অনুমোদন করেননি। মহারাজার নাম ব্যবহার, মহারাজার স্বাক্ষর জাল করে, ভুয়া গঠনতন্ত্র তৈরি করেন। ওই সম্পত্তি ১নং বিবাদীর বা মাড়োয়াড়ী স¤প্রদায় ভুক্তের কোন দখল বা স্বত্ব নেই বা বিক্রয় করার কারও আইনগত এখতিয়ার নেই। অত্র বাদীগণ পর্যায়ক্রমে পিঞ্জরাপোল সোসাইটির কমিটির কর্মকর্তা-কর্মচারী হওয়ায় তারা উক্ত সম্পত্তি ভোগ দখল তথা পরিচালনা ও রক্ষনাবেক্ষন করে আসছেন। ১নং বিবাদী যাতে পিঞ্জরাপোল সোসাইটির নি¤œ তপশীল বর্ণিত সম্পত্তি হতে বাদীগণ তথা হিন্দু জনসাধারণকে বেদখল করতে না পারে বা হস্তান্তর করতে না পারে অথবা বল পূর্বক কোন প্রকার নির্মান কাজ বা সম্পত্তির আকৃতি-প্রকৃতি পরিবর্তন করতে না পারে বাদীগন মোকদ্দমার আরজীতে উল্লেখ করেন।
এদিকে জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক উত্তম কুমার রায় বলেন, এটি মহারাজা জগদীশ নাথ রায় বাহাদুর এর দান করা সম্পত্তি। যা হিন্দু জনসাধারণের ব্যবহারে ও কল্যাণে উক্ত সম্পত্তি দান করে যান। এটা কোন মাড়োয়ারীর সম্পত্তি নয়। এ সম্পত্তি রক্ষা করতে প্রয়োজনে আমরা কঠোর আন্দোলনের কর্মসূচি গ্রহণ করতে বাধ্য হবো।
অনুরূপভাবে জেলা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি সুনীল চক্রবর্তী জানান, সনাতনীদের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।
অন্যদিকে মামলার বিবাদী রুপচাঁদ আগারওয়ালার সাথে মুঠোফোনে (০১৭১২৬৩১১১৭) যোগাযোগ করা হলে তিনি উক্ত গোশালা বিক্রি হওয়ার কথা স্বীকার করেন। তবে কত দামে বিক্রি হয়েছে তা বলতে তিনি অস্বীকার করেন।
আমন্ত্রণ/এসিজি


































