‘ছোট্ট পরী’র পরিবারে কেউ বেঁচে নেই
আমন্ত্রণ ডেস্ক
সপরিবারে খাগড়াছড়িতে বেড়াতে যাওয়ার কথা ছিল সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা শাহজালাল উদ্দিনের (৩৪)। সেই উদ্দেশ্যে বৃহস্পতিবার দুপুরেই ঢাকার কেরানীগঞ্জের বাসা থেকে স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে বের হন। তখন তাঁর সঙ্গে ছিলেন শ্বশুর মুক্তার আলম হিলালী। তিনি ঢাকায় এসে মেয়ে-জামাতাকে বিদায় জানিয়ে নিজের কাজে চলে যান। সেদিন তাদের আর কোনো খোঁজও নেননি। শুক্রবার বারবার কল করে সাড়া না পেয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন। এর মধ্যে রাজধানীর বেইলি রোডের বহুতল ভবনে আগুন লাগার খবর পান। তবে ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি যে সেখানে তাঁর প্রিয়জনরাও ছিলেন।
দিনভর খোঁজাখুঁজির পর রাত ১০টার দিকে মুক্তার আলম একবুক শঙ্কা নিয়ে যান ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে। সেখানেই খুঁজে পান মেয়ে মেহেরুন নেসা জাহান হিলালী (২৪), জামাতা ও নাতনির মরদেহ। প্রথমে বাকরুদ্ধ হলেও পরে আর্তনাদে ভেঙে পড়েন। একই শহরে থেকেও অগ্নিকাণ্ডের পর প্রায় ২৪ ঘণ্টা তিনি জানতেন না এ দুঃসংবাদ। তিনি জানতেন, মেয়ে-জামাতারা খাগড়াছড়িতে বেড়াচ্ছে। এ কারণে তাঁর সাড়ে তিন বছরের ফুটফুটে নাতনি ফাইরোজ কাশেমের নিথর দেহ দীর্ঘ সময় পড়ে ছিল মর্গে। গতকাল শনিবার সমকালের প্রথম পৃষ্ঠার বড় অংশজুড়ে ছিল তার ছবি, যা বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচিত হয়।
শিশুটির খালা মুক্তারুন নিসা হিলালী দিনা সমকালকে জানান, তাদের গ্রামের বাড়ি কক্সবাজারের রামুতে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরীক্ষা দেওয়ার জন্য তিনি বাবার সঙ্গে ঢাকায় আসেন। এখানে উঠেন ফার্মগেট এলাকার একটি ছাত্রীনিবাসে। তাঁর বাবা মুক্তার আলম আবাসিক হোটেলে যান। দিনার ভগ্নিপতি শাহজালাল ছিলেন ঢাকার কেরানীগঞ্জের পানগাঁও কাস্টম হাউসের কর্মকর্তা। পরিবার নিয়ে থাকতেন কেরানীগঞ্জের বসুন্ধরা রিভারভিউ এলাকায়। কর্মস্থল থেকে তিন দিনের ছুটি নিয়ে বেড়াতে যাচ্ছিলেন তিনি। রাত ১১টার বাসের টিকিট কাটা ছিল। তবে কিছু কেনাকাটা করার উদ্দেশ্যে দুপুরেই তারা বাসা থেকে বের হন। কেনাকাটার সময় তাঁকেও (দিনা) সঙ্গে থাকতে বলেছিলেন শাহজালাল। পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য তিনি বের হননি।
দিনা সমকালকে বলেন, ‘পড়ালেখার চাপে বোন-ভগ্নিপতির খবর নেওয়া হয়নি। তাছাড়া ওরা বেড়াচ্ছে ভেবে বিরক্তও করতে চাইনি। শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত ওদের কোনো খবর না পাওয়ায় মোবাইল ফোনে কল করি। কেউ কল রিসিভ করেনি। এভাবে কিছু সময় পরপর অনেকবার কল করতে থাকি। প্রতিবার কল গেলেও কেউ রিসিভ না করায় সন্দেহ হয়। বাবার সঙ্গে কথা হয়। তিনিও ফোনে আপা-দুলাভাইকে পাচ্ছিলেন না। ওরা কোনো সমস্যায় পড়ল কিনা– ভেবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি। তবে একবারও ভাবিনি, ওরা ঢাকা ছাড়তে পারেনি; বেইলি রোডের ওই ভবনে ওরা ছিল। আমাকে অবশ্য বলেছিল, ওখানে রেস্তোরাঁয় খাওয়ার পর আমার সঙ্গে দেখা করে বাসে উঠবে। এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না– ওরা বেঁচে নেই!’ তিনি জানান, মেহেরুন নেসার জন্মদিন ১৪ সেপ্টেম্বর। একই তারিখে জন্ম তাঁর মেয়ে ফাইরোজেরও। এ কারণে একই দিনে মা-মেয়ের জন্মদিন পালন করা হয়। এটা ছিল তাদের সংসারে আনন্দের উপলক্ষ। গত বছরও বেশ ভালোভাবে দিনটি পালন করা হয়েছে। নিয়তির কী নির্মম পরিহাস, জন্মদিনের মতো ওদের মৃত্যুর তারিখটাও এক হয়ে গেল।
তিন প্রিয়জনকে হারিয়ে ঢামেক মর্গের সামনে বিলাপ করছিলেন মুক্তার আলম। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘(বৃহস্পতিবার) সকালে মেয়ের বাসায় নাশতা করেছি। মেয়ে নিজ হাতে নাশতা বানিয়ে খেতে দিয়েছিল। তারপর মেয়ে, জামাই, নাতনিসহ ঢাকায় আসি। ওরা বেড়াতে যাবে, তাই ইস্ত্রি করা কাপড় পরে বের হয়েছিল। এখনও (মর্গে) সেই কাপড় পরেই শুয়ে আছে। ওদের শরীরের কোথাও পোড়েনি। অথচ মানুষগুলো আর বেঁচে নেই।’
কক্সবাজার প্রতিনিধি ইব্রাহিম খলিল মামুন জানান, কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার হলদিয়াপালং ইউনিয়নের পশ্চিম মরিচ্যা গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. আবুল কাশেমের ছেলে শাহজালাল উদ্দিন। ৩৫তম বিসিএসে (নন ক্যাডার) উত্তীর্ণ হয়ে তিনি কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট দপ্তরে যোগ দেন। ২০১৭ সালে রামু উপজেলার ফতেখারকুল ইউনিয়নের প্রকৌশলী মুক্তার আলম হিলালীর মেয়ে মেহেরুন নেসার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। পারিবারিক সূত্র জানায়, ঢাকা থেকে তিনজনের মৃতদেহ নিয়ে গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রওনা দেন স্বজনরা। লাশ প্রথমে মেহেরুন নেসার বাবার বাড়ি রামুতে নেওয়া হবে। আজ রোববার সকাল ১১টায় জানাজা শেষে পশ্চিম মরিচ্যা এলাকায় তিনজনের দাফন সম্পন্ন হবে।
জন্মের মতো মা-মেয়ের মৃত্যুও একই দিনে
মার্চ ৩, ২০২৪
































