আজহার ইমাম, বিরামপুর (দিনাজপুর) প্রতিবেদক :
কুমিল্লার দাউদকান্দিতে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত সাত শ্রমিকের মধ্যে চারজনই দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার একই গ্রামের বাসিন্দা। নিহত এই চারজনই ছিলেন নিজ নিজ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। আকস্মিক এই দুর্ঘটনায় তাঁদের পরিবারগুলোতে নেমে এসেছে গভীর শোক ও অনিশ্চয়তা।
বুধবার (১৫ এপ্রিল) সকালে বিরামপুর উপজেলার জোতবানী ইউনিয়নের ভাইগর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, নিহতদের বাড়িতে চলছে হৃদয়বিদারক আহাজারি। স্বজন হারানোর বেদনায় স্তব্ধ পুরো গ্রাম। প্রতিবেশীরা শোকাহত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
এর আগে মঙ্গলবার ভোররাত সোয়া তিনটার দিকে কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার হাসানপুর এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম আঞ্চলিক মহাসড়কে চালবোঝাই একটি ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই সাতজন নিহত এবং অন্তত ছয়জন আহত হন।
নিহতদের মধ্যে বিরামপুর উপজেলার ভাইগর গ্রামের চারজন হলেন—বীর মুক্তিযোদ্ধা মজির উদ্দিনের ছেলে আবু হোসেন (৪২), ছইফ উদ্দিনের ছেলে বিষু মিয়া (৪৫), পলাশ হোসেনের ছেলে সুমন বাবু (২২) এবং রফিতুল্লাহ মণ্ডলের ছেলে আবদুর রশিদ (৬৫)। অপর তিনজন দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার খালিপুর গ্রামের বাসিন্দা—আফজাল হোসেন (৩৫), সোহরাব হোসেন (৪০) ও আবু সালেক (৪৫)।
স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বোরো মৌসুমে স্থানীয়ভাবে কাজের চাপ কম থাকায় অতিরিক্ত আয়ের আশায় প্রায়ই অন্য জেলায় কাজে যেতেন এসব কৃষিশ্রমিক। এবারও তাঁরা কুমিল্লায় ধান কাটার কাজে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। স্বল্প ভাড়ায় ট্রাকে করে ১৩ জন শ্রমিক একসঙ্গে রওনা দেন।
নিহত আবু হোসেনের স্ত্রী শিরিন আক্তার বলেন, “আমার স্বামীই ছিল সংসারের একমাত্র ভরসা। এখন দুই সন্তান নিয়ে কীভাবে চলব, কিছুই বুঝতে পারছি না।”
বিষু মিয়ার ছেলে রাফিয়াতুল্লাহ (১৫) জানায়, বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় বাবা তাকে পড়াশোনায় মনোযোগী হতে বলেছিলেন। “আমাদের রেখে বাবা আজ একেবারেই চলে গেল,”—কাঁদতে কাঁদতে বলে সে।
দিনাজপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) রিয়াজ উদ্দিন জানান, নিহতদের মরদেহ মঙ্গলবার রাতেই নিজ নিজ বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে।
অন্যদিকে, দিনাজপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন নিহত সাতজনের পরিবারকে তাঁর ব্যক্তিগত তহবিল থেকে ২৫ হাজার টাকা করে আর্থিক অনুদান দিয়েছেন। তাঁর পক্ষে মঙ্গলবার রাতে নিহতদের বাড়িতে গিয়ে এ সহায়তা তুলে দেন জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি আতিকুর রহমান রাজা মাস্টারসহ স্থানীয় নেতারা। ভবিষ্যতেও এসব পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, জোতবানী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জানান, বুধবার সকাল ৯টায় ভাইগর মাদ্রাসা মাঠে নিহতদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় ইমামতি করেন হাফেজ ইয়াদুল ইসলাম।
একই গ্রামের চারজন এবং পাশের উপজেলার আরও তিনজনের এমন আকস্মিক মৃত্যুতে বিরামপুর ও নবাবগঞ্জের দুই গ্রামজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। উপার্জনক্ষম ব্যক্তিদের হারিয়ে পরিবারগুলো এখন দিশেহারা—শোকের পাশাপাশি সামনে দেখা দিয়েছে কঠিন জীবনের বাস্তবতা।
আমন্ত্রণ/এজি


































