রফিক প্লাবন, দিনাজপুর :
বৈষম্যহীন চিন্তাভাবনা ও আইনের কোনো ব্যত্যয় না ঘটিয়ে দিনাজপুরে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় বিচার বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন দিনাজপুরের সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ এবং জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির চেয়ারম্যান মো. আলমগীর কবীর। তিনি বলেন, নিজেদের অধিকার আদায়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষকে সচেতন হতে হবে এবং নিজেদের দক্ষ ও শিক্ষিত হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি আদালতে বিচারাধীন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও দলিত জনগোষ্ঠীর মামলাগুলো তালিকাভুক্ত করে বিশেষ নজর দেওয়া এবং আইনের ব্যত্যয় না ঘটিয়ে দ্রæত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সন্ধ্যায় ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, দলিত ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আইনি সহায়তা সহজলভ্য করার জন্য দিনাজপুর জেলার বিজ্ঞ বিচারকবৃন্দের সঙ্গে মতবিনিময় সভায়’ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সুইজারল্যান্ডভিত্তিক আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা হেক্স/ইপার বাংলাদেশের আয়োজনে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের শহীদ সোহেল-জগন্নাথ সম্মেলন কক্ষে এ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মো. আলমগীর কবীর বলেন, সমাজের কোনো মানুষ পিছিয়ে থাকবে, রাষ্ট্র এমনটি চায় না। তাই প্রান্তিক, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, দলিতসহ পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র আইনগত সুরক্ষার ব্যবস্থা করেছে। আর্থিকভাবে অসচ্ছল মানুষ যেন আইনি সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হন, সে জন্য সরকারি লিগ্যাল এইডের ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য আইনি সহায়তা এখন একটি অধিকার। তিনি বলেন, “যাদের আর্থিক সামর্থ্য নেই, তারা সরকারি খরচে জেলা লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে আইনি সহায়তা ও প্রয়োজনীয় সেবা নিতে পারবেন। এ বিষয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে আরও বেশি সচেতনতা তৈরি করতে হবে।” তিনি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও দলিত জনগোষ্ঠীসহ পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সমস্যা সমাধানে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, আইনজীবী ও স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পৃথকভাবে মতবিনিময় করারও পরামর্শ দেন।
হেক্স/ইপার বাংলাদেশের পার্টনারশিপ ম্যানেজার ও সিনিয়র প্রোগ্রাম অ্যাডভাইজার সাইবুন নেসার সভাপতিত্বে এবং হেক্স/ইপার এর টেকনিক্যাল অফিসার পাপন কুমার সরকারের সঞ্চালনায় সভার ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন মৌমিতা জাহান।
সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন স্পেশাল জজ (জেলা ও দায়রা জজ) প্রদীপ কুমার রায়, বিজ্ঞ বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) মো. হুমায়ুন কবির সরকার, শিশু সহিংসতা অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের বিজ্ঞ বিচারক মো. মোস্তফা কামাল, ল্যান্ড সার্ভে আপিল ট্রাইব্যুনালের বিজ্ঞ বিচারক খন্দকার এ.টি.এম. তোফায়েল, চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ফিরোজ কবির, যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ ২য় আদালতের বিজ্ঞ বিচারক ফাতিমা খাতুন, জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার ইসরাফিল আলম, সিনিয়র সিভিল জজ মোস্তাফিজুর রহমান, সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট জয় কিশোর নাগ, দিনাজপুর জেলা অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্মের সভাপতি চিত্ত ঘোষ এবং প্ল্যাটফর্মের উপদেষ্টা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. সফিকুল হক ছুটু।
উন্মুক্ত আলোচনায় বক্তব্য দেন গবেষক আব্দুল্লাহ আল মামুন, শুভাশীষ মহন্ত, জেলা অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্মের সাধারণ সম্পাদক আলবিনুস টুডু, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রঙ্গলাল বাঁশফোর, সদর উপজেলা প্ল্যাটফর্মের সাধারণ সম্পাদক শিউলী বাড়া, জেলা প্ল্যাটফর্মের সদস্য রিপন মার্ডী, ফুলবাড়ী উপজেলা প্ল্যাটফর্মের সাধারণ সম্পাদক কমল কিস্কু, বীরগঞ্জের এ্যাডোয়ার্ড মেহরম, পিয়ুস মুর্মু, কাহারোলের মারিয়া মুর্মু, পার্বতীপুরের অজয় বাঁশফোর, রংপুরের মঞ্জুশ্রী সাহা, ঠাকুরগাঁও জেলা অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্মের সদস্য অ্যাডভোকেট ইমরান চৌধুরী প্রমুখ।
উন্মুক্ত আলোচনায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও দলিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা তাদের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন। বিশেষ করে জমি ও কবরস্থান দখল, বৈষম্যের শিকার হওয়া এবং নিজেদের পরিচয় ও অধিকার নিয়ে বিভিন্ন সমস্যার কথা তারা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তারা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষকে তাদের নিজস্ব পরিচয়ে পরিচিত করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন।
বিশেষ অতিথিরা বলেন, নিজেদের অধিকার আদায়ে নিজেদের শিক্ষিত ও সচেতন করে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষা ও সচেতনতা থাকলে অনেক সমস্যার প্রাথমিক সমাধান নিজেরাই করতে পারবেন।
তারা বলেন, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী জমি দখলের চেষ্টা করলে ভবিষ্যতে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করার জন্য ঘটনাটি ভিডিও করে রাখা যেতে পারে। তবে আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। তারা আরও বলেন, কোনো বিষয়ে মামলা করার প্রয়োজন হলে প্রথমে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে যোগাযোগ করা যেতে পারে। আর্থিকভাবে অসচ্ছল ব্যক্তিদের সরকারি খরচে আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাই অধিকার আদায়ে ভয় বা সংকোচ না করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সহায়তা নেওয়ার আহŸান জানান তারা।
সভায় বক্তারা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও দলিত জনগোষ্ঠীর মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে বিচার বিভাগ, প্রশাসন, পুলিশ, আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট সামাজিক সংগঠনগুলোর মধ্যে আরও সমন্বয় ও যোগাযোগ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
এসময় হেক্স/ইপার এর পক্ষ থেকে সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মো. আলমগীর কবীরকে ক্রেস্ট প্রদান করেন পার্টনারশিপ ম্যানেজার ও সিনিয়র প্রোগ্রাম অ্যাডভাইজার সাইবুন নেসা এবং জেলা অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্মের সভাপতি চিত্ত ঘোষ।
পরে আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং তাদের জীবনমান উন্নয়নে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ জেলা অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্মের সভাপতি চিত্ত ঘোষ, আদিবাসী সংগ্রামী নারী রেখা হাঁসদা এবং জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার ইসরাফিল আলমকে হেক্স/ইপার এর পক্ষ থেকে ক্রেস্ট প্রদান করেন সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মো. আলমগীর কবীর।
মতবিনিময় সভায় জেলার সকল বিচারক, জেলা অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্মের সদস্য, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও দলিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি, মূলধারার প্রতিনিধিসহ গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
আমন্ত্রণ/এজি
দিনাজপুরে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আইনি সহায়তা সহজলভ্য করতে বিচারকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা
আগস্ট ১৩, ২০২৬
































