আজিজুল হক সরকার :
ভিক্ষা করলে অন্যদের ন্যায় দিনে ৪০০-৫০০ টাকা আসতো।অথচ শাকসবজির দোকানে সর্বোচ্চ দিনে আসে ২০০ টাকা।তবুও ভিক্ষাবৃত্তি বড়ই অসম্মানের বলে জানালেন দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার শিবনগর ইউনিয়নের ফকিরপাড়া গ্রামের ষাটোর্ধ্ব বিধবা রশিদা বেগম।আত্মমর্যাদা আর পরিশ্রমকে পুঁজি করে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন দেড় দমক ধরে। স্বামী মারা যাওয়ার প্রায় ২ দশক পরও তিনি কারও কাছে হাত পাতেন না, সাহায্য কিংবা ভিক্ষা গ্রহণ করতেও অনাগ্রহী। নিজের শ্রমেই উপার্জন করে জীবন চালিয়ে যাওয়াকে তিনি সম্মানের বলে মনে করেন।

0-4608×2602-0-0#
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৮/১৯ বছর আগে স্বামীকে হারানোর পর রশিদা বেগম একাই সংসারের হাল ধরেন। কষ্ট করে তিন ছেলে-মেয়েকে বড় করেছেন এবং তাদের বিয়ে দিয়েছেন। বর্তমানে সন্তানরা নিজ নিজ সংসার নিয়ে ব্যস্ত। তবে কারও ওপর বোঝা হয়ে থাকতে রাজি নন তিনি। তাই বয়সের ভার সত্তে¡ও এখনো কাঁচা শাকসবজির ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
প্রতিদিন ভোরে কোনো যানবাহনের সাহায্য ছাড়াই প্রায় তিন কিলোমিটার পথ হেঁটে ফুলবাড়ী পৌর শহরের সবজি বাজারে আসেন রশিদা বেগম। কাঁধে থাকে বিকেলে সংগ্রহ করা টাটকা শাকসবজির পুঁটলি। বাজারে সবজির দোকান ও ডিম হাটের মাঝামাঝি ল²ী জুয়েলার্স স্বর্ণের দোকানের দেয়ালঘেঁষে বসে বেচেন কচুশাক,ঢেকুয়াশাক,কলাগাছের থোড়,কলার মোকচা,বতুয়া শাক,ডিম ইত্যাদি। দুপুর পর্যন্ত ব্যবসা শেষে যা আয় হয়, তা দিয়েই সংসারের খরচ চালান। বাড়ি ফিরে নিজেই রান্না করে খাবার প্রস্তুত করেন।
রশিদা বেগম বলেন, “স্বামী আবেদ আলী মারা গেছেন প্রায় ১৯ বছর আগে। ছেলে-মেয়েদের বড় করেছি, বিয়ে দিয়েছি। এখন চাইলে মানুষের কাছে হাত পেতে চলতে পারতাম। এলাকায় ভিক্ষা করলে অন্যদের ন্যায় দিনে ৪০০-৫০০ টাকা আসতো। কিন্তু অন্যের করুণা নিয়ে বেঁচে থাকতে আমার ভালো লাগে না। ভিক্ষা করা আমার কাছে অসম্মানের। যতদিন শরীরে শক্তি আছে, ততদিন কাজ করেই চলতে চাই।”
পাশের সবজি ব্যবসায়ী মো. শাহজামাল হোসেন, মো. রাজু ও হারুনুর রশিদ বলেন, “রশিদা আপার অবস্থা বিবেচনায় তিনি চাইলে ভিক্ষা করে চলতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা পছন্দ করেন না। তিনি মনে করেন ভিক্ষার মধ্যে কোনো সম্মান নেই। আমরা ব্যবসার কাজে তাকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করি।”
সামনে বসে ডিম ব্যবসায়ী মো. তোবারক হোসেন বলেন, “আমার ব্যবসার কিছু ডিমও তিনি বিক্রি করেন। এতে তার কিছু লাভ হয়।ফল বিক্রেতা সাবপন দত্তও বলেন, একজন বিধবা নারী হয়েও যে আত্মসম্মান নিয়ে ব্যবসা করছেন, এজন্য আমরা তাকে শ্রদ্ধা করি।”
ল²ী জুয়েলার্স দোকানের পাশে নিয়মিত বসেন,সেই ব্যবসায়ী অজিত বানিয়া বলেন, “রশিদা বেগম অনেক ভালো মনের মানুষ। তিনি ভিক্ষার মতো কাজ না করে ব্যবসা করে জীবন চালাচ্ছেন। এটি সমাজের জন্য অনুকরণীয়। অনেকেই সামান্য অজুহাতে ভিক্ষাবৃত্তি বেছে নেয়, কিন্তু তিনি সম্মান নিয়ে বাঁচতে চান।”
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. সানোয়ার হোসেন বলেন, “রশিদা বেগমের স্বামী অনেক আগে মারা গেছেন। তিনি সন্তানদের ওপর বোঝা না হয়ে নিজে ব্যবসা করে চলছেন। এটি সমাজের জন্য ইতিবাচক ও অনুপ্রেরণাদায়ক একটি দৃষ্টান্ত।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আহমেদ হাছান সমকাল প্রতিনিধিকে বলেন, “রশিদা বেগম ভিক্ষা না করে আত্মমর্যাদা নিয়ে ছোট ব্যবসা করে চলেছেন, তার জন্য আমাদের কিছু করা দরকার। তার আইডিটা আমার কাছে পাঠাবেন, দেখি তদন্ত করে তার জন্য কিছু করা যায় কিনা।”
আমন্ত্রণ/এজি
ফুলবাড়ীর রশিদা বেগমের জীবন যুদ্ধ : ভিক্ষা নয়, সবজি বিক্রিই জীবনের অবলম্বন
জুলাই ৩, ২০২৬






























