গোপাল অধিকারী, ঈশ্বরদী (পাবনা) প্রতিবেদক :
সুবর্না দাস। পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার দাশুড়িয়া ইউনিয়নের দাশুড়িয়া প্রি-ক্যাডেট স্কুলের অধ্যক্ষ । স্বপ্ন ছিল ব্যাংকের চাকরী করা। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই পরিবারের সিদ্ধান্তে আবদ্ধ হয় বিবাহ-বন্ধনে। বিয়ের পর পারিবারিক কারণেই হয়ে ওঠেনি ব্যাংকার হওয়ার গল্প। স্বামী গোপাল অধিকারীর সাথে শুরু হয় শিক্ষার আলো ছড়ানোর পথচলা। বিবাহের তিন বছর পরে কোলজুড়ে আসে একটি কন্যা সন্তান। স্বামী ও কন্যাকে নিয়ে ভালই চলছিল অধিকারী পরিবার।
কিছুদিন একসাথে পথচলার পর হঠাৎ করোনার থাবায় বন্ধ হয়ে যায় সেই পথচলা। পরিবারের একমাত্র আয়ের পথ বন্ধ হওয়ায় দিশেহারা হয়ে যায় পরিবারটি। দীর্ঘদিন বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় সংসারের খরচ আর ভবনভাড়া নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় পরে। উপায়ন্তর না পেয়ে স্বামীকে একটি এনজিওতে যোগ দিতে বলেন তিনি। শুরু হয় একলা পথ চলা। সময় গেলেও যায় না করোনার থাবা। মাসের পর মাস বন্ধ থাকে বিদ্যালয়।
দীর্ঘ হতাশা গেলেও বিদ্যালয় ছাড়েনি।করোনার মধ্যেই ঘরে বসে পড়ার ব্যবস্থা করে। ছাত্র-ছাত্রীরা আসত না তবুও সে এসে বসে থাকত বিদ্যালয়ে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সীমিত পরিসরে শুরু করে পাঠদান। এভাবেই শুরু হয় সুবর্না দাসের শিক্ষার আলো ছড়ানোর গল্প। তবে এর পেছনের গল্পটা সুখকর ছিল না।
এলাকার শিক্ষিত পরিবার বলেই হয়তো পারিবারিক প্রতিবন্ধকতা কম ছিল।কিন্তু সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক প্রতিবন্ধকতা থেকে নিস্তার মেলেনি।কিন্তু সমস্ত বাঁধাকে উপেক্ষা করে ছুটেছেন। এখানে আসার পর সে বুঝতে পারে কত মানুষ কত সমস্যায় দিন কাটাচ্ছে?এমন অনেক পরিবার আসে যাদের স্কুলে পড়ানোর মত সক্ষমতা নেই।তাদের কথা শুনে এবং চেষ্টা করে তাদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে পড়ানোর ব্যবস্থা করতে। শিশুশ্রমে নিরুৎসাহিত করতে ও বিদ্যালয়মুখি করতে বাড়ি বাড়ি পরিদর্শন করেন বছরের শেষে। তখন থেকেই পারিবারিকভাবে দরিদ্র কিছু সন্তানকে বিনা পয়সায় পড়ানো শুরু করেন তিনি। প্রত্যাশা ছিল এক সময় মানুষের মত মানুষ হলে শ্রমটা সফল হবে।
স্বামী স্কুলে না থাকায় সবকিছু নিজেকেই সামলাতে হয়। আগে কখনও পড়াই নি তারপর মেয়েটা কোলে খুব ভয় পেত। পরিবারের মধ্যে কেউ এমন বাইরে কিছু করে না। সেসব চিন্তা করে চিন্তা হতো কখন কে কি বলে এমন নানা খারাপ চিন্তা কাজ করত। কিন্তু স্বামী সবসময় সাহস দিত। কোলের সন্তান ও করোনার থাবা নিয়ে দিনরাত পরিশ্রম করে বিদ্যালয়টিকে চলমান রাখে। অদম্য পরিশ্রমে বিদ্যালয়টি এখন ঈশ্বরদীর মধ্যে সেরা।গত ২০২৪ সালের ঈশ্বরদী কিন্ডারগার্টেন এসোসিয়েশনের বৃত্তি পরীক্ষায় বিদ্যালয় বৃত্তি অর্জনে প্রথম হয়েছে। সর্বোচ্চ ৫৩ জন বৃত্তি পেয়েছে এই প্রতিষ্ঠান থেকে। সুবর্না দাসকে দেখে আমাদের বিদ্যালয়ে আরও অনেক মেয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছে। বর্তমানে বিদ্যালয় ১১ জনের একটি পরিবার যার মধ্যে ৮ জনই নারী। আঁধার পেরিয়ে যেন আলো দেখা মেলে। সুবর্না দাসের জীবনে এখন তেমনি মিলছে সফলতার চাবি। কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ ৯ ডিসেম্বর বেগম রোকেয়া দিবসে শিক্ষা ও চাকুরীতে সাফল্য অর্জনকারী নারী হিসেবে পেয়েছেন উদ্যোমী নারীর সম্মাননা। ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মনিরুজ্জামান তার হাতে তুলে দেন এই সম্মাননা।
সুবর্না দাস বলেন, শিক্ষার আলো ছড়ানোর পাশাপাশি এতজনের কর্মসংস্থানের জায়গা করতে পেরে নিজের কাছে অনেক ভাল লাগে। ভাল লাগে অসহায় দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার অধিকার পূরণে কাজ করতে পারছি বলে। সবচেয়ে ভাল লাগে যে বিভিন্ন এলাকার বিভিন্ন শিক্ষার্থীকে আমি কিছু শেখাতে পারছি।
নিজের বিদ্যালয়টিকে যখন সমৃদ্ধ করতে পারছি তখন চিন্তা করি কিভাবে সারাদেশের শিক্ষা নিয়ে কাজ করা যায়। তারপর ইংরেজি বিষয় নিয়ে লেখালেখি শুরু করি। বর্তমানে আমার লেখা জাতীয় দৈনিক কালেরকণ্ঠে প্রকাশিত হচ্ছে।যা পড়ে সারা বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে বলে মনে করি।
একটি দুঃসময় মানুষকে অনেক কিছু করতে শেখায়। তেমনি করোনাও আমার জীবনে দুঃসময় ছিল। তবে করোনা না হলে আমি হয়ত এভাবে সংগ্রাম করে নিজেকে এই পর্যন্ত আনতে পারতাম না। করোনার কারণে আজ আমি শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যেতে পারছি। রাস্তায় বের হলেই যখন কোমলমতি শিক্ষার্থীরা সালাম দেয় তখন গর্বে বুকটা ভরে যায়। এটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। শিক্ষকতা একটি সম্মান। পিতা-মাতার পরেই শিক্ষকদের অবস্থান। বাকি জীবনটা একজন শিক্ষক হিসেবেই কাটাতে চাই। ভবিষ্যতে শিক্ষার আলো ছড়ানোর মাধ্যমে একটি সুশিক্ষিত জাতি গঠনে ভূমিকা রাখতে চাই।
আমন্ত্রণ/এজি
প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন সুবর্না দাস
ডিসেম্বর ১৩, ২০২৫
































