বগুড়া ব্যুরো:
বগুড়ার ঐতিহাসিক মহাস্থানগড়ে দেশ-বিদেশের সাধু সন্নাসীদের মিলনমেলা শুরু হয়েছে। আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন সভ্যতার পীঠস্থান পুন্ডবর্ধনের রাজধানী মহাস্থানগড়ে প্রতিবছর বৈশাখ মাসের শেষ বৃহস্পতিবারে এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। সাধু সন্নাসীদের মিলনমেলা বলা হলেও আড়ালে-আবডালে চলে গাঁজার উৎসব। বুধবার (৭ মে) সন্ধ্যা থেকেই এতে যোগ দিতে বিভিন্ন ধর্মের লাখো নারী, পুরুষ, বাউল, বৈরাগী, সাধু-সন্নাসীদের সমাগম ঘটেছে।
এরই মধ্যে সেখানে শুরু হয়েছে জটাধারী সাধু সন্নাসীদের বিচিত্র সব আচার অনুষ্ঠান। নানা তরিকার নানা ধর্মের সংসার ত্যাগীদের মহাসম্মেলনে রূপ নেয়া এই উৎসবে কেউ আসেন নাচতে গাইতে, কেউ আসেন জিকির আজকার করতে আর কেউ আসেন উম্মুক্ত মাদক সেবনের উৎসবে যোগ দিতে। আর এসব বিচিত্র কর্মকাÐ দেখতে দেশের প্রত্যন্ত বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসেন হাজারো উৎসুক মানুষ।
প্রায় ২০০ বছর ধরে চলে আসা নানা ধর্মাবলম্বী মানুষের এই মিলন উৎসবের মূল আকর্ষণ হচ্ছে গাঁজা সেবন। গত কয়েক বছর ধরেই দেশের বিভিন্ন স্থানের নারী পুরুষ এবং ভারত, নেপাল শ্রীলংকা ও বার্মাসহ বিভিন্ন দেশের সাধু সন্নাসীরা মহাস্থানের এই উৎসবে আসতেন। কিন্তু এবার আশেপাশের জেলার লোকজনের উপস্থিতি বেশি। এবার মাজার এলাকায় গাজা সেবনের আয়োজন না থকেলেও পাশের বোরহানউদ্দিনের মাজারে দেখা গেছে প্রকাশ্য গাঁজা সেবনের দৃশ্য। সেই সঙ্গে গাঁজা সেবনের হরেক রকমের সরঞ্জামের বিশাল দোকানও বসে এখানে। এসব কিছুই দর্শনার্থীদের বাড়তি আকর্ষণ এবং আনন্দ জোগায় বলে লাখো দর্শকের সমাগম ঘটে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকেই সাধু সন্নাসীরা গাঁজার কলকিতে দম দিচ্ছেন। জমে উঠেছে গান বাজনার মজমাও। দশ/বারোজনের একক একটা গ্রæপ করে চলছে। বাউল গানের আসর। শরিয়তি-মারফতি মাইজভাÐরি তরিকার হাজারো ভক্তরা এসেছেন জিকির আসকার করতে। হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী হাজারো মানুষ এসেছেন তাদের নিজ নিজ আচার অনুষ্ঠান করতে।
সাধু সন্নাসীদের এই বৈশাখী মেলায় এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শত শত সাধু সন্ন্যাসী ও হাজার হাজার ভক্তরা আসতে শুরু করেছেন। মেলা উপলক্ষে নড়ে চড়ে বসেছেন গাঁজা, ফেনসিডিল, হেরোইেন ব্যবসায়ীরাও। উৎসবকে প্রাণবন্ত করতে মহাস্থান মাজার এলাকার চারপাশের প্রধান প্রধান সড়ক পথগুলোতে নির্মাণ করা হয়েছে বর্ণাঢ্য তোরণ। আশপাশে এলাকার মানুষের মধ্যে বিরাজ করছে সাজ সাজ বর। সারাদেশে বিখ্যাত মহাস্থানের কটকটি তৈরি করতে ব্যবসায়ীরা দিন রাত পরিশ্রম করে নির্ঘুম রাত কাটিয়ে আগত মেহমানদের জন্য তৈরি করছে শত শত মন কটকটি।
বগুড়া শহর থেকে ১০ কিলোমিটার উত্তরে প্রাচীন বাংলার রাজধানী ইতিহাসের অমর স্বাক্ষী হিন্দু মুসলিমদের তীর্থস্থান ঐতিহাসিক মহাস্থান গড়ে শায়িত আছেন পারস্য থেকে আগত হযরত শাহ সুতলতান বলখী মাহী সাওয়ার (রহ.)। যিনি হিন্দু রাজা পরশুরামকে পরাজিত করেছিলে বৈশাখের শেষ বৃহস্পতিবার। সেই দিনকে বিজয় দিবস হিসেবে পালন করতে প্রতি বৎসরের বৈশাখ মাসের শেষ বৃহস্পতিবার বিজয় মেলা বসতো আগে। কালের পরিক্রমায় এখানে সাধু সন্নাসী ও বাউলদের আগমন ঘটতে থাকে।
প্রতিবছরের মতো এবারও দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা জটাধারী সন্ন্যাসী, সাধু-সন্ন্যাসিনী ও পথের ফকিররা। হাজারো সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষও এদিন মাজার জিয়ারত করতে ছুটে আসেন। এরই ধারাবাহিকতায় এবারও অনুষ্ঠিত হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলা ও মাজার ওরস।
শিবগঞ্জ থানার ওসি শাহীনুজ্জামান জানান, এসব লোকজ ধর্মবিশ্বাসকে সম্মান জানানো হলেও কোনোভাবেই যেন তার সঙ্গে মাদক বা অন্য কোনো অপরাধ যুক্ত না হয়, সে বিষয়ে তারা সতর্ক। চার স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান বলেন, মহাস্থান মাজার এলাকায় কোন প্রকার মাদক সেবন বিক্রি এবং যে কোন ধরনের অনৈতিক কাজ হতে দেওয়া হবে না। শুধু মাত্র ধর্মীয় উৎসব ছাড়া এখানে আর কোন কাজ হবেনা।
বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান জানান, শেষ বৈশাখীতে মহাস্থানগড় এলাকায় ‘গাঁজা মাদক এবং সব ধরনের অসামাজিক ও ইসলাম বিরোধী কার্যকলাপ ঠেকাতে এবার আমরা সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছি। পুলিশ, র্যাব, আনসার ও সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাড়ে চার শতাধিক সদস্য মোতায়েন থাকবে পুরো এলাকায়।’
এছাড়াও গোটা এলাকা নজরদারিতে রাখতে স্থাপন করা হয়েছে অস্থায়ী সিসিটিভি, পুলিশ কন্ট্রোল রুম এবং র্যাবের মনিটরিং সেল। জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে একাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালতও তৎপর থাকবে বলে জানা গেছে।
আমন্ত্রণ/এসিজি


































