বগুড়া ব্যুরো ও গাবতলী প্রতিবেদক :
বগুড়ার গাবতলীতে ৮০ বছরের লিয়াকত আলী প্রামানিকের দিন কাটছে একটি টিনের ঝুপড়ি ঘরে। সংসারের বোঝা মনে করে তার পরিবারের লোকজন তাকে ফেলে রেখে যান ওই ঝুপড়ি ঘরে। ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার ঈশ্বরপুর গ্রামে।
জানা যায়, প্রায় তিন দশক কুয়েত ও সৌদি আরবের রাস্তায় কঠোর পরিশ্রম করে উপার্জিত লাখ লাখ টাকা তিনি পরিবারের হাতে পাঠিয়েছেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস পরিবারের সঙ্গে এখন তাঁর সম্পর্ক ছিন্ন, স্ত্রী ও কন্যা তাকে ফেলে অন্যত্র চলে গেছেন। দেশে ফিরে শুরু করা ব্যবসাও প্রতারণার শিকার হয়ে ৩০ লাখ টাকা মূলধন হাতছাড়া হয়েছে। জীবনের প্রতিটি ধাপে যেন প্রতারণা আর অবিশ্বাসই সঙ্গী হয়েছে লিয়াকতের। আজ তিনি নিজেই বেঁচে আছেন মানুষের করুণার ভরসায়।
সরেজমিনে দেখা যায়, রাস্তার ধারে গ্রামবাসী সড়কের পাশে টিনের তৈরি একটি ঝুপড়ি ঘর তুলে দেন তাঁর জন্য। বৃদ্ধ লিয়াকতের ঘরে টিন ফুটে বর্ষার পানি পড়ে, শীত শুরুর আগেই শীতল বাতাস ঢুকে শরীর কাঁপায়। কঠোর পরিশ্রম, ত্যাগ এবং জীবনভর উপার্জনের পরও তিনি এখন নিরাশ্রয় ও বঞ্চিত।
স্থানীয়রা জানান, লিয়াকত আলী প্রামানিকের জীবন কাহিনী শুধু ব্যক্তিগত দুঃখ নয়; এটি সমাজের নিরাপত্তা, বৃদ্ধ সেবা এবং সামাজিক ন্যায় বিচারের প্রয়োজনীয়তার এক মারাত্মক বাস্তব চিত্র। সমাজ ও সরকারের পদক্ষেপ ছাড়া বৃদ্ধ ব্যক্তিদের এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে আরও অনেকে বিপর্যয়ের মুখে পড়বেন।
জানা গেছে, পরিবারের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দিতে তিনি পাড়ি জমিয়েছিলেন কুয়েতে। এরপর দীর্ঘদিন সৌদি আরবের সড়ক-মহাসড়কজুড়ে মালবাহী গাড়ি চালিয়েছেন। কঠোর পরিশ্রমে উপার্জিত অর্থ পাঠাতেন পরিবারের হাতে। সংসার জীবনে ঝর্ণা নামের এক নারীকে বিয়ে করেছিলেন লিয়াকত। সেই ঘরে ছিল এক কন্যা সন্তান। প্রবাসে থাকা অবস্থায় তার স্ত্রী মেয়েকে নিয়ে অন্যত্র চলে যান। জীবনের প্রতিটি ধাপে যেন প্রতারণা আর অবিশ্বাসই সঙ্গী হয়েছে লিয়াকতের। প্রায় দেড় যুগ আগে প্রবাস জীবনের ইতি টেনে দেশে ফিরে রাজধানী ঢাকায় শুরু করেন আদম ব্যবসা। সেখানেও ভাগ্য প্রতারণা করে। ব্যবসার মূলধন ও শেষ পুঁজির ৩০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে পালিয়ে যায় তাঁর এক সহযোগী। এরপরেও বিপদ থামেনি তার। জীবদ্দশায় তাঁর বাবা জমিজমা ছোট ভাইয়ের নামে লিখে দিলে নিঃস্ব হয়ে পড়েন লিয়াকত। অসুস্থ অবস্থায় আশ্রয়ের খোঁজে ছোট বোনের বাড়িতে গেলে, গত ২৯ অক্টোবর বোন তাকে বাড়ির পাশের কবরস্থানে ফেলে রেখে যায়।
বৃদ্ধ লিয়াকত শুধু বয়সের ভারে নুয়েই পরেননি। এখন অন্যের সহযোগিতা ছাড়া বিছানা থেকে উঠতে পারেন না, আছে ঠান্ডাজনিত শ্বাসকষ্টের সমস্যা। জীবনের শেষ সময়টুকু ভালোভাবে বাঁচার আকুতি তাঁর।
লিয়াকতের সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন! একসময় পরিবার, সমাজ, স্বপ্ন সবকিছু নিয়ে পথ চলেছি। আজ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে পাশে নেই কেউ! যাদের জন্য প্রবাসে জীবন কঠোর পরিশ্রম করে উপার্জিত লাখ লাখ টাকা পাঠিয়েছি , তাদের কাছ থেকেই পেয়েছেন অবহেলা, প্রতারণা আর পরিত্যাগ।
প্রতিবেশি জাহেদুল ইসলাম জানান, লিয়াকত আলী এখন ঠিকমত চলাফেরা করতে পারেন না এমনকি প্রসাব পায়খানা বিছানায় করেন, তার এখন ভালো থাকার জায়গাসহ সঠিক চিকিৎসার প্রয়োজন। এখন তার থাকার মত কোন জায়গা নেই।
স্থানীয় বাসিন্দা পলাশ আহমেদ জানান, লিয়াকত আলী এখানে খুবই মানবতার জীবনযাপন করছে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
আমন্ত্রণ/এসিজি


































