চন্দ্রনা্থ গুপ্ত ও অমর চাঁদ গুপ্ত অপু :
দিনাজপুরে বিরামপুরের রতনপুরে রুক্ষিণী রাজ কুমার সরকারের জমিদার বাড়ির অট্টালিকা সহ প্রায় ৩০ বিঘা জমি (৯.৮০ একর) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে অধিগ্রহণ করে দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক বেশ কয়েকটি লাল সাইনবোর্ড প্রদর্শন করেছেন। তফসিলভুক্ত জমিতে অনুমতি ব্যতীত কোন স্থাপনা/অবকাঠামো বা জমির কোনরূপ ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধের নির্দেশনা রয়েছে সাইনবোর্ডে। তফসিলে উল্লেখ রয়েছে জমির অবস্থান জেলার বিরামপুর উপজেলার প্রয়াগপুর মৌজার জে.এল নং ৪৩।
বিরামপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার নুজহাত তাসনীম আওন বলেন, এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মহোদয়ের নির্দেশনায় ৯.৮০ একর সম্পত্তি রাষ্ট্রের, কেউ অবৈধ ভাবে ব্যবহার করতে পারবেন না, তা অবহিত করে জমির তফসিলসহ বিস্তারিত উল্লেখ করে কয়েকটি লাল সাইনবোর্ড দেয়া হয়েছে।
দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, এ বিষয়ে প্রক্রিয়া চলছে।
রুক্ষিণী রাজ কুমার সরকারের জমিদার বাড়ি সহ সরকারি অধিগ্রহনকৃত সম্পত্তিতে প্রায় ৩০ বিঘা জমি (৯.৮০ একর) প্রাচীন নিদর্শন সংরক্ষণে সংস্কার করা হলে পর্যটন খাত সমৃদ্ধ, ও এই প্রাচীন নিদর্শন থেকে স্থানীয়দের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধিত হত। এমনটাই আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন অবহেলিত রতনপুর এলাকার জনগণ হেলাল সহ অনেকেই। এতে দেশি-বিদেশি পর্যটক আকৃষ্ট করা গেলে গ্রামীণ জনপথের কর্মসংস্থান ও আর্থিক উন্নয়ন ঘটবে।
অথচ বাস্তবে গিয়ে দেখা গেছে, রাষ্ট্রের পক্ষে সম্পত্তির মালিক দিনাজপুর জেলা প্রশাসকের অনুমতি না নিয়েই গড়ে উঠেছে একটি ইসলামিক মিশন হাসপাতাল, ১টি দাখিল মাদরাসা, মসজিদসহ বিশাল একটি পুকুর, অবৈধ দখলদারদের ঘর-বাড়ি। জমিদারের তৈরিকৃত সুদৃশ্য দ্বিতল অট্টালিকাটির অযতন আর অবহেলায় সেখানে মাদকসেবীদের হয়েছে অবাধ বিচরণ। বিরামপুর উপজেলার উত্তরে ১২ কিলোমিটার দুরে খানপুরে প্রত্নতান্তিক নিদর্শন অষ্টাদশ শতকের জমিদার বাড়িসহ জমিদারের ১২শ বিঘা জমি বনজ ফলজ ও ওষুধি বাগান ছিল।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ব্রিটিশরা অষ্টাদশ শতকে ফুলবাড়ী জমিদারের পক্ষে খাজনা আদায়কারী হিসাবে রুক্ষিণী রাজ কুমার সরকারকে বিরামপুরের রতনপুর কাচারীতে পাঠিয়েছিলেন। এখান থেকে তিনি বিরামপুর, নবাবগঞ্জ, হাকিমপুর ও ফুলবাড়ী এলাকার প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করতেন। আদায়কারী কর্মদক্ষতায় সন্তুষ্ট হয়ে জমিদার তার বোনের সাথে রাজকুমারের বিয়ে দেয় এবং সাড়ে ৬শ বিঘা জমিসহ রতনপুর কাচারী উপহার দেন। সাধারণ আদায়কারী থেকে জমিদার বনে রাজকুমার আরো অধিক অর্থসম্পদের নেশায় মেতে ওঠেন।
অপরদিকে একই মৌজায় আড়াইশত একর জমি ও অঢেল অর্থের মালিক রঘুহাসদা নামের একজন প্রতাপশালী সাঁওতাল ছিলেন। রাজকুমার সুযোগ বুঝে সাঁওতাল বঘু হাসদার কাছ থেকে ৫ বস্তা কাঁচা টাকা ধারে নিয়ে অন্য জমিদারের আরো ৩শ একর জমি নিলামে ডেকে নেয়, পরে উপকারী রঘু হাসদার ৫০ একর ফলের বাগান দখল করে নিয়ে তাকে বিতাড়িত করেন। এলাকার একক জমিদার হিসেবে তৈরি করে সুদৃশ্য দ্বিতল বিশিষ্ট মনোরম অট্টালিকা।
জানা যায়, নতুন জমিদার রাজকুমারের রতন কুমার ও রুক্ষিণী রাজ কুমার নামে দুই পুত্র সন্তানের মধ্যে ১৬ বছর বয়সের বড় ছেলে রতন কুমার মন্দিরের পুকুরে গোসল করতে গিয়ে মারা যায়। পুত্র শোকে কিছুদিন পর রাজকুমারের মৃত্যু ঘটলে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে অঢেল সম্পদ, বাগান ও পুকুরসহ ১২শ বিঘা জমিদারী লাভ করেন রুক্ষিণী রাজ কুমার সরকার।কিন্তু ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় রুক্ষিণী রাজ কুমার সরকার তার সহায় সম্পদ ফেলে দিয়ে চলে যান ভারতে। সেই থেকে তার সম্পদের বেশি কিছু অংশ জাল দলিরের মধ্যে ব্যক্তি বিশেষ দখলে নিয়ে ভোগ করে আসছে। অবশিষ্ট যা থেকে গেছে সেটি সরকারের আয়ত্বে নেওয়া হয়েছে। রুক্ষিণী রাজ কুমার সরকারের জমিদার বাড়ীর পার্শ্বে্ই গড়ে ওঠেছে ইসলামী মিশন হাসপাতালসহ বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
আমন্ত্রণ/এসিজি


































