বগুড়া ব্যুরো ও গাবতলী প্রতিনিধি :
বাঘাইড় মাছ ছাড়াই এবার দুইশ’ বছরের ঐতিহ্যবাহী বগুড়ার গ্রামীণ পোড়াদহ মেলা শেষ হলো। পুরো মেলা ঘুরেও দেখা মেলেনি বাঘাইড় মাছের। কারণ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে বাঘাইড় মাছ বিক্রি ও প্রদর্শন বন্ধে প্রশাসনের কড়াকড়ি আরোপের কারণে গত বছর থেকেই কেউ বাঘাইড় মাছ মেলায় তোলেননি। মেলায় আসা ক্রেতা ও দর্শনার্থীরা এবারও হতাশা প্রকাশ করেছেন বাঘাইড় মাছ দেখতে না পেয়ে। নিবারণ সরকার নামের এক দর্শনার্থী বলেন, বাঘাইড় মাছ দেখার জন্যই মেলায় আসি। কিন্তু এবার সেই মাছের কোনো নাম-গন্ধ নেই। তার মতোই অনেকে মেলার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরেছেন বাঘাইড় মাছ দেখার জন্য। কিন্তু দেখা মেলেনি বাঘাইড় মাছের। পোড়াদহ মেলা কারো কাছে মাছের মেলা, কারো কাছে জামাই মেলা। তবে স্থানীয় নাম পোড়াদহ মেলা। বগুড়ার গাবতলী উপজেলার এই মেলায় উঠেছিলো বিশালাকায় অনেক মাছের পাশাপাশি নানা পদের মিষ্টান্ন এবং কাঠের আসবাবপত্রসহ গৃহস্থালী সামগ্রী।

মেলায় আগত দর্শনার্থীদের দৃষ্টি কাড়ে একটি বিশাল মাছ। ঘড়িয়ালের মতো লম্বা ঠোঁট আর পিঠের ওপরে বিশাল পাখনাযুক্ত মাছটিকে বিক্রেতা পরিচয় করিয়ে দিলেন পাখি মাছ হিসেবে। যদিও সামুদ্রিক এই মাছের নাম ‘সেইল ফিশ’। পিঠের ওপরের পাখনার কারণে দ্রম্নতগতির এই মাছটি সাঁতার কাটার সময় পালতোলা নৌকার মতোই মনে হয় তার পাখনাকে। ৪০ কেজি ওজনের মাছটির দৈর্ঘ্য ৮ ফুট। দুপুর পর্যন্ত বিক্রেতা মাছটি দেড় হাজার টাকা কেজি দাম চাইলেও সেটি বিক্রি হয়নি। অনলাইনে ‘সতেজ বাজার’ নামে ব্যবসা পরিচালনা করেন টাঙ্গাইলের বাসাইল এলাকার বাসিন্দা শরিফ তালুকদার। তিনিই কুয়াকাটা থেকে সামুদ্রিক সেইল ফিশটি সংগ্রহ করে মেলায় তোলেন। তিনি বলেন, সমুদ্র তীরবর্তী এলাকায় মাছটি মারলিন ফিশ, পাখি মাছ ও গোলপাতা মাছ নামে পরিচিত। তবে বগুড়ার শিক্ষার্থীদের পরিবেশবাদী সংগঠন তীর’র সাবেক সভাপতি রিফাত হাসান মাছটি দেখে তা ‘সেইল ফিশ’ বলে নিশ্চিত করেন। বিক্রেতা শরিফ তালুকদার দেড় হাজার টাকা কেজি হিসেবে মাছটির দাম ৬০ হাজার টাকা চাইলেও দুপুর পর্যন্ত ক্রেতারা তার সর্বোচ্চ দাম বলেছে ৩০ হাজার টাকা। মোজাম্মেল হক নামে এক ব্যবসায়ী তার দোকানে তুলেছিলেন ২৫ কেজি ওজনের একটি বস্নাক কার্প মাছ। বিশালাকার এই মাছটি বিক্রির জন্য তিনি এক হাজার টাকা কেজি হিসেবে দাম চান ২৫ হাজার টাকা। পরে তা ৮৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেছেন বলে জানান মোজাম্মেল। আরিফুর রহমান তার দোকানে তুলেছিলেন ২০ কেজি ওজনের একটি কাতলা মাছ। দুপুর পর্যন্ত এক হাজার ২০০ টাকা কেজির নিচে তিনি সেই মাছ বিক্রি করবেন না বলে জানান।
মিষ্টি দোকানি গাবতলী উপজেলার সোনাকানিয়া এলাকা থেকে আসা রাব্বি মিয়া জানান, এই ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার পর থেকেই তারা এ মেলায় আসেন এবং বাহারি ডিজাইনের মিষ্টান্ন সামগ্রী নিয়ে আসেন। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বিপুল পরিমাণ মিষ্টান্ন সামগ্রী নিয়ে তারা মেলায় এসেছেন। বেচাকেনাও বেশ ভালো। এবার তিনি ১২ কেজি ওজনের একটি বড় মিষ্টি মেলায় এনেছে। ৬০০ টাকা কেজি ধরে মিষ্টিটির দাম হাকিয়েছেন ৭ হাজার ২০০ টাকা। বগুড়া গাবতলী উপজেলার পোড়াদহ মেলার ঐতিহ্য প্রায় দুইশ বছরের। ওই এলাকার প্রবীন ব্যক্তিরা জানান, প্রায় দুইশ বছর আগে গাবতলী উপজেলার মহিষাবান ইউনিয়নে ইছামতি নদীর শাখা (খাল) সংলগ্ন পোড়াদহ নামকস্থানে একটি বটবৃক্ষ তলে আয়োজন করা হতো সন্ন্যাসী মেলা। কালের বিবর্তনে এই মেলা হয়ে ওঠে পূর্ব বগুড়ার বাসিন্দাদের মিলনমেলা। নদী তীরবর্তী স্থানে এই মেলায় ক্রমান্বয়ে নানা প্রজাতির মাছের আমদানি হতে শুরম্ন করে। এক সময় তা এই অঞ্চলে বড় মাছের মেলা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ইছামতীর খালের পশ্চিমপাশে মাঠের আয়োজন করা হয় এই মেলার। মেলা উপলক্ষে সেখানকার বাসিন্দাদের রেওয়াজ হয়ে উঠেছে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদের নিমন্ত্রণ করে খাওয়ানো। মেলায় শিশু-কিশোরদের জন্য নাগরদোলা, সার্কাস, হোন্ডা খেলা, বিভিন্ন প্রকার খেলনার দোকান বসেছে। মেলার একপাশে বসে গৃহস্থালীর প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিশেষ করে মসলাপাতির দোকানপাট। অপর পাশে কাঠের আসবাবপত্রের দোকান। মেলার মিষ্টির দোকানে মাছ আকৃতির মিষ্টি তৈরি করে বিক্রি করেন দোকানীরা। এলাকার নতুন জামাইরা সেসব মিষ্টি কিনে নিয়ে যান শ্বশুরালয়ে।

প্রতিবারের ন্যায় এবারও মেলার প্রধান আকর্ষণ ছিলো মাছপট্টিতে। মেলার মাছ বাজার ঘুরে দেখা যায়, মেলা প্রাঙ্গণে কয়েকশ’ খুচরা বিক্রেতা দোকান সাজিয়েছেন। মেলার পূর্বপ্রান্তে উত্তর-দক্ষিণে লম্বালম্বিভাবে সারিবদ্ধভাবে মাছের দোকান সাজানো। প্রতিটি দোকানে মাঝারি ও ছোট বিভিন্ন প্রজাতির মাছ সাজিয়েন তারা। এই সারির সম্মুখভাগে বসেছে বড় মাছের বাজার। মেলায় আকৃতি ভেদে প্রতিকেজি রম্নই বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা, কাতলা ৪৫০ থেকে ৮০০টাকা, মৃগেল ২৫০ থেকে ৪০০, চিতল ৫০০ থেকে ৭০০, বোয়াল ৬০০ থেকে এক হাজার ২০০, হাঙরি ২০০ থেকে ৪০০, গ্রাসকার্প ২৫০ থেকে ৪০০, সিলভার কার্প ও বিগহেড ৩৫০ থেকে ৪০০, কালিবাউশ ৩০০ থেকে ৪০০, শোল ৪০০ থেকে ৫৫০ ও পাঙ্গাস ১৫০ থেকে ৪০০ টাকা কেজি। ক্রেতারা জানান, বিগত বছরের তুলনায় এবার মাছের দাম কিছুটা বেশি। মহিষাবান সার্বজনীন সন্ন্যাসী পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি নিকুঞ্জ কুমার পাল জানান, এই মেলার প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিলো সন্ন্যাসী পূজা; সেটাই ছিলো মূলত ঐতিহ্য। কিন্তু বর্তমানে জায়গা নিয়ে জটিলতা ও মেলা উদযাপন কমিটির সমন্বয়হীনতার কারণে মেলার সেই ঐতিহ্য হারাতে বসছে। এখন মেলা কেন্দ্রিক কেনাকাটাই মুখ্য হয়ে উঠেছে।
পোড়াদহ মেলার আয়োজক ও মহিষাবান ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ বলেন, মেলার যে ঐতিহ্য তা টিকিয়ে রাখতে সর্বত্মক চেষ্টা চালানো হয়েছে। মানুষ তাদের প্রাণের টানেই মেলায় আসে। আর আশপাশের গ্রামগুলো আত্মীয়-স্বজনের মিলন মেলায় পরিণত হয়। তিনি বলেন, মেলা প্রাঙ্গণের পূর্বপ্রান্তে রাস্তা ঘেঁষে মাছের ১২টি আড়ত বসেছে। ভোর থেকে মেলায় আসা বিভিন্ন এলাকার খুচরা ব্যবসায়ী এসব আড়ত থেকে মাছ কিনে মেলায় বিক্রি করেন। মেলায় রাজশাহী, নাটোর, সিরাজগঞ্জ, নওগাঁ, চট্টগ্রাম, সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা পাইকারি মাছ বিক্রি করতে এসেছেন বলেও জানান তিনি। গাবতলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ জানান, ঐতিহ্যবাহী পোড়াদহ মেলার নিরাপত্তাসহ আশপাশের এলাকার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সেখানে সার্বক্ষণিক পুলিশের টহল রয়েছে। মেলাকে কেন্দ্র করে সে উৎসব তা যেন বিঘ্নিত না হয় সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা হয়েছে।

































