প্রসংশায় ভাসছেন নির্মাণ শ্রমিক এনামুল
অমর চাঁদ গুপ্ত অপু :
দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা করলেন দিনমজুর এনামুল হক (৬৫)। এনামুল হকের বুদ্ধিমত্তা আর দৃঢ় মনোবলের জন্য লাঠির মাথায় কলার মোচার লাল পাপড়ির সংকেত দেখিয়ে থামিয়ে দেন আন্তঃনগর পঞ্চগড় এক্সপ্রেস ট্রেন। এতে নিশ্চিত ট্রেন দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছেন ওই ট্রেনের শত শত যাত্রী।
ঘটনাটি ঘটেছে, গত সোমবার (২৩ মার্চ) সকাল সাড়ে ৬টার দিকে ফুলবাড়ী-বিরামপুর রেলপথের ৩৫২/৫ থেকে ৩৫২/৬ কিলোমিটারের মাঝামাঝি এলাকায়।
স্থানীয়রা জানান, উপজেলার পূর্ব চন্ডিপুর গ্রামের মৃত ফজলুল হকের ছেলে নির্মাণ শ্রমিক এনামুল হক সকালে কাজের উদ্দেশ্যে রেলপথ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় ফুলবাড়ী-বিরামপুর রেলপথের ৩৫২/৫ থেকে ৩৫২/৬ কিলোমিটারের মাঝামাঝি এলাকার রেললাইনের প্রায় এক ফুট অংশ ভাঙা দেখতে পান। এ সময় আশপাশের লোকজনকে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানোর জন্য বলে ট্রেন আসার আশঙ্কায় পাশের কলাবাগান থেকে কলার মোচা ভেঙ্গে এনে মোচার লাল পাপড়ি লাঠির সঙ্গে বেঁধে সতর্ক সংকেত দিতে ট্রেন থামাতে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েই দাঁড়িয়ে যান রেললাইনের ওপর। এর মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা পঞ্চগড় গামী আন্তঃনগর পঞ্চগড় এক্সপ্রেস ট্রেনটি ঘটনাস্থলে পৌঁছে চালক লাল সংকেত দেখে ট্রেনটি থামিয়ে দেন। এতে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছেন ট্রেনের শত শত যাত্রী।
এদিকে এনামুল হকের ছেলে শাহিনুর রহমান পার্বতীপুর রেলওয়ে অফিসে ফোন করে বিষয়টি জানালে প্রায় অর্ধ ঘণ্টার মধ্যেই সেখান থেকে প্রকৌশলী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে জরুরি মেরামমত কাজ সম্পন্ন করলে পঞ্চগড় এক্সপ্রেস ট্রেনটি গন্তব্যে ছেড়ে যায়।
এঘটনার পর এনামুল হকের সঙ্গে কথা বলতে তার বাড়ীতে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। পরিবারের লোকজন জানিয়েছে এনামুল হক কাজের সন্ধানে ফরিদপুর জেলায় চলে গেছেন।
ফুলবাড়ী রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার শওকত আলী বলেন, সকাল সাড়ে ৬টার দিকে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী-বিরামপুর রেলপথের মাজামাঝি এলাকায় এক ফুট লেল লাইন ভেঙ্গে যাওয়ার খবর পেয়ে প্রকৌশলী দল লাইন মেরামত করে দেওয়ায় ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।
ট্রেনের লোকো মাস্টার তহিদার রহমান বলেন, ঢাকা থেকে পঞ্চগড় এক্সপ্রেস ট্রেনটি নিয়ে পঞ্চগড় যাচ্ছিলেন। সঙ্গে ছিলেন সহকারী লোকো মাস্টার আসাদুজ্জামান খান। ট্রেনটি জয়পুরহাট ছেড়ে পরবর্তী গন্তব্য পার্বতীপুরের উদ্দেশ্যে যাওয়ার সময় বিরামপুর স্টেশন পার হয়ে কিছু দূর যাওয়ার পর তিনি লক্ষ্য করেন, রেললাইনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক ব্যক্তি লাঠির মাথায় লাল রঙের কিছু একটা নিয়ে ট্রেন থামার জন্য সংকেত দিচ্ছিলেন। এ দৃশ্য দেখে তিনি ৮২ কিলোমিটার গতিতে থাকা ট্রেনটি দাঁড় করাতে সক্ষম হন। ইঞ্জিন থেকে নেমে দেখেন রেললাইনের ৯ ইঞ্চির মতো একটি অংশ ভেঙে পড়ে আছে। পরে রেললাইন মেরামত শেষে ৪০ মিনিট বিলম্বে ট্রেনটি ছেড়ে আসে। ট্রেনটি না থামানো গেলে নিশ্চিত দুর্ঘটনার কবলে পড়তে হতো।
পার্বতীপুর প্রকৌশল অফিস সূত্রে জানা যায়, পার্বতীপুর ও হিলি সেকশনের মধ্যে ২৪কিলোমিটার রেলপথ খুবেই ঝুঁকিপূর্ন। এরমধ্যে হিলি সেকশনে ১২কিলোমিটার, পার্বতীপুর সেকশনে ৬কিলোমিটার ও ডিও সেকশনে রয়েছে ৬কিলোমিটার রেলপথ। পশ্চিম রেলে গত এক বছরে শতাধিক রেললাইন ভাঙার ঘটনা ঘটলেও শুধু হিলি সেকশনেই রেল ভাঙার ঘটনা ঘটেছে ৬২ বারের বেশি।
পার্বতীপুর রেলওয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী শেখ আল আমিন বলেন, পুরাতন রেলের কারণে বারবার দুর্ঘটনা ঘটছে। গত ২০অক্টোবর হিলি স্টেশনের কাছে চিলাহাটি ট্রেনকে বঁচিয়েছেন এক ইটভাঁটা শ্রমিক। রেললাইন ভাঙার খবর পেলেই ক্ষতিগ্রস্ত অংশ কেটে ফেলে ফিসপ্লেট লাগিয়ে রেলপথ সচল করা হচ্ছে। এতে স্লিপারও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বড় ধরনের দুর্ঘটনার আতঙ্কে থাকতে হয় আমাদের। তিনি ট্রেনের দ্রুত গতিকেও লাইন ভাঙার একটি কারণ বলে মনে করেন।
পার্বতীপুর রেল বিভাগের ঊর্ধ্বতন-সহকারী প্রকৌশলী রাকিব হাসান বলেন, পার্বতীপুর-সান্তাহার পথের ২৪কিলোমিটার পথে রেললাইন ভাঙার ঘটনা এখন নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৯৪৩ সালে নির্মিত রেললাইন এখনো ব্যবহার করা হচ্ছে ওই পথে। ৯০পাউন্ডের রেললাইনগুলো অনেক আগেই মেয়াদ উর্ত্তীর্ণ হয়ে গেছে। ১২০ পাউন্ডের রেললাইন বসানো হলে লাইন ভাঙা রোধ করা সম্ভর হবে। বিষয়টি নিরসনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। তারাই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।
আমন্ত্রণ/এজি
ফুলবাড়ীতে কলার মোচার লাল পাপড়ির সংকেতে ট্রেন থামালেন নির্মাণ শ্রমিক এনামুল, দুর্ঘটনা থেকে প্রাণ বাঁচলো শতশত যাত্রীর
মার্চ ২৪, ২০২৬
































