নবাবগঞ্জ থেকে এম রুহুল আমিন প্রধান :
করতোয়াসহ পঞ্চগড়ের প্রায় সব নদীতেই এখন বোরো ধানের আবাদ হচ্ছে। নদীগুলোর বুকে পলি মাটি জমে আবাদযোগ্য কৃষিজমিতে রূপ নিয়েছে। নতুন পলিমাটিতে বোরো ধান, রসুন, পেঁয়াজ, বাদাম, তিল, পাট, ভুট্টা ও গমসহ নানা রকম শাকসবজির চাষ হচ্ছে। নদীর বুকে বাতাসে দোল খাওয়া বোরো ধানের সবুজ ক্ষেত দেখলে সবার মন ভরে যায়। তবে, পানিশূন্য নদীর বুক কারো কারো মনে বেদনারও উদ্রেক করে। পরিবেশ বাদীদের মন বিষাদে ছেয়ে যায়।
পরিবেশবিদরা বলেন, পঞ্চগড়সহ গোটা উত্তরাঞ্চল মরুভূমিতে রূপ নিতে চলেছে। খড়া মৌসুমে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অস্বাভাবিকভাবে নিচে নেমে যায়। এ কারণে নদীর বুক সবুজ ধানে দোলা দিলেও সাধারণ আবাদি জমিগুলো ফসলহীন হয়ে পড়ছে। এতে পঞ্চগড়সহ উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবনে নেমে এসেছে দুর্ভোগ। নদীর বুকে ফসলের সমারোহ থাকলেও সাধারণ কৃষিজীবীদের ভাগ্য এতে খুলছে না।
ফারাক্কা বাঁধের কারণে পঞ্চগড়সহ উত্তরাঞ্চলের শতাধিক নদী এখন পানিশূন্য। নদীগুলো মরে যাচ্ছে। কোনো কোনো নদীর বুকে পানির ক্ষীণধারা চলমান থাকলেও সেটি নদীকে বাঁচিয়ে রাখতে পারছে না। ইতোমধ্যে নদী আবাদি জমিতে রূপ নিচ্ছে। নদীর বুকে আবাদ হচ্ছে বোরোধানসহ নানান জাতের সবজি।
বিগত ৪০ বছর আগেও এই করতোয়া নদীর বুকে শুকনো মৌসুমে টলমল করত পানি। নদীতে স্রোত ছিল, সারা বছর পালতোলা নৌকা চলত। এখন পলিমাটি জমে জমে নদীর বুক ভরাট হয়ে আবাদি জমিতে রূপ নিয়েছে। সেই সাথে বন্ধ হয়ে গেছে উজান থেকে আসা পানির স্রোত। এতে করে নদী পাড়ের মানুষের জীবনযাত্রার ওপর পড়েছে নৈতিবাচর প্রভাব। পরিবেশ, কৃষি ও নিম্ন আয়ের সাধারণ মানুষের জীবনযাপন এখন আরনদী কেন্দ্রিক নেই।
পঞ্চগড় জগদল গোয়াল পাড়ার আইয়ুব আলী জানান, নদীর বুকে তিনি প্রায় ৫০ শতক জমিতে বোরো ধানের চাষ করেছেন। সেই ধানে তার সারা বছরের খাবার হয়ে যায়। ডাহুক নদীতে বোরো ধানের চাষ করেছেন মাঝি পাড়ার ইসহাক আলী, জালাল উদ্দীন ও হেলাল। নদীনির্ভর পরিবারগুলো এভাবেই এখন নদীর বুকে কৃষিনির্ভর হয়ে উঠছে। অনেকে নদীর বুকে রসুন, পেঁয়াজ, আলু ও গমের চাষ করেছেন। কেউ কেউ মিষ্টি কুমড়া, লাউ, তিল ও কাঁচা মরিচের আবাদ করেছেন। কারো কারো ভুট্টার ক্ষেতে ঢেউয়ের মতো বয়ে যাচ্ছে দক্ষিণ হাওয়া। অনেকে লাফাশাক, লালশাক, পালংশাক, ডাটাশাকের চাষ করেছেন। এসব শাক এখন বাজারে বিক্রির জন্য নিয়ে আসছেন অনেকেই। প্রবাহমান নদীগুলোর মধ্যে করতোয়া, ডাহুক, তালমা, টাংগন, চাওয়াই, মহানন্দা, গাবরা, বেরং, পাথরাজ, তিরনই, বুড়া তিস্তাসহ প্রায় ২৯টি নদীতে বর্ষা মৌসুমে স্রোতধারা প্রবাহমান থাকলেও শুকনো মৌসুমে সবগুলো নদীর স্রোত বন্ধ হয়ে যায়। অনেকে বলছেন, পঞ্চগড়সহ উত্তরাঞ্চলের অধিকাংশ নদীই এখন মানচিত্র থেকে হারিযে যেতে বসেছে।
পরিবেশবিদরা মনে করেন, খরা ও মরুর প্রভাব দূর করার জন্য হারিয়ে যাওয়া নদীগুলোর পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে। রিভারাইন পিপল বাংলাদেশের অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, এ অঞ্চলের নদীগুলো কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের একটি অভাবনীয় ইতিবাচক ফল বয়ে আনে। পঞ্চগড়ে নদীগুলোতে পানির প্রবাহ না থাকায় পশুপাখি, জীবজন্তুর ওপরও বিরূপ প্রভার পড়ছে। নদীর আশপাশের জমির মালিক ও চাষিরা নদীকেন্দ্রীক সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
করতোয়াসহ পঞ্চগড়ের সব নদীতে চলছে বোরো আবাদ
মার্চ ২, ২০২৪
































