রীতা রানী কানু :
আজ ২৪ এপ্রিল ঢাকার সাভারের রানা প্লাজা ট্রাজেডি’র ১৩ বছর। আজকের এইদিনে রানা প্লাজার ভবনের নিচে চাপা পড়ে চিরতরে দুই পা হারিয়ে পঙ্গুত্ববরণ করেছেন দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর গার্মেন্টশ্রমিক রেবেকা বেগম (৩১)। রেবেকা বেগম দুই পা হারিয়ে প্রাণে বেঁচে গেলেও মাসহ পরিবারের পাঁচজন হারিয়ে গেছেন রানা প্লাজার ভেঙ্গে পড়া ভবনের ইটপাথরের কংক্রিটের স্তূতের নিচে। আজও তাদের কোনো খোঁজ মেলেনি।
ফুলবাড়ী উপজেলার ২নং আলাদিপুর ইউনিয়নের বারাইহাট চেয়ারম্যানপাড়া গ্রামের রাজমিস্ত্রি মোস্তাফিজুর রহমানের স্ত্রী গার্মেন্টস শ্রমিক রেবেকা বেগম। ১৭ বছর বয়স থেকে তার মা, দাদি, ফুফুসহ রানা প্লাজার গার্মেন্টেসে কাজ করতেন। ঘটনার দিন সকালে না খেয়েই মাসহ পরিবারের সাতজন রানা প্লাজার ষষ্ঠ তলায় গার্মেন্টেসের কাজে যোগ দেন। কাজের এক পর্যায়ের হঠাৎ বিকট শব্দে ভবনটি ভেঙ্গে পড়ে। ওই কক্ষের দেয়ালের নিচে দুই পা চাপা পড়ে আটকা পড়েন রেবেকা বেগম। দুইদিন পর স্বেচ্ছাসেবীরা তাকে উদ্ধার করেন। রেবেকাসহ দুইজন প্রাণে বেঁচে গেলেও ভবনের নিচে চাপা পড়ে চিরতরে হারিয়ে গেছেন তার মা চান বানু, দাদি কোহিনুর ও ফুফু রাবেয়াসহ অন্য পাঁচজন স্বজন।
গত বুধবার (২২ এপ্রিল) সরেজমিনে উপজেলার রাবাই চেয়ারম্যানপাড়ার বাড়ীতে কথা হয় পঙ্গুত্ববরণকারী গার্মেন্টসশ্রমিক রেবেকা বেগমের সঙ্গে। রেবেকা বেগম বলেন, সকাল ৯টার দিকে বিকট শব্দে রানা প্লাজা ধসে পড়ে। ঘটনার পর জ্ঞান ছিল না। জ্ঞান আসলে দেখেন পায়ের ওপর সিমেন্টের বিম চাপা পড়েছে। পরে তাকে উদ্ধার করে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে এক বছর ধরে রেবেকার চিকিৎসা দেওয়া হয়। ওই সময় তার বাম পা কোমর পর্যন্ত ও ডান পা গোড়ালি পর্যন্ত কেটে ফেলতে হয়েছে। ওই রানা প্লাজার ভবন ধসের পর সরকারি ঘোষণা ছিল যেসব শ্রমিক শরীরের দুইটি অঙ্গ হারিয়েছেন তাদেরকে ১৫ লাখ এবং যারা একটি অঙ্গ হারিয়েছেন তারা ১০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ পাবেন। কিন্তু রেবেকা বেগম শরীরের দুইটি পা হারালেও তাকে সরকারি অনুদান দেওয়া হয়েছে একটি পা হারানোর ১০ লাখ টাকা। রেবেকা বেগম একটি পা হারিয়েছেন সংশ্লিষ্টদের এমন ভুল তথ্যের কারণে রেবেকা সরকার ঘোষিত অনুদানের পুরোপুরি অর্থ পাননি। তবে অনুদানের টাকা স্থায়ী আমানত হিসেবে ব্যাংকে রেখেছেন। সেই টাকা থেকে প্রতি মাসে যা পান তা দিয়ে কোনমতে সংসার চলছে। তাকে ও বাচ্চাদের দেখাশুনার জন্য তার স্বামী বাইরে কাজ করতে পারেন না।
রেবেকা বেগম আরো বলেন, তার দুই পায়ে চারবার করে আটবার ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে অপারেশন করতে হয়েছে। বর্তমানে আবারো দুইপায়ের হাড্ডি বের হয়ে আসায় প্রচন্ড ব্যথা হচ্ছে। চিকিৎসক দ্রæত অপারেশন করতে বলেছেন। কিন্তু অর্থের অভাবে সেটি করাতে পারছেন না রেবেকা। দুর্ঘটনার দীর্ঘ ১৩ বছর পার হয়ে গেছে। এরমধ্যে একটি ছেলে ও একটি মেয়ে সন্তানের মা হয়েছেন। মেয়ে সিদ্রাতুল মুনতাহা (১১) পঞ্চম শ্রেণিতে স্থানীয় এক কিন্ডারগার্টেন স্কুলে এবং ছেলে মাদানী নূর (৬) প্রথম শ্রেণিতে লেখাপড়া করছে।
রেবেকা বেগমের স্বামী নির্মাণশ্রমিক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, রানা প্লাজা ধসের দুই বছর আগে নিজেদের পছন্দে তারা বিয়ে
করেছিলেন। তিনি সাভারে রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন আর রেবেকা বেগম রানা প্লাজার পোশাক কারখানায়। রানা প্লাজা ট্রাজেডি তাদের সাজানো সংসার লন্ড ভন্ড করে দিয়েছে। স্ত্রীকে দেখভালের জন্য বাড়ী ছেড়ে বাইরে কাজে যেতে পারেন না। খুব কষ্টে কাটছে তাদের জীবন সংসার তবে ব্র্যাক সংস্থার হিউম্যানিটারিয়ান প্রোগ্রামের আওতায় ৭ লাখ ২১ হাজার টাকা ব্যয়ে বারাই এলাকায় ৫ শতাংশ আধাপাকা বাড়ী নির্মাণ করে দিয়েছে।
এদিকে রানা প্লাজার ষষ্ঠতলায় সুয়িং অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন গুলশানে জান্নাত শাবানা (২৭)। পাশেই এনাম মেডিকেলে নিরাপত্তাপ্রহরী হিসেবে চাকরি করতেন তার স্বামী আতাউর রহমান। রানা প্লাজা ধসের ঘটনা চোখের সামনে দেখেছেন আতাউর। দুর্ঘটনায় আহত ও নিহত ব্যক্তিদের কাছে ছোটাছুটি করেছেন। জীবিত মানুষদের কাছে স্ত্রীর খোঁজ করেছেন। এরপর ১৩ বছর কেটে গেলেও স্ত্রী শাবানাকে খুঁজে পাননি আতাউর রহমান।
আতাউর-শাবানা দম্পতির বাড়ি ফুলবাড়ী উপজেলার কাজিহাল ইউনিয়নের ডাঙ্গাপাড়া গ্রামে। বুধবার (২২এপ্রিল) আলাপকালে আতাউর রহমান জানান, দুই সন্তান, স্ত্রী আর মাকে নিয়ে তার সংসার ছিল। ছেলেমেয়েকে মায়ের কাছে রেখে ঢাকায় চাকরি করতেন স্বামী-স্ত্রী। ছেলে সাজ্জাদ আহম্মেদ সজিবের বয়স তখন ৫ বছর আর মেয়ে সোহানা আফরিন সানুর ৩ বছর। ভবন ধসের ৫ মাস পর এলাকায় ফিরে আসেন। ছেলেটা মায়ের কথা কিছুটা বলতে পারে। মায়ের জন্য প্রথম প্রথম খুব কান্নাকাটি করত। কিন্তু মেয়ের তেমন কোনো স্মৃতি নেই। এলাকায় ফিরে সন্তানদের মায়ের কাছে রেখে কৃষিকাজ শুরু করেন। সন্তানদের কথা চিন্তা করে দ্বিতীয়বার বিয়ে করেছেন।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকায় নাম ছিল শাবানার। স্বামী আতাউর রহমান ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন ১৩ লাখ টাকা। ছেলেমেয়ে নতুন মায়ের কাছে ভালোই আছে উল্লেখ করে আতাউর বলেন, ‘টাকা হয়তো পেয়েছি, কিন্তু ১৩ বছরেও স্ত্রীর মরদেহটাও দেখতে পাইনি।
মেয়ে সাজ্জাদ আহম্মেদ সজিব এবার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিবে। আর মেয়ে সোহানা আফরিন সানু এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। ওদের মা বেঁচে থাকলে আজ কত খুশি হতো। কত সুন্দর সংসার ছিল আমাদের,’ বলতে বলতে গলা ধরে আসে আতাউরের।
শাবানার মেয়ে সোহানা আফরিন সানু বলেন, ‘তখন আমি অনেক ছোট ছিলাম। মায়ের চেহারাটা মনে নেই। মা কী জিনিস বুঝি না। অন্যের মাকে দেখি। মাকে খুব কাছে পেতে ইচ্ছে করে। আজ মা থাকলে আমাদের কত আদরযত্ন করতেন। মায়ের মুখটা খুব দেখতে ইচ্ছে করে।’
আমন্ত্রণ/এজি
































