বগুড়া ব্যুরো :
৩০ বছর ধরে গাওয়া হয় না জাতীয় সঙ্গীত। হয় না কোনো সমাবেশ-শপথ। নেই কোনো টয়লেট, এমনকি খেলার মাঠও নেই। এটি হচ্ছে বগুড়ার ধুনট উপজেলার ভান্ডারবাড়ি ইউনিয়নের যমুনা পাড়ের রাধানগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্র। মাত্র পাচ শতক জমির ওপর দাঁড়িয়ে আছে বিদ্যালয়টি। শুধু তাই নয়, স্কুল ভবনের সঙ্গেই ব্যক্তিগত দুটো টয়লেট দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। বিদ্যালয়ের বারান্দার সামনে মুরগির খুপি, আবর্জনা, ইটের স্তুপ, বাতাসে উড়ে আসা ধুলা, বালু উত্তোলনের ড্রেজার এবং বালু বহনকারী ট্রাকের। বিরাম শব্দ। এই হচ্ছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিদিনের চিত্র।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৭৩ সালে বিদ্যালয়টি ভান্ডারবাড়ি ইউনিয়নের রাধানগর গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয়। তারপর যমুনার ভাঙনে রাধানগর গ্রাম বিলীন হয়ে গেলে সেটি চলে যায় ওই ইউনিয়নের চৌবের গ্রামে। এক সময় চৌবেরও যমুনায় বিলীন হয়ে যায়। সেখান থেকে বিদ্যালয়টি স্থানান্তর করে নিয়ে আসা হয় শহড়াবাড়ি গ্রামে। শহড়াবাড়িও এক পর্যায়ে ভাঙনের কবলে পড়ে যমুনা গর্ভে চলে যায়। অবশেষে প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে আসা হয় বালিয়া আটা গ্রামে। তবে বিদ্যালয়টি রাজানগর সরকারি বিদ্যালয় হিসাবে এখনও আছে। তিন জন পুরুষ ও দুই জন মহিলা শিক্ষক দিয়ে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থী সংখ্যা ৬৯ জন।
সরেজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, সেমি পাকা শিক্ষকদের একটি রুম এবং শিক্ষার্থীদের দুটি রুমে পাঠদানের পরিবেশ থাকলেও টিনসেড একটি ঘরের দুটি রুম পাঠদানের পরিবেশ নেই। বিদ্যালয় ঘেঁষে হায়দার আলী ও তোতা মিয়ার বসতবাড়ি। ক্লাসরুম ঘেঁষে ওই দুই বাড়ির দুটি টয়লেট। সেই টয়লেট থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। প্রতিষ্ঠানের বারান্দা ঘেঁষে মুরগির খুপি এবং আবর্জনার স্তুপ পড়ে আছে। বিদ্যালয় ঘেঁষে ইটের স্তুপ খেলার জায়গা না থাকায় শিক্ষার্থীদের খেলা এবং সমাবেশ করা হয়ে উঠে না। বিদ্যালয়ের দুটি টয়লেট থাকলেও কয়েক বছর হলো অকেজো। বাধ্য হয়ে মহিলা শিক্ষক ও ছাত্রীরা এ বাড়ি, ওবাড়িতে টয়লেটের কাজ সারেন। পুরুষ শিক্ষকরা পাশের মসজিদে যায়। এ ছাড়াও প্রতিনিয়ত বিদ্যালয়ের সঙ্গে লাগোয়া সড়ক দিয়ে বালু বহন করায় শিক্ষা কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। ওই বিদ্যালয় থেকে ২০০ গজ দুরে শহড়াবাড়ি, অর্ধ কিলোমিটার দুরে চুনিয়াপাড়া এবং পৌনে এক কিলোমিটার দুরে আটাচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিপাটি হলেও এ প্রতিষ্ঠান এখনও অবহেলিত এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রম চলছে।
বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণির ছাত্রী লামিয়া আখতার জানায়, টয়লেট নেই আমাদের। অন্যের বাড়িতে গেলে বিরক্ত হয়। বলেন আর আসবি না। একটা টয়লেট খুবই প্রয়োজন আমাদের। স্যারদের বললে উনারা বলেন, অফিসে বলেছি হয়ে যাবে। এটাতো জরুরি প্রয়োজন। এছাড়াও স্কুল চলার সময় বালুভর্তি ট্রাক যাতায়াত করায় শব্দে স্যারদের পড়া শুনতে সমস্যা হয় এবং বালু উড়ে এসে স্কুলে প্রবেশ করে শ্বাস নিতে সমস্যা হয়।
রিয়াদ হাসান নামের ৫ম শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থী জানায়, খেলার মাঠ নেই। টিফিন হলে পাশের মাঠে খেলতে যেতাম। কিন্তু যমুনা থেকে বালু উঠিয়ে সেখানে রাখায় সেই খেলাও বন্ধ হয়ে গেছে। স্কুলে ভর্তির পর থেকেই বিদ্যালয়ের জায়গা না থাকায় অন্য স্কুলের মত সমাবেশে শপথ পাঠ, আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি জাতীয় সংগীত গাইতে পারিনা। অন্যদের কাছ থেকে শিখেছিলাম। এখন প্রায় ভুলেই গেছি।
৪র্থ শ্রেণির ছাত্র আল ইমরান জানায়, পাশের দুটি বাড়ির টয়লেট থেকে দুর্গন্ধ ছড়ায়। খুবই খারাপ লাগে। স্কুলের মাঝে অন্যের বাড়ি তাই গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগির উৎপাত। বড় জায়গায় স্কুলটি নিয়ে যাওয়া দরকার।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আকবর আলী জানান, স্কুলটি সব শেষ শহড়াবাড়িতে ভাঙনের কবলে পড়লে শিক্ষকরা টাকা দিয়ে বালিয়া আটায় ৫ শতক জায়গা কিনে সেখানে ঘর করা হয়। সেখানে সরকার থেকে সেমিপাকা একটি তিনরুমের ঘর করে দেয়। এরপর ২ লাখ টাকা অনুদান পেলে তার সঙ্গে শিক্ষকরা নিজে থেকে টাকা দিয়ে আসবারপত্র এবং টিনশেড দুই রুমের ঘর তৈরি করা হয়। দুটি টয়লেট করা হলেও এখন দুটোই অকেজো। প্রায় দুই বছর হলো এমন অবস্থা। বালু ব্যবসায়ীদের ঘেরা টোপে এখন আরও খারাপ অবস্থা হয়েছে। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে বিষয়টি লিখিতভাবে আবেদনও করা হলেও এখনও সুরাহা হয়নি। শিক্ষক শিক্ষার্থীদের জন্য বড় সমস্যা এটা।
১৯৯৪ সালে বিদ্যালয়টি আটাচরে আনার পর জায়গা সংকুলানের জন্য কোন সমাবেশ করা সম্ভব হয় না। তাই শপথ এবং জাতীয় সঙ্গীতও হয় না। তবে হঠাৎ হঠাৎ হয় যখন উপর থেকে লোক আসে কিংবা বিদেশিরা আসেন তখন। বিদ্যালয়ের সামনে আবর্জনা, মুরগীর খুপি স্কুলের সঙ্গে লাগোয়া বাড়ির মালিকদের নিজস্ব জায়গায়, এমনকি স্কুলের বারান্দাও তাদের জায়গায় তাই কিছু বলতে পারি না। বিদ্যালয়টি সরিয়ে বড় পরিসরে না নিলে শিশুদের জন্য এমন জায়গায় পাঠদানের অযোগ্য। মনে হয় বাংলাদেশের একমাত্র অবহেলিত বিদ্যালয় এটি।
ধুনট উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম ফজলুল হক জানান, টয়লেট হয়ে যাবে এখন। বালু ব্যাবসায়ীরা বালু উত্তোলনের সময় তাদের বালু নিংড়ানো পানি এবং বালুতে টয়লেট দুটি নষ্ট হয়ে গেছে। তবে কেউ জমি না দিলে ওই প্রতিষ্ঠান সরানো সম্ভব হবে না। সরকার জমি কিনে ভবন করবে না। এভাবেই প্রতিষ্ঠান চালাতে হবে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রেজোয়ান আহাম্মদ জানান, কেন এতদিন বিদ্যালয়ের টয়লেটসহ অন্যান্য ব্যবহা হলো না এটা আমার মাথায় কাজ করছে না। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা কি করেন তাহলে? সরকার প্রাথমিক শিক্ষায় কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে অথচ, রাধানগর স্কুলটির এমন বেহাল অবস্থা। এ বিষয়ে দ্রæত ব্যবসা গ্রহণ করা হবে।
আমন্ত্রণ/এসিজি
৩০ বছর ধরে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয় না, দুবছর ধরে নেই টয়লেট : “ধুনট সরকারি রাধানগর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্র”
নভেম্বর ২৯, ২০২৪


































