অমর চাঁদ গুপ্ত অপু :
দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর পার্শ্ববর্তী বড়পুকুরিয়া কয়লাখনিতে ভূগর্ভ থেকে উত্তোলিত কয়লার মজুদ নিয়ে মহাদুশ্চিন্তায় পড়েছেন কয়লাখনি কর্তৃপক্ষ।
কয়লাখনির পার্শ্ববর্তী বড়পুকুরিয়া ৫২৫ মেগাওয়ার্ট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে কয়লার চাহিদা কমে যাওয়ায় এবং কয়লাখনির কোল ইয়ার্ডে কয়লার মজুদের সংকুলান না হওয়ায় ভূগর্ভ থেকে কয়লা উত্তোলন বন্ধের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে খনিটিতে।
এদিকে বড়পুকুরিয়া ৫২৫ মেগাওয়ার্ট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের তিনটি ইউনিটের মধ্যে চলমান দুইটি ইউনিটের মধ্যে একটি গত সোমবার (১১ নভেম্বর) দুপুরে বন্ধ হয়ে যাওয়া ইউনিটটি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এতে করে বন্ধে হয়ে যাওয়া ইউনিটতে বর্তমানে কয়লার প্রয়োজন হচ্ছে না। ফলে কয়লার চাহিদাও আরও কমে গেছে।
অপরদিকে কয়লাখনির কোল মজুদ কয়লার ফেইসটিতে ক্ষতিকারণ গ্যাস নিঃসরণসহ কয়লার স্বতঃস্ফুর্ত প্রজ্জ¦লনের আশঙ্কা করছেন কয়লাখনি কর্তৃপক্ষ।
বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির উত্তোলিত কয়লার বর্তমানে একমাত্র গ্রাহক পার্শ্ববর্তী বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। তিন ইউনিটের এই তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদন অব্যাহত রাখতে প্রতিদিন কয়লার চাহিদা ৫ হাজার মেট্রিক টন কয়লা। কিন্তু তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি শুরু থেকেই তিনটি ইউনিট এক সঙ্গে কোখনোই চালাতে সক্ষম হয়নি। কখনো এক বা দুইটি চালু থাকলেও বেশির ভাগ সময়ই বন্ধ থাকে দুইটি ইউনিট। ফলে চাহিদানুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে পারে না এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র। এরই মধ্যে কিছুদিন থেকে ১নং ও ৩নং ইউনিট চালুর মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন হলেও গত সোমবার (১১ নভেম্বর) দুপুরে যান্ত্রিক ত্রæটির কারণে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ১নং ইউনিটটি। তিনটি ইউনিটের মধ্যে প্রায় সময় মাঝে মধ্যে দুই-একটি ইউনিট চালু হলেও বেশির ভাগ সময়ই বন্ধ থাকছে, এতে কয়লার খরচও কমে গেছে। ফলে কয়লাখনি থেকে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে চাহিদানুযায়ী কয়লা না নেওয়ায় কয়লার মজুদ বেড়ে যাচ্ছে দিন দিন খনির কোল ইয়ার্ডে। এতে করে কোল ইয়ার্ডে কয়লা সংরক্ষণের জায়গার সংকট দেখা দেয়ায় মজুদ কয়লা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন খনি কর্তৃপক্ষ।
জানা যায়, বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির ভূগর্ভ থেকে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে তিন হাজার থেকে চার হাজার কয়লা উত্তোলন হওয়ার কথা। কিন্তু চলতি বছরের ৩ আগস্ট থেকে ১৪১৪ কোল ফেইস থেকে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার মেট্রিক টন কয়লা উত্তোলন করা হচ্ছে। অক্টোবর মাসে একই কোল ফেইস থেকে তিন লাখ ৬৪ হাজার মেট্রিক টন কয়লা উত্তোলন করা হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত আরও এক লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন কয়লা উত্তোলন করা সম্ভব হবে এমনটাই আশা করছেন খনি কর্তৃপক্ষ।
কয়লাখনি সূত্রে জানা যায়, খনির ভূগর্ভ থেকে উত্তোলিথ কয়লা সংরক্ষণের জন্য খনি এলাকায় তিনটি কোল ইয়ার্ড রয়েছে। এরমধ্যে একটিতে সেডিমেন্ট কোল সংরক্ষণ করা হয়েছে। অপর দুইটি কোল ইয়ার্ডের ধারণ ক্ষমতা দুই লাখ মেট্রিক টন হলেও বর্তমানে সেখানে সংরক্ষণ করা হয়েছে প্রায় আড়াই লাখ মেট্রিক টন কয়লা। কোল ইয়ার্ডে আর নতুন করে কয়লা সংরক্ষণের জায়না না থাকাসহ ১৪১৪ কোল ফেইস থেকে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে চার হাজার থেকে পাঁচার হাজার মেট্রিক টন কয়লা উত্তোলন হওয়ায় খনি কর্তৃপক্ষ কয়লা সংরক্ষণ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। কয়লাখনি থেকে ১ অক্টোবর থেকে ২৩ অক্টোবর লিখিতভাবে তাপবিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়ে কয়লা সংগ্রহরে জন্য জানানোসহ একাধিকবার মৌখিকভাবে জানানো হলেও বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ধারনা করা হচ্ছে তাদের কয়লার মজুদ করার এবং মজুদ কয়লার ওজন কমবেশি হওয়ার সুযোগ থাকায় বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ আগাম কয়লা নিতে রাজি হচ্ছে না।
কয়লাখনি এবং তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র সূত্রে জানা যায়, কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের তিনটি ইউনিট এক সঙ্গে চালু না থাকায় আগস্ট মাস থেকে প্রতিদিন গড়ে পাঁচ হাজার মেট্রিক টন কয়লার স্থলে দুই হাজার থেকে দুই হাজার ৩০০ মেট্রিক টন কয়লা গ্রহণ করছে। ফলে কয়লাখনির কোল ইয়ার্ডে উৎপাদিত কয়লার সঙ্গে প্রতিদিন গ্রায় দুই হাজার ৭০০ মেট্রিক টন বাড়তি কয়লা মজুদ থাকছে। ফলে প্রতিদিনই কোল ইয়ার্ডে বাড়ছে কয়লার মজুদ।
বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের তিনটি ইউনিট চালু থাকলে পাঁচ হাজার মেট্রিক টন কয়লার প্রয়োজন হলেও বর্তমানে দুইটি ইউনিট চালাতে কয়লার প্রয়োজ হচ্ছে দুই হাজার ৩০০ মেট্রিক টন। অবশিষ্ট কয়লা কয়লাখনির কোল ইয়ার্ডে পড়ে থাকছে। গত সোমবার (১১ নভেম্বর) দুপুরে যান্ত্রিক ত্রæটির কারণে ১নং ইউনিটটি সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। শুধুমাত্র ৩নং ইউনিট চালু রয়েছে। এতে করে প্রয়োজন না থাকায় কয়লা গ্রহণ করা যাচ্ছে না। তবে আসছে শুষ্ক মৌসুমে কয়লার বেশি প্রয়োজন হবে, তখন মজুদ কয়লা নেওয়া হবে।
বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানী লিমিটেডের (বিসিএমসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম সরকার বলেন, বিসিএমসিএল এর কোল ইয়ার্ডের ধারণ ক্ষমতার অনেক বেশি কয়লা মজুদ রাখা হয়েছে। এতে সংরক্ষণের জায়গার সংকট দেখা দিয়েছে। আগামীতে সংরক্ষণের জায়গার সংকটের জন্য ১৪১৪ কোল ফেইস থেকে স্বাভাবিক কয়লা উত্তোলন বাধাগ্রস্ত হবে। এতে করে বিসিএমসিএল এবং চীনা ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান সিএমসি-এক্সএমসি কনসোর্টিয়ামের মধ্যে সম্পাদিক চুক্তি নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হবে। একইভাবে কোল ফেইসটিতে ক্ষতিকারক গ্যাস নিঃসরণসহ কয়লার স্বতঃষ্ফুর্ত প্রজ্জ্বলনের আশঙ্কা রয়েছে। এসব কারণেই মূলত কয়লা উত্তোলন বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
আমন্ত্রণ/এসিজি
বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির মজুদ কয়লা নিয়ে দুশ্চিন্তায় কর্তৃপক্ষ : মজুদ কমাতে উত্তোলন বন্ধের শঙ্কা!
নভেম্বর ১৩, ২০২৪


































