বগুড়া ব্যুরো :
বগুড়ার শেরপুর উপজেলার ভবানীপুরে শ্রী শ্রী মা ভবানীর মন্দিরে শুরু হয়েছে মাঘী পূর্ণিমার মহোৎসব। পূণ্যলাভের আশায়, মানত পূরণের বিশ্বাসে আর মায়ের আশীর্বাদ পেতে দেশের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন হাজারো ভক্ত ও পুণ্যার্থী।
ভোরের আলো ফোটার আগেই মন্দির প্রাঙ্গণে জমতে থাকে মানুষের ঢল। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে শাঁখারি পুকুরে পুণ্যস্নানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় উৎসবের মূল আয়োজন। শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি আর ভক্তদের কণ্ঠে মন্ত্রোচ্চারণে চারদিক মুখরিত হয়ে ওঠে। বিশ্বাস করা হয়, মাঘী পূর্ণিমার এই পুণ্যতিথিতে মা ভবানীর শাখারী পুকুরে পূণ্যস্নান ও পূজা করলে অতীত জীবনের পাপ মোচন হয় এবং মনোবাসনা পূর্ণ হয়।
রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) মাঘী পূর্ণিমা উপলক্ষে মন্দির চত্বর ও আশপাশের এলাকা রীতিমতো জনসমুদ্রে পরিণত হয়। স্থানীয়দের পাশাপাশি নাটোর, রাজশাহী, পাবনা, সিরাজগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত ভক্তদের উপস্থিতিতে উৎসব পায় পূর্ণতা। কেউ এসেছেন পরিবার-পরিজন নিয়ে, কেউবা একা, কেবল মায়ের দর্শন আর প্রসাদের আশায়।
শুধু পূজা-অর্চনাই নয়, এই উৎসব ঘিরে বসে এক বিশাল গ্রামীণ মেলা। মন্দির চত্বরে সারি সারি দোকানে দই-মিষ্টি, চিড়া-মুড়কি, ঝুড়ি, পূজার সামগ্রী, শিশুদের খেলনা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বেচাকেনা চলে জমজমাটভাবে। মিষ্টির দোকানে ভিড় লেগেই থাকে। শোনা যায়, একদিনেই বিক্রি হয় শতাধিক মণ দই আর দেড় থেকে দুইশ’ মণ মিষ্টি।
মন্দির কমিটির তত্ত্বাবধায়ক অপূর্ব চক্রবর্তী জানান, ৫৮২ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত এই প্রাচীন মন্দিরটি শক্তিপীঠ হিসেবে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ। শাস্ত্রীয় মতে, সতী মাতার দেহখণ্ড পতিত হওয়া একান্নটি শক্তিপীঠের অন্যতম হলো ভবানীপুরের এই স্থান। সেই ধারাবাহিকতায় যুগ যুগ ধরে এখানে মাঘী পূর্ণিমা উৎসব পালিত হয়ে আসছে। দূর-দূরান্ত থেকে আগত ভক্তদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থাও রাখা হয় বলে জানান তিনি।
নাটোরের সিংড়া থেকে আসা সুকুমার রায় বলেন, “পূর্বপুরুষের আমল থেকেই আমরা মাঘী পূর্ণিমায় এখানে আসি। মায়ের কৃপায় সংসারে শান্তি আছে, এই বিশ্বাস থেকেই প্রতি বছর আসা।”
স্থানীয় ভক্ত অসীম সরকার বলেন, “মা ভবানীর কাছে প্রার্থনা করে আগে অনেক কিছু পেয়েছি। সেই বিশ্বাসই আমাকে বারবার এখানে টেনে আনে।”
রাজশাহী থেকে আসা শাঁখা বিক্রেতা সুমতি রাণী হালদার বলেন, গত ২৫ বছর ধরে তিনি এই মেলায় নারীদের জন্য বাহারি নকশার শাঁখা বিক্রি করে আসছেন। তবে এবছর তুলনামূলকভাবে বিক্রি কিছুটা কম বলে জানান তিনি।
মিষ্টি ব্যবসায়ী রমেশ সাহা বলেন, একদিনের এই মেলায় প্রায় ১০০ মণ দই এবং ১৫০ থেকে ২০০ মণ মিষ্টি বিক্রি হয়। দই প্রতি সরা ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা এবং সন্দেশসহ বিভিন্ন মিষ্টি প্রতি কেজি ২৮০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মন্দির কমিটির সাবেক সভাপতি ও শেরপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র স্বাধীন কুমার কুন্ডু জানান, অন্যান্য বছরের মতো এবারও শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে মাঘী পূর্ণিমা উৎসব উদযাপিত হচ্ছে। উৎসব নির্বিঘ্ন করতে প্রশাসনের পাশাপাশি মন্দির কমিটির উদ্যোগে স্বেচ্ছাসেবক দল সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছে।
এ বিষয়ে শেরপুর থানার ওসি ইব্রাহীম আলী জানান, মা ভবানীর মন্দিরে মাঘী পূর্ণিমা উৎসব সুষ্ঠু ও নির্বিঘ্নভাবে সম্পন্ন করতে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যা দিবাগত রাত পর্যন্ত বহাল ছিল। স্থানীয়দের সহযোগিতায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উৎসবটি সম্পন্ন হয়েছে।
আমন্ত্রণ/এজি
বগুড়ায় মাঘী পূর্ণিমার পুণ্যস্নানে হাজারো ভক্তের মিলনমেলা
ফেব্রুয়ারি ২, ২০২৬


































