বগুড়া ব্যুরো :
বগুড়ার শেরপুরে উপজেলা পর্যায়ে প্রথমবারের মতো ব্যতিক্রমধর্মী নাগরিক সংলাপ ‘জনতার কণ্ঠে জনতার ইশতেহার’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত পৌর শহরের শহীদ গাজীউর রহমান কমিউনিটি সেন্টারে এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।
জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এরপর মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদ, জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং ওসমান হাদীর স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
‘একসাথে গড়ি সমৃদ্ধ শেরপুর-ধুনট’ সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানের আহ্বায়ক ছিলেন আসিফ সিরাজ রব্বানী। তিনি এসআর গ্রুপের পরিচালক এবং বগুড়া জেলা বিএনপি ও শেরপুর উপজেলা বিএনপির সদস্য।
অনুষ্ঠানে নির্ধারিত আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন বগুড়া-৫ ও ৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম মো. সিরাজ, পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ)-এর পরিচালক আবদুল মজিদ, কর্পোরেট ও টেলিকম ব্যক্তিত্ব মেহবুব চৌধুরী, গাবতলী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আমিরুল ইসলাম, সুইজারল্যান্ড দূতাবাসের প্রোগ্রাম ম্যানেজার ড. সৈয়দা জিনিয়া রশিদ এবং শেরউড ইন্টারন্যাশনাল (প্রা.) স্কুল অ্যান্ড কলেজের পরিচালক শফিকুল ইসলাম। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন আমিনুল মজলিস।
শেরপুর ও ধুনট উপজেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অন্তত পাঁচ শতাধিক মানুষ সংলাপে অংশ নেন। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, চিকিৎসক, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, জুলাই যোদ্ধা, কৃষক, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধি, সনাতন ধর্মের পুরোহিত, মসজিদের ইমাম, পরিবহন শ্রমিক, নারী উদ্যোক্তা, ফ্রিল্যান্সার, স্বাস্থ্যকর্মী, ক্রীড়া সংগঠক ও সংবাদকর্মীরা।
মুক্ত আলোচনায় দুই উপজেলা থেকে অন্তত ৫০ জন অংশগ্রহণকারী সরাসরি তাঁদের সমস্যা, অভিজ্ঞতা ও দাবির কথা তুলে ধরেন।
বক্তব্যে সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম মো. সিরাজ বলেন, তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া আগামীর বাংলাদেশ গড়া সম্ভব নয়। তাই তরুণদের জন্য পরিকল্পিত কর্মসূচি ও বিশেষ সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। তিনি বলেন, ইমাম ও পুরোহিতরা কেবল ধর্মীয় নেতা নন; সমাজ গঠনে তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাঁদের বাকস্বাধীনতা ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা জরুরি। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে মানবিকতা, প্রশিক্ষণ এবং অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি কৃষি, আইটি ও কর্মসংস্থানে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষক ও তরুণদের এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে যোগ্যতা, সততা ও নৈতিকতার ভিত্তিতে দেশ পরিচালনার অঙ্গীকারও করেন।
নারী উদ্যোক্তা সুরাইয়া ফারহানা (রেশমা) বলেন, শেরপুর ও ধুনটে নারী উদ্যোক্তারা সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ছেন। তাঁদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ ও বাজার ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা না হলে টেকসই অগ্রগতি সম্ভব নয়।
আইটি উদ্যোক্তা ও ফ্রিল্যান্সার রুহুল আমিন বলেন, সরকারি উদ্যোগে তথ্যপ্রযুক্তি ও ইংরেজি শিক্ষায় গুরুত্ব দিলে উপজেলা পর্যায়েই দক্ষ ফ্রিল্যান্সার তৈরি করা সম্ভব। এতে বেকারত্ব কমবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়বে।
মুক্ত আলোচনায় অংশ নেওয়া কৃষকরা বলেন, কৃষি উৎপাদন টেকসই করতে সমন্বিত প্রকল্পের অভাব রয়েছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর কৃষি উৎপাদন বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি ও পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান তাঁরা।
চিকিৎসক শাহ আলী বলেন, সরকারি হাসপাতালের নষ্ট যন্ত্রপাতি দ্রুত সংস্কার এবং বেসরকারি হাসপাতালে সেবার মান নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো আধুনিক ও কার্যকর করার দাবি জানান তিনি।
গাবতলী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘জনতার কণ্ঠে জনতার ইশতেহার’ জনগণের অভিযোগ ও প্রস্তাব শোনার একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম। এর মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহিতা বাড়বে। তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক সংকট ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর অভাবে সৃষ্ট অপরিচ্ছন্নতার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
সমাপনী বক্তব্যে আয়োজক আসিফ সিরাজ রব্বানী বলেন, এ ধরনের নাগরিক সংলাপ গণতান্ত্রিক চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এর মাধ্যমে জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ ও আস্থার সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে। তিনি জানান, প্রতিবছর অন্তত দুইবার এ ধরনের সংলাপ আয়োজনের মাধ্যমে শেরপুর ও ধুনটে গণতান্ত্রিক চর্চা আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে।
আমন্ত্রণ/এজি
বগুড়ায় নাগরিক সংলাপ‘জনতার কণ্ঠে জনতার ইশতেহার’
জানুয়ারি ২২, ২০২৬
































