নওগাঁ সংবাদদাতা :
সকালবেলা পত্রিকার পাতা, টেলিভিশন কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম- দৃষ্টি পড়লেই সামনে আসে দেশের কোনো না কোনো স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি আর আহতের খবর। এ খবরে কারও পরিবারে শুরু হয় শোকের মাতম আবার কারও কাছে তা খুবই সাধারণ। যে পরিবার হারায়, তার স্বজন ও সে পরিবারের সদস্যরাই কেবল বুঝতে পারে সে যন্ত্রণার ভার কতটা দুঃসহ, বদলে যাওয়া জীবনের পথ কতটা কঠিন।
দেশের বিভিন্ন জেলার মতো নওগাঁ জেলায়ও সড়ক দুর্ঘটনায় আহত আর নিহতের তালিকা বেশ লম্বা। নওগাঁর পুলিশ কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্য মতে, গত ৩৫ মাসে নওগাঁ জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় মোট প্রাণহানির সংখ্যা ১৩০, আহত ১১২। এ সবের মধ্যে মামলা হয়েছে ১০৮টি।
এর মধ্যে ২০২২ সালে নিহতের সংখ্যা ১৫, আহত ১৩। রুজুকৃত মামলা ৯টি। ২০২৩ সালে নিহত ৬৪, আহত ৬৭। মামলা ৫২টি। চলতি বছরে নিহত ৫১, আহত ৩২। রুজুকৃত মামলা ৪৭টি।
এসব তথ্যের ভিত্তিতে জরিপ করলে দেখা যায়, ২০২২ এবং ২০২৪ সালের চেয়ে ২০২৩ সালে মৃত্যুর হার বেশি (৬৪) জন আর ২০২২ সালে মৃত্যুর হার সবচেয়ে কম ১৫ জন। তবে নিহত এবং আহত তুলনা করলে প্রায় সমপরিমাণ হলেও ২০২২ এবং ২০২৩ সালে নিহতের চেয়ে আহতের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। নিহত এবং আহতের ঘটনায় রুজুকৃত মামলার সংখ্যা দাঁড়ায় ১০৮ আটটি। ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইনের ৯৫, ৯৮, ৯৯ ও ১০৫-এর বিভিন্ন ধারায় এসব মামলা রুজু হয়েছে। এসব মামলা থেকে কিছু আসামি জেল-জরিমানার মধ্য দিয়ে মুক্ত হয়েছে আবার কিছু মামলা এখনো চলমান।
বাংলাদেশের সীমান্ত ঘেঁষা উওরের জেলা নওগাঁ। এ জেলার মোট ১১টি উপজেলায় ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত মোট ৩৫ মাসে সড়কে যারা প্রাণ হারিয়েছে এবং আহত অবস্থায় আজও হাসপাতালের বেডে রয়েছে, আবার অনেকে পঙ্গুত্বের অভিশাপে ধুঁকে ধুঁকে মরছেন।
কথা হয় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত এক কলেজ ছাত্রের বাবার সঙ্গে। ২০২২ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় শহরের দয়ালের মোড় এলাকার পলাশ হোসেনের। তার বাবা আইয়ুব আলী বলেন, ‘আমি ফুটপাতে ব্যবসা করলেও আমার অনেক স্বপ্ন ছিল আমার ছেলে পড়াশোনা শেষ করে ভালো চাকরি করবে। আমার সেই স্বপ্ন আর পূর্ণ হলো না। আল্লাহ! যেন আর কোনো বাবাকে সন্তানের এমন লাশ দেখতে না হয়।’
সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়া শহরের কাজীর মোড় এলাকার বাসিন্দা দুলাল হোসেন বলেন, ‘২০২৩ সালে চৌমাশিয়া মোড় এলাকায় ট্রাকের সঙ্গে আমার মোটরসাইকেলের ধাক্কা লাগে। সে যাত্রায় প্রাণে বেঁচে গেলেও দীর্ঘদিন হাসপাতাল আর বাসায় কেটেছে। আমি পরিবারের একমাত্র কর্মক্ষম ব্যক্তি হওয়ায় পুরো পরিবারটাই অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।’
পুলিশের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মামলার পুনর্বিবরণে কারণ হিসেবে দেখা যায়, বিভিন্ন ধরনের পরিবহন দুর্ঘটনা কবলিত হলেও অধিকাংশ দুর্ঘটনা মোটরসাইকেলকেন্দ্রিক। তার পরেই রয়েছে ট্রাক, বাস, সিএনজি, ইজিবাইকসহ অন্যান্য পরিবহন। সেই সঙ্গে জেলার সড়ক দুর্ঘটনাপ্রবণ কিছু এলাকা রয়েছে, যেগুলোতে বেশি দুর্ঘটনা হয় তার মধ্যে নওগাঁ-রাজশাহী মহাসড়কের জলিল চত্বর থেকে হাঁপানিয়া, চকগৌরী, নওহাটা চৌমাশিয়া মোড় উল্লেখযোগ্য।
সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিলে প্রতিদিন ছাত্র, যুবক, বৃদ্ধ এমনকি বাদ নেই মায়ের কোলের নিষ্পাপ শিশুটিও।
নওগাঁর পুলিশ সুপার (অতিরিক্ত ডিআইজি পদোন্নতিপ্রাপ্ত) মো. কুতুব উদ্দিন বলেন, ‘সড়কে দুর্ঘটনার অনেক কারণ রয়েছে। তার মধ্যে যদি মোটা অঙ্কে বলি, বেশি গতিতে গাড়ি চালানো, স্কুল, কলেজ, বাজার, রাস্তার বাঁক এমন ধরনের জায়গায় গাড়ির গতি না কমানো, ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করে বিপজ্জনকভাবে ওভারটেক করা। ফিডার রোড থেকে মেইন রোডে অসতর্কভাবে বিভিন্ন যানবাহনের প্রবেশ। অধিক আয়ের আশায় বিশ্রাম ছাড়াই বাস-ট্রাক চালকের বিরতিহীন গাড়ি চালানোসহ আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হওয়া।’
তিনি আরও বলেন, প্রতিকার হিসেবে প্রথমেই উল্লেখিত কারণগুলো থেকে আমাদের বিরত থাকতে হবে। সেই সঙ্গে দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানগুলোকে চিহ্নিত করে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড দেওয়াসহ হাইওয়ে সড়কের বাঁকে ২০ ডিগ্রির বেশি কৌণিক অবস্থানে থাকবে না এমনটা নিশ্চিত করতে হবে। সড়ক নিরাপত্তা আইন ও ট্রাফিক আইনের বিধিবিধান অমান্যকারীকে জরিমানাসহ বিভিন্ন ধরনের সচেতনতা প্রোগ্রাম ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। যেকোনো পরিবহনের চালক বিশেষ করে বাস বা ট্রাকের চালকদের গাড়ি চালানোর আগে পর্যাপ্ত বিশ্রামসহ শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে হবে।
বিআরটিএ নওগাঁ সার্কেলের ভারপ্রাপ্ত সহকারী পরিচালক আফতাবুল ইসলাম বলেন, ‘দুর্ঘটনা এড়াতে চাইলে অবশ্যই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চালক হতে হবে, ট্রাফিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। সেই সঙ্গে গাড়ির ফিটনেসসহ নানামুখী জনসচেতনতা কার্যক্রম বাড়াতে হবে। আমি নওগাঁতে নতুন, তবে বিআরটিএর সব বিধিমালা অনুযায়ী আমার কার্যক্রম অব্যাহত আছে এবং থাকবে।’
নওগাঁ জেলা বাস-ট্রাক শ্রমিকের সাধারণ সম্পাদক এস এম মতিউজ্জামান মতি বলেন, ‘আমাদের বড় গাড়ির সব চালক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তবে অনেক অল্প শিক্ষিত আছে। কিন্তু বর্তমানে ইজিবাইক (চার্জার) তথা ছোট গাড়িগুলোর চালকদের কোনো প্রশিক্ষণ না থাকার কারণে বড় গাড়িগুলোর সঙ্গে দুর্ঘটনা হয়।’
‘নিরাপদ সড়ক চাই’-এর নওগাঁ জেলা সভাপতি এ এস এম রায়হান আলম বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনারোধে চালক-পথচারী থেকে শুরু করে সবাইকে সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে হাইওয়ে সড়কে বিভিন্ন ধরনের গাড়ির ভিন্ন গতিবিধি দুর্ঘটনার একটা কারণ। আমাদের সবাইকে ট্রাফিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন হলে কিছুটা হলেও দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হবে।’
আমন্ত্রণ/এসিজি


































