দৈনিক আমন্ত্রণ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিবেদক :
চলমান তাপপ্রবাহের মধ্যে এক সপ্তাহে তাসেম আলীর খামারের দুটি গরু হিট স্ট্রোকে মারা গেছে। এতে উদ্বেগে রয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোবড়াতোলা এলাকার এ খামারি। প্রতিদিন খামারে নিজেই প্রতিটি গরু পর্যবেক্ষণ করছেন। একটু অসুস্থ হলেই চিকিৎসা করাচ্ছেন। তবে তিন দিনে আরও দুটি গরু অসুস্থ হয়েছে। লোডশেডিংয়ের কারণে খামারের তাপ নিয়ন্ত্রণ করা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে তাঁর জন্য। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না পাওয়ায় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি।
দেশজুড়ে চলমান তীব্র তাপদাহের প্রভাব পড়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জে। জেলায় রেকর্ড সর্বোচ্চ ৪২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। তীব্র গরমে মানুষ ও প্রাণিকুল বিপর্যস্ত। এ পরিস্থিতিতে খামারে গরুর মৃত্যু ও অসুস্থ হয়ে পড়ায় উদ্বিগ্ন তাসেম আলী বলছিলেন, প্রধানমন্ত্রী ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের উৎসাহ বা প্রণোদনা দিয়ে সহায়তা করছেন। সেখানে তাঁর মতো খামারিরা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে গিয়ে সহযোগিতা পান না। ভ্যাকসিন বা খামারিদের করণীয় বিষয়ে পরামর্শ মেলে না। এ বছর তিনি ২০টি গরু কোরবানির হাটে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করছেন।
১৫টি গরু প্রস্তুত করছেন শিবগঞ্জের কালোপুর গ্রামের খামারি মো. আশরাফুল আলম রশিদ। তাঁর ভাষ্য, প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে একটি ভ্যাকসিনের দাম ৪০০ টাকা হলেও বাজারে ৭৫০ টাকা। সরকারি প্রতিষ্ঠান থাকার পরও প্রতিকূল পরিবেশে সহযোগিতা না পাওয়ায় হতাশ তিনি। প্রতিদিন গড়ে সাড়ে ৫ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে জানিয়ে এ খামারি বলেন, তাপমাত্রা সহনীয় রাখতে ফ্যান চালানো জরুরি হলেও তা সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিদিন খামারে ৫ হাজার টাকা বেশি খরচ হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে আসন্ন ঈদে তাঁকে পুঁজি হারাতে হবে।
এ অবস্থা শুধু তাসেম আলী বা আশরাফুলের নয়, তাদের মতো অনেক খামারি এভাবে উদ্বেগে দিন পার করছেন। এরপরও কোরবানির ঈদ সামনে রেখে গরু মোটাতাজাকরণে ব্যস্ত তারা। তবে খাবার ও ওষুধের দাম ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় তারা চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। লোকসানের শঙ্কাও বাড়ছে।
প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলার পাঁচটি উপজেলায় এবার নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত প্রায় ১৮ হাজার খামারে ১ লাখ ৬২৯টি গরু এবং ৮১ হাজার ৩৭১টি ছাগল ও ভেড়া মোটাতাজা করা হচ্ছে। কোরবানিতে চাহিদা রয়েছে ১ লাখ ২৯ হাজার ৯৫২টি পশুর। সে হিসাবে জেলায় ৫২ হাজার ৪৮টি পশু উদ্বৃত্ত থাকছে। সে কারণে চোরাচালান বন্ধে বিজিবিসহ সংশ্লিষ্টদের চিঠি দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। শিবগঞ্জের খামারি রহমান আলী বলেন, ভারত থেকে কোনোভাবেই যেন গরু না আসে, সে ব্যবস্থা করতে হবে।
খামারের শ্রমিকরা জানান, গরমে বেশির ভাগ গবাদি পশু খাদ্য গ্রহণ বন্ধ করে দিয়েছে। চলমান আবহাওয়ায় পশু ঠান্ডা জায়গায় রাখার ব্যবস্থা করাও কঠিন। একদিকে বাড়তি খরচ, অন্যদিকে দুধের উৎপাদন কমে যাওয়ায় বিপদে খামার মালিকরা। দিনে তিনবার গোসল করাতে গিয়ে পানি নিয়েও উদ্বেগ আছে।
বিদেশি কোম্পানির চাকরি ছেড়ে জেলার লাখেরাজপাড়া গ্রামের মুনজের আলম মানিক চার বছর আগে ‘বরেন্দ্র কৃষি খামার’ গড়ে তোলেন। তিনি ঈদে ১৫টি গরু বিক্রির আশা করছেন। তবে সবকিছুর দাম বেড়ে যাওয়ায় বিপদে রয়েছেন। এ অবস্থায় পুঁজির টাকা তোলা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে তিনি বলেন, গরু পালনে যে পরিমাণ খরচ হচ্ছে, তাতে তিনি কতটুকু লাভবান হবেন বুঝতে পারছেন না। তাপদাহে পানির চাহিদা মেটাতে গিয়ে শিল্প মিটারের বিদ্যুৎ বিলও অনেক আসছে। কৃষি মিটার দিলে তারা কিছুটা সুফল পেতেন।
প্রাণিসম্পদ দপ্তর বলছে, গরম থেকে গবাদি পশু বাঁচাতে ঘর শীতল রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। টিনের চালে পানি ছিটাতে হবে। ব্যবস্থা করতে হবে ফ্যানের। দিনে তিনবার গোসল করানোর পাশাপাশি খাওয়াতে হবে স্যালাইন। বাইরে বেশি তাপমাত্রায় পশু রাখা যাবে না। সকাল ১০টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত ছায়াযুক্ত জায়গায় তাদের রাখতে হবে। অতিরিক্ত গরমে খাবার কম দিয়ে ঠান্ডা বা শীতল সময়ে বাড়িয়ে দিতে হবে। গরমে কৃমিনাশক বা টিকা দেওয়া পরিহার করতে হবে। সম্ভব হলে মিনারেল মিকশ্চার ব্লক সরবরাহ করা যেতে পারে। এ নির্দেশনা মানলে হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি কমবে।
এ বিষয়ে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা গোলাম মোস্তফা বলেন, গরু মোটাতাজা করতে খামারিরা যাতে স্টেরয়েড ব্যবহার করতে না পারেন, সে জন্য ভেটেরিনারি মেডিকেল দল ও প্রাণিসম্পদের কর্মকর্তারা কাজ করছেন। সেই সঙ্গে নিয়মিত তদারকও করা হচ্ছে। পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন দিতে না পারার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, সরবরাহের তুলনায় চাহিদা বেশি হওয়ায় সংকট রয়েছে। তবে খামারিদের সহযোগিতা না করা বা উপদেশ না দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।
তাপপ্রবাহে কোরবানির পশু নিয়ে উদ্বেগ খামারির
মে ৪, ২০২৪
































