বগুড়া ব্যুরো:
বগুড়ার শাজাহানপুরে নিখোঁজের তিন দিন পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী হাসিন রাইহান সৌমিকের (৩০) মৃত্যু নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। পুলিশ সেই রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা ও ঘাতকদের শনাক্ত এবং গ্রেফতারের চেষ্টা করছে।যদিও তার পরিবার থেকে পরিকল্পিত হত্যা দাবি করা হলেও পুলিশি তদন্তে আত্মহত্যার আলামত মিলছে। তবে তারা জোর তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন শাজাহানপুর থানার ওসি শফিকুল ইসলাম শফিক।
বগুড়া জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) আতোয়ার রহমান বলেন, সৌমিকের মৃত্যু নিয়ে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশ সেই রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা ও ঘাতকদের শনাক্ত এবং গ্রেফতারের চেষ্টা করছে।নিহত সৌমিক বগুড়ার সোনাতলা উপজেলার বোচারপুকুর গ্রামের তৌফিকুর রহমানের ছেলে। তিনি মায়ের সঙ্গে বগুড়া শহরের জলেশ্বরীতলা এলাকার কোহিনুর গার্ডেনে থাকতেন। পাশের ফ্ল্যাটেই থাকতেন তার খালা।
সৌমিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে অনার্স শেষ করে ফুল স্কলারশিপে আমেরিকায় উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ২৬ জুন ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসে যাওয়ার কথা ছিল তার, তবে কোনো কারণে তা পিছিয়ে যায়। এ নিয়ে মানসিক চাপে ছিলেন বলে জানিয়েছেন পরিচিতজনরা।
এর আগে বৃহস্পতিবার (১৯ জুন) সন্ধ্যায় হাঁটতে বেরিয়ে নিখোঁজ হন সৌমিক। এরপর তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরদিন সকালে সৌমিকের বাবা বগুড়া সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়রি করেন। নিখোঁজের পর পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা দিনরাত খোঁজাখুঁজি চালিয়ে যান। একপর্যায়ে (২৯ জুন) রবিবার সকালে তার মরদেহ পাওয়া যায় শাজাহানপুর উপজেলার মাঝিরা ক্যান্টনমেন্টের বোট ক্লাবের লেকটিতে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, নিখোঁজের পরদিন রাতে সৌমিক শেরপুর বাস কাউন্টার থেকে ঢাকাগামী এসআর পরিবহনের একটি বাসে সি-৭ নম্বর সিটে যাত্রা করেন। ভোররাতে কল্যাণপুরে নেমে রিকশায় কোথাও যান তিনি। ২৮ জুন বিকালে ঢাকার বসুন্ধরা কমপ্লেক্স এলাকায় এক বন্ধুর সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয় তার। তখন তিনি বলেন, ‘বাসায় একটু ঝামেলা হয়েছিল, রাগ করে চলে এসেছি।’পরে আবার বাসে করে বগুড়ায় ফেরেন বলে জানা গেছে।
পরিবারের দাবি, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। সৌমিকের চাচা আহসান হাবিব রতন বলেন, ‘সে অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের ছেলে ছিল। সারারাত পড়াশোনা করত, দিনে ঘুমাত, সন্ধ্যায় হাঁটতে বের হতো। তার কোনো শত্রু ছিল না। কয়েক দিন আগে বাসায় এসির পানি পড়া নিয়ে একটু কথাকাটাকাটি হয়েছিল, তবে তা কোনো বড় বিষয় ছিল না। আমরা বিশ্বাস করি, সৌমিককে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।’তিনি আরও বলেন, ‘শোনা যাচ্ছে, সৌমিকের নামে কেউ বাসের টিকিট কেটেছিল। তবে সে সত্যি ঢাকায় গিয়েছিল কি না, পুলিশ তদন্ত করলে বিস্তারিত জানা যাবে।’
শাজাহানপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম শফিক বলেন, প্রাথমিকভাবে মরদেহে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। সৌমিকের মৃত্যুর কারণ জানতে আমরা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছি। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পরই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাবে।
বগুড়া জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) আতোয়ার রহমান বলেন, সৌমিক নিখোঁজের ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ কোন অবহেলা করেনি। জিডি করার পর প্রথম থেকে তদন্ত শুরু করেছে। তিনি জানান, শহরের জলেশ্বরীতলা থেকে সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, গত ২৬ জুন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টা ৪৪ মিনিটে সৌমিক জলেশ্বরীতলা নূর মসজিদ এলাকার বাড়ি থেকে কালীবাড়ির দিকে একা হেঁটে যাচ্ছেন।
জানা যায়, প্রতিদিনই তিনি সন্ধ্যায় হেঁটে থাকেন। সঙ্গে তার মাও থাকেন। কিন্তু সেদিন তার সঙ্গে মা ছিলেন না। এরপর গত ২৮ জুন শনিবার তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় পুলিশ জানতে পারে তিনি ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। ওই দিন বেলা আড়াইটা থেকে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত সৌমিক ঢাকায় বসুন্ধরা এলাকায় তার বন্ধুর সাথে অবস্থান করেন। কিন্তু পরে তিনি বগুড়ায় আসেন।তিনি বলেন, এরপর ২৯ জুন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বগুড়ার শাজাহানপুরে বি-ব্লক এলাকায় বোর্ড ক্লাবের লেকে তার ভাসমান লাশ পাওয়া যায়। পরে লেক থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে প্রেরণ করে।
তিনি আরও বলেন, সৌমিক এসআর পরিবহনের একটি বাসে বগুড়া থেকে ঢাকা যান। বগুড়ার শেরপুরে এসআর কাউন্টার থেকে তিনি বাসের টিকিট সংগ্রহ করেছিলেন। তিনি ২৭ জুন রাত পৌনে ১২টার বাসের টিকিট সংগ্রহ করেন। পরে ওই বাসেই তিনি ঢাকা যান। সেই টিকিট আলামত হিসেবে উদ্ধার করা হয়েছে। এ ব্যাপারে আরও তদন্ত চলছে।
আমন্ত্রণ/এসিজি


































