আজিজুল হক সরকার :
আজ সোমবার (১৩ অক্টোবর থেকে সারাদেশের ৩০ হাজার এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়া পর্যন্ত লাগাতার কর্মবিরতি চলছে। পুলিশি হামলার প্রতিবাদে কর্মবিরতি এক দিন এগিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে ।
শিক্ষক-কর্মচারীদের ৩ দাবি আদায়ের লক্ষ্যে দিনাজপুর জেলার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সারাদেশে কর্মবিরতি পালন করছেন শিক্ষক-কর্মচারীরা।রাজধানীর প্রেসক্লাবে আন্দোলনে অবস্থানরত শিক্ষকদের ওপর ন্যাকারজনক হামলা ও কেন্দ্রীয় নির্দেশনায় আজ সোমবার (১৩ অক্টোবর) সকাল থেকে এ কর্মসূচি পালন করছেন তারা।
এর আগে, সারাদেশের শিক্ষকরা ২০ শতাংশ বাড়িভাড়া ভাতা, ১ হাজার ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা ও কর্মচারীদের ৭৫ শতাংশ উৎসব ভাতার জন্য পূর্বঘোষিত কেন্দ্রীয় কর্মসূচিতে প্রথম দিনে রোববার (১২ অক্টোবর) জাতীয় প্রেসক্লাবের অংশগ্রহণ করেন ঠাকুরগাঁও জেলার প্রায় একাধিক শিক্ষক। সেখানে অংশগ্রহণরত শিক্ষকদের ওপর পুলিশের বর্বর হামলার ঘটনা ঘটে।
কোনো কোনো শিক্ষক বলছেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সঙ্গে তামাশা করতে সরকার বেশ মজা পায়। যেখানে মূল বেতনের ৪৫ শতাংশ বাড়িভাড়া বাড়ানোর দাবি, সেখানে শতাংশ হারে বাড়িভাড়া বাড়ানো তো হয়ইনি, বরং বাড়ানো হয়েছে সাকল্যে মাত্র ৫০০ টাকা।
মাধ্যমিক স্কুল কিংবা মাদ্রাসায় সহকারী শিক্ষক হিসেবে চাকরিতে প্রবেশের সময় মূল বেতন ১২ হাজার ৫০০ টাকা।এর সঙ্গে ১ হাজার টাকা বাড়িভাড়া, ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা ও বিশেষ প্রণোদনা ১ হাজার টাকা যুক্ত হয়।আর মূল বেতন থেকে অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্টের নামে ১০ শতাংশ কেটে রাখা হয়। সব মিলে একজন সহকারী শিক্ষক বেতন পান ১৩ হাজার ৭৫০ টাকা।
কলেজের ক্ষেত্রে মূল বেতন ২২ হাজার টাকা, এর সঙ্গে ১ হাজার টাকা বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা ৫০০ ও বিশেষ প্রণোদনা অন্তত ১ হাজার যুক্ত হয়।
আর মূল বেতনের ১০ শতাংশ কেটে রাখা হয়। সব মিলে একজন প্রভাষক বেতন পান ২২ হাজার ৩০০ টাকা।
চাকরির অন্যান্য সুবিধা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠান থেকে দেওয়ার কথা থাকলেও দেশের বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান থেকে তা দেওয়া হয় না।
কেউ কেউ হয়তো বলবেন, শিক্ষকদের বেতনের টাকা তুলতেই হয় না। প্রাইভেট–বাণিজ্য করেই তাঁরা ভালো চলেন।
কারও কারও ক্ষেত্রে হয়তো এটা সত্য, কিন্তু ঢালাওভাবে শিক্ষকসমাজকে নিয়ে এমন মন্তব্য বেদনাদায়ক ও প্রহসনমূলক। কেননা, বেশির ভাগ শিক্ষক প্রাইভেট পড়ানোর মতো অবস্থানে থাকেন না।
ইংরেজি, গণিত, পদার্থ, রসায়ন ও হিসাববিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষকেরা প্রাইভেট পড়িয়ে যতটা সচ্ছলভাবে জীবন যাপন করেন, অন্য বিষয়ের শিক্ষকদের সে সুযোগ নেই।
সর্বশেষ গত ১৩ আগস্ট এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা ও শতভাগ উৎসব ভাতা বাড়ানোর দাবিতে ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে শিক্ষক মহাসমাবেশ ও পদযাত্রা কর্মসূচি হয়।
পরে শিক্ষা উপদেষ্টা, শিক্ষাসচিব ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ১০ সদস্যের শিক্ষক প্রতিনিধিদলের বৈঠকে হয়।দুই পক্ষের আলোচনা ও সমঝোতার ভিত্তিতে শিক্ষক প্রতিনিধিদল মূল বেতনের ২০ শতাংশ বাড়িভাড়া বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসেন।
সেই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ভাড়া বাড়ানো হলো ৫০০ টাকা, যা হাস্যকর ও ‘খয়রাতি’ বলে উল্লেখ করেছেন কেউ কেউ।
এই প্রহসনের জবাব দিতেই ১২ অক্টোবর থেকে জাতীয় প্রেসক্লাব ঢাকায় সমবেত হওয়ার জন্য ডাক দেয় নেতৃবৃন্দ। সেই ডাকে সাড়া দিয়ে সারা বাংলাদেশ থেকে অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে স্রোতের মত লোকসমাগম হয় প্রেসক্লাব চত্বর।
শিক্ষকরা জানান, শিক্ষকদের দাবির ব্যাপারে সরকারের এত তালবাহানা বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে। ইতঃপূর্বে শিক্ষকদের যত প্রাপ্তি এসেছে, তা আন্দোলন করেই এসেছে। এক গোষ্ঠীর অধিকার অন্য গোষ্ঠী মেনে নিতে চায় না। তাই নিজেদের অধিকার নিজেদেরকেই প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
বাংলাদেশের ছাত্র সমাজ এবং সাধারণ মানুষের কাছে শিক্ষক সমাজের সম্মানের জায়গাটা বিতর্কিত করে তুলছে। সর্বত্র শিক্ষকদের এখন তাচ্ছিল্য করা শুরু হয়ে গেছে …।এই অবস্থায় অতীত ঐতিহ্য শিক্ষকদেরকেই প্রতিষ্ঠিত করাতে হবে।
এর আগে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী থেকে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের দাবি আদায়ের আন্দোলনে জাতীয় প্রেসক্লাবে সমবেত হতে ফুলবাড়ী শিক্ষক সমিতির সেক্রেটারি সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. আমজাদ হোসেনের নেতৃত্বে ৩০ সদস্যের টিম ১১ অক্টোবর ‘২৫ রাতে রওনা দিয়েছে।
দিনাজপুরের ফুলবাড়ী মহিলা ডিগ্রী কলেজসহ জেলার সর্বত্র কর্মবিরতি স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালিত হচ্ছে। সফলতার রাস্তা এতো কুসুমাস্তীর্ণ নয়।কোনো প্রাপ্তিই সংগ্রাম ছাড়া আন্দোলন ছাড়া হয়নি।
উত্তর রঘুনাথপুর দ্বিমুখি দাখিল মাদ্রাসার সুপার এবং উপজেলা জামায়াতের আমির মো. হাবিবুর রহমান বলেন, আমরা বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মবিরতির ব্যাপারে আমাদের অধিকার আদায়ের বিষয়ে সম্পূর্ণ একমত। কর্মবিরতি সফল করার ব্যাপারে সর্বত্র এই মেসেজটি আমরা ছড়িয়ে দিয়েছি।
দিনাজপুর জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ফুলবাড়ী পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাহাদত আলী সাহাজুল বলেন, শিক্ষকদের যে তিনদফা দাবি তার সাথে আমি একমত। শিক্ষকদের উপর যে লাঠিপেটা করা হয়েছে তার তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করছি।
দিনাজপুর জেলা বিএনপির উপদেষ্টা ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মো. খুরশিদ আলম মতি বলেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের যে তিনদফা দাবি তার সাথে আমি সম্পূর্ণ একমত।শান্তিপূর্ণ শিক্ষকদের আন্দোলনে শিক্ষকদের উপর পুলিশ যেভাবে নিপীড়ন চালিয়েছে, তার তীব্র নিন্দা জানাই।
ফুলবাড়ী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার নূর আলম বলেন, শিক্ষকদের আন্দোলনের ব্যাপারে আমি আর কি বলবো এটাতো সারাদেশের শিক্ষকের আন্দোলন। এ ব্যাপারে আমার কিছু বলার নেই।
সারাদেশের এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে যে আন্দোলন এবং আজ সোমবার থেকে কর্মবিরতি চলছে এ ব্যাপারে ফুলবাড়ী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. ইসাহাক আলী বলেন, শিক্ষকদের আন্দোলনের ব্যাপারে আমাকে কেউ কিছু জানায়নি। আজকে দুটো মিটিং ছিল, এনিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। এটাতো সারাদেশে শিক্ষক আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। তাদের দাবি আদায়ের জন্য।
আমন্ত্রণ/এসিজি


































