গোপাল মোহন্ত, গোবিন্দগঞ্জ :
উত্তরের ৮ জেলার প্রবেশদ্বার হিসবে পরিচিত গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সুস্বাদু আর রসে ভরা রসমঞ্জুরী এখন সুনাম কুড়িয়েছে দেশ বিদেশে। অতিথি অপ্যায়নে নানা পদের মিষ্টান্নের পাশাপাশি এখানকার তৈরী রসমঞ্জুরী আলাদা ঐতিহ্যবহন করে চলেছে। এর সুনামের কারণে পাশর্^বর্তী জেলা সহ দেশের বিভিন্ন স্থানের যাতায়াতকারীরা গোবিন্দগঞ্জ শহর অতিক্রমের সময় রসমঞ্জুরীর স্বাদে নিজেকে তৃপ্ত করে। রসমঞ্জুরী স্বাদ না পেলে গোবিন্দগঞ্জ ভ্রমনে আসা আগন্তকদের ভ্রমণ যেন অসম্পন্ন থেকে যায়। এর সুনাম ও স্বাদের কারণে বগুড়া, দিনাজপুর, রংপুর, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, লালমাণির হাট, ঠাকুরগাও, পঞ্চগড়সহ বিভিন্ন জেলার যাতায়াতকারীরা পরিবারে জন্য এবং আতীয়-স্বজনের বাড়ীতে যাওয়ার সময় রসমঞ্জুরী নিয়ে যান।
প্রায় শত বছর গাইবান্ধা জেলার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে স্বাদে ভরা রসমঞ্জুরী। একারণে বিভিন্ন জায়গায় গাইবান্ধা রসমঞ্জুরীর জেলা নামেও পরিচিত লাভ করছে। এখানকার তৈরি রসমঞ্জুরী রসনা বিলাসীদের তৃপ্ত করে দেশ পেরিয়ে যাচ্ছে বিদেশে। গোবিন্দঞ্জে আগত অতিথিদের আপ্যায়নে অন্যতম মিষ্টান্ন রসমঞ্জুরী। স্বাদে ভরা ‘রসমঞ্জরীর সুনামে গাইবান্ধার ইতিহাস-ঐতিহ্যের কারণে এটি জেলা ব্র্যান্ডিংয়ে স্থান পেয়েছে। এখন রসমঞ্জরী বিশ্ব দরবারে গাইবান্ধা জেলার পরিচিত অর্জনে অনন্য ভূমিকা রাখছে।
জানা গেছে ১৯৪৮ সালে গাইবান্ধা শহরের সার্কুলার রোডের রমেশ সুইটসের কর্ণধার রমেশ চন্দ্র ঘোষ জেলায় সর্বপ্রথম রসমঞ্জরী তৈরি করেন। সে সময় ভারতের উড়িষ্যা থেকে কারিগর এনে তিনি এই মিষ্টি তৈরি করতেন। পরবর্তী এক দশকের মধ্যেই রসমঞ্জরীর স্বাদ জেলার গÐি পেরিয়ে দেশব্যাপী মানুষকে আকৃষ্ট করে। এখন এই রসমঞ্জুরী জেলা শহরের বিভিন্ন মিষ্টান্ন ভান্ডারেও পাওয়া যাচ্ছে। শুধু তাই নয় জেলা শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দুরে গোবিন্দগঞ্জেও রসমঞ্জুরী তৈরী হচ্ছে। দক্ষ কারিগর এনে শহরের মায়ামনি হোটল এন্ড রেন্টুরেন্টে প্রায় ৪৪ বছর ধরে তৈরী হচ্ছে রসে আর স্বাদে ভরা সুস্বাদু রসমঞ্জুরী। মায়ামনি হোটেল এন্ড রেষ্টুরেন্ট ছাড়াও গোবিন্দগঞ্জের বনফুল হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট, জলযোগ হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট, নিরু ঘোষের হোটেল এন্ড মিষ্টান্ন ভান্ডারে তৈরী হচ্ছে রসমঞ্জুরী।
কারিগররা জানান বিশেষ ভাবে ছানা ময়দা মিশিয়ে তা ছোট ছোট গোল গোল গুটি চিনির রসে সিদ্ধ করে দুধের ক্ষিরে ডুবিয়ে তৈরী করা হয় রসমঞ্জুরী। নরম মিষ্টি ঘন লালচে দুধে জমে যখন ক্ষীরে পরিনত হয় তখন এটা পরিবেশন উপযোগি হয়। এই মিষ্টি মুখে দিলেই মিলবে অদ্ভুত প্রশান্তি। রস আর অনন্য স্বাদের জন্য এই মিষ্টির নাম রসমঞ্জরী। প্রথমে বিভিন্ন খামারি ও সাধারণ বিক্রেতার কাছ থেকে খাটি দুধ সংগ্রহের পর বড় কড়াইয়ে সেগুলো জ্বাল দিতে হয়। পরে ফুটন্ত দুধ ঠান্ডা করে হালকা গরম অবস্থায় ছানা ছেঁকে বের করতে হয়। তারপর হালকা আটা, সুজি ও চিনি দিয়ে মিশ্রণটি মেশিনে দিয়ে গোল গোল করে মিষ্টি কাটতে হয়। পরে সেগুলো ফুটন্ত চিনির সিরায় ১০ থেকে ১২ মিনিট সেদ্ধ করে ফের সিরায় নামানো হয়। কিছুক্ষণ ঠান্ডা করার পর তা ক্ষিরে ঢোবালেই ক্ষির-গুটি মিলে তৈরি হয় সুস্বাদু ও রসে টুইটুম্বুর রসমঞ্জরী।
ঐতিহ্যবাহী এই মিষ্টি দেশ পেরিয়ে এখন বিদেশেও যাচ্ছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে অফিস-আদালতে, অতিথি আপ্যায়নে রসমঞ্জরীর বিকল্প নেই এই এলাকায়। ‘রসমঞ্জরী গাইবান্ধার ইতিহাস-ঐতিহ্য হওয়ায় জেলা ব্র্যান্ডিংয়ে এটি স্থান পেয়েছে। এই রসমঞ্জরী বিশ্ব দরবারে গাইবান্ধা জেলাকে পরিচিত করতে অনন্য ভূমিকা রেখেছে।’ প্রতিদিন এক একটি দোকানে তৈরি হচ্ছে ১০০ থেকে ২০০ কেজি রসমঞ্জরী। বর্তমানে প্রতি কেজি রসমঞ্জরী বিক্রি করা হয় সাড়ে ৪শ টাকায়।
মায়ামনি হোটেল এন্ড রেন্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারী বাবুলাল চৌধুরী বলেন, দক্ষ কারিগর দিয়ে ৮০ এর দশকে গাইবান্ধা জেলা শহরের বাইরে আমরাই প্রথম রসমঞ্জুরী তেরী শুরু করি। বিশেষ নজরদারীর মাধ্যমে গুণগতমান ও এর স্বাদ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। যাতে স্বাদের কোন পরিবর্তণ না হয়। যে কারণে অনেক দুর দুরান্ত থেকে মানুষজন এ রসমঞ্জরী খেতে আসে। প্রবাসীরা ফেরৎ যাওয়ার সময় এখান থেকে রসমঞ্জুরী নিয়ে যায়। এ ছাড়াও ঢাকার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আপ্যায়নের জন্য গোবিন্দগঞ্জের রসমঞ্জুরীর যথেষ্ট কদর রয়েছে। প্রায় দিনই ঢাকা, কুমিল্লা, চট্রগাম, সিলেট, খুলনা সহ বিভিন্ন এলাকায় তার দোকানের তৈরী রসমঞ্জরী গ্রাহকের কাছে পাঠানো হয়।
আমন্ত্রণ/এজি
গোবিন্দগঞ্জের স্বাদে রসে ভরা রসমঞ্জুরীর সুনাম দেশ বিদেশে
আগস্ট ৩, ২০২৪


































