রীতা রানী কানু :
সকাল সাড়ে ৯টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত ক্ষেতে কাজ করলে মজুরি দেয় ৩৫০ টাকা। অথচ পুরুষ শ্রমিকরা একই কাজ করে পাচ্ছেন ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা। এভাবে নারীদের সঙ্গে অন্যায় করা হচ্ছে। বৈষ্যম হতে পারে, তবে অর্ধেক মজুরি দেওয়া নারীর প্রতি অন্যায় করার শামিল। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিসহ পেটের দায়ে কাজ করতে হয়। বাড়ীর কর্তার একার আয়ে সংসার চালানো কষ্টকর। কথাগুলো বলছিলেন ফুলবাড়ী পৌর এলাকার পূর্ব গৌরীপাড়া এলাকার জমিতে বোরো ধান চারা রোপণ কাজে নিয়োজিত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারী কৃষি শ্রমিক নির্মলা মার্ডি (৪০)। নির্মলা মার্ডির বাড়ী পার্শ্ববর্তী বিরামপুর উপজেলার খানপুর ইউনিয়নের বুচকি আদিবাসী পাড়ায়। তিনিসহ তার গ্রামের ১১ জন নারী কৃষি শ্রমিক দল বেঁধে বোরো ধান চারা রোপাণের কাজ করছেন। দিন শেষে প্রত্যেকেরই মজুরি দেয়া হচ্ছে ৩৫০ টাকা। এরমধ্যে শুধু দুপুরে নাস্তা হিসেবে দেয়া হয় জনপ্রতি ২০০ গ্রাম করে মুড়ি। তবে কোনো কোনো এলাকায় নারী শ্রমিকদের মজুরি ৪০০ টাকাও দেওয়া হচ্ছে।

ফুলবাড়ীতে কৃষিকাজে নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ ক্রমে বাড়ছে। তবে মজুরি বৈষ্যমের শিকার হয়ে অনেকে কাজ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। গত আমন মৌসুমে ধানক্ষেতের আগাছা পরিষ্কারের শ্রমিক সংকটে পড়েছেন কৃষক। জানা গেছে, সারাদিন কাজ করলে পুরুষের মজুরি দেওয়া হয় ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা। একই ধরনের কাজ করলেও নারী শ্রমিকরা পাচ্ছেন এলাকা ভেদে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা। এ বৈষম্যের সদুত্তর নেই কৃষকের কাছে।
উপজেলা কৃষি ও প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় নারী শ্রমিকের সংখ্যা অন্তত দুই হাজার। মিল-চাতালে কাজ করছেন অন্তত ২০০ থেকে ২৫০ জন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করেন শতাধিক নারী, অন্যান্য শিল্প প্রতিষ্ঠানে অন্তত এক হাজারসহ কৃষিকাজে জড়িত। রাস্তাঘাট মেরামতসহ সংস্কারের কাজে নিয়োজিত শতাধিকসহ কৃষি কাজে জড়িত রয়েছেন অন্তত পাঁচ শতাধিক নারী শ্রমিক।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, উপজেলায় কৃষিকাজে পুরুষ শ্রমিকের সংখ্যা কমেছে। উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির কৃষকরা আবাদি জমি নিম্নবিত্তদের কাছে বর্গা দিয়ে চাষাবাদ করছেন। অনেক কৃষক নিজস্ব ও বর্গা নেওয়া জমিতে চাষাবাদ করেন। অনেকে আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার করছেন। এরপরও শ্রমিকের চাহিদায় ভাটা পড়েনি। তবে পুরুষ শ্রমিকরা ভিন্ন পেশায় চলে যাওয়ায় সংকট বাড়ছে। কৃষিতে চারা রোপণ, আগাছা পরিষ্কার ও কাটা-মাড়াইয়ে নারী শ্রমিকরা বেশি যুক্ত হচ্ছেন।

উপজেলার এলুয়ারি ইউনিয়নের শ্রীরামপুর (ধামাহার) আদিবাসীপাড়ার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারী কৃষি শ্রমিক লিলি হাঁসদা (২৯) বলেন, কৃষি কাজে নারী শ্রমিকের সংখ্য পুরুষ শ্রমিকদের সংখ্যার প্রায় সমান। সারাদিন হাঁড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে নারী কৃষি শ্রমিকরা মজুরি পাচ্ছেন এলাকা ভেদে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা। যা পুরুষ শ্রমিকের তুলনায় কম। কারণ একই সমান কাজ করে পুরুষরা পাচ্ছেন ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা মজুরি। পুরুষরা শহরে গিয়ে বিকল্প কোনো পেশায় যুক্ত হয়ে আয় করতে পারেন, কিন্তু নারীরা তা পারেন না। বর্তমানে যেভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেড়েছে, তাতে করে নারী কৃষি শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানো উচিত।
নারীদের সমঅধিকার আজও বাস্তবায়ন হয়নি উল্লেখ করে উপজেলা মহিলা পরিষদের সভানেত্রী ও ফুলবাড়ী শহীদ স্মৃতি আদর্শ কলেজের প্রভাষক চন্দনা রানী বলেন, বৈষম্য দূর করতে পুরুষের এগিয়ে আসতে হবে। তা না হলে নারী শ্রমিকদের অধিকার বাস্তবায়ন হবে না। নারীর ওপর অন্যায় করা হচ্ছে। মজুরি বৈষ্যম দূর করার জন্য সব স্তর থেকে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ রুম্মান আক্তার বলেন, কৃষিকাজের সর্বত্র নারীদের অবাধ বিচরণ। চারা রোপণ, আগাছা পরিষ্কার, ধান কাটা-মাড়াই, পাটের আঁশ ছাড়ানো, পাটকাঠি শুকানোর কাজ নারীরা করেন। কাজের তুলনায় নারীকে মজুরি কম দেওয়া হয় বলে শোনা যায়। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মজুরি বাড়ানো দরকার। না হলে নারীরা কৃষিতে আগ্রহ হারাবেন।
ফুলবাড়ীতে সমান কাজ করেও পুরুষের চেয়ে অর্ধেক মজুরি পান নারী শ্রমিকরা
ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২৪
































