অমর চাঁদ গুপ্ত অপু :
দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে অটোরাইস মিলের দাপট আর ক্রমাগত আর্থিক লোকসানে পড়ে বন্ধ হয়ে গেছে অর্ধশত হাসকিং মিল-চাতাল। টানা লোকসানের কারণে অনেক মালিক মিল বন্ধ করে দিয়েছেন। আবার অনেকে ব্যবসা বন্ধ করে মিল-চাতাল অন্যের কাছে ভাড়া দিয়ে রেখেছেন। কেউ কেউ মিল-চাতাল বিক্রি করে ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করেছেন। জীবিকার তাগিদে পেশা বদলে বাধ্য হয়েছেন এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মিল-চাতাল শ্রমিকরা। তবে দুর্ভোগে পড়েছেন নারী চাতাল শ্রমিকরা।
উপজেলা চাউল কল মালিক সমিতি সূত্রে জানা যায়, কয়েক বছর আগেও ফুলবাড়ীতে ২৮৫ টি হাসকিং মিল-চাতাল ছিল। যেখানে অন্তত ১০ থেকে ১২ হাজার নারী ও পুরুষ চাতাল শ্রমিকের কর্মসংস্থান ছিল। বর্তমানে হাসকিং মিলের পাশাপাশি চালু রয়েছে ১০ টি অটোরাইস মিল। এগুলো পুরোদমে চালু থাকলেও হাসকিং মিল টিকে আছেন মাত্র দেড় শতাধিক। এরমধ্যে খাদ্য বিভাগের নিবন্ধিত রয়েছে ১২৯ টি। এগুলোর অবস্থাও নাজুক।

উপজেলা কয়েকটি এলাকার হাসকিং মিলে গিয়ে দেখা যায়, দীর্ঘদিন ধরে মিলগুলো বন্ধ থাকায় চাতালে ঘাস গজিয়েছে, ভেঙে পড়েছে চিমনি। বছরের পর বছর অব্যবহৃত থাকায় ঝোপ-ঝাড়ে পরিণত হয়েছে চাতাল। নষ্ট হচ্ছে মিলের মূল্যবান যন্ত্র। ছিড়ে পড়েছে সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকা বৈদ্যুতি লাইনের তারগুলো।
স্থানীয় চম্পার মিল চাতালে কর্মরত নারী শ্রমিক আমেনা বেগম, মোমেনা খাতুন, রাবেয়া বেগম, মর্জিনা বেগম ও আলেমা খাতুন বলেন, ‘এ মিলে এক সময় অনেক নারী ও পুরুষ শ্রমিক কাজ করতেন। এখন চালকল বন্ধ হয়ে গেছে। তাই যারা আগে মিলে কাজ করতেন, তারা এখন পেশা বদল করেছেন। আমরা অন্য কোনো কাজ পারি না বলে বাধ্য হয়েই চাতালে পড়ে আছি।’
উপজেলা নলপুকুর এলাকার কেডি হাসকিং মিলের কেয়ার টেকার মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, মিলের মালিক কামাল হোসেন সাহেব বেশ কয়েক বছর আর্থিকভাবে লোকসান খাওয়ার পর গত চার বছর আগে মিল-চাতালের কার্যক্রম বন্ধ করে দেন। তখন থেকে মিল ও চাতাল পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। আগে মিলে অন্তত শতাধিক নারী ও পুরুষ শ্রমিক কাজ করতেন। দিন-রাত শ্রমিকদের পদচারণায় মুখরিত থাকতো এই মিল-চাতাল।

উপজেলার দক্ষিণ বাসুদেবপুর (চক কড়েয়া) এলাকার মেসার্স তিন ভাই হাসকিং মিলের মালিক মো. আলেফ উদ্দিন মন্ডল বলেন, ‘ধান কিনে চাল উৎপাদন করতে এক সপ্তাহ সময় লেগে যায়। আর অটোরাইস মিলে এক-দুদিনের মধ্যে চাল উৎপাদন করে বাজারজাত করা যায়। কিন্তু হাসকিং মিলের ক্ষেত্রে তা সম্ভব হয় নয়। অটোরাইস মিলের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারায় এবং ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহারের কারণে তাদের মতো ছোট ছোট চালকল মালিক পুঁজি হারিয়ে ফেলছেন। ফলে লোকসান ঠেকাতে তারা মিলের উৎপাদন বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। ইতোমধ্যে অনেকেই ব্যাংক ঋণের টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে মিল-চাতাল বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছেন।
উপজেলা চাউল কল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ সদস্য শফিকুল ইসলাম বাবু বলেন, বর্তমানে প্রায় ৯৫ শতাংশ হাসকিং মিলের উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। উৎপাদন বন্ধ থাকায় ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না অনেক চালকল মালিক। এর মূল কারণ অটোরাইস মিলের প্রাধান্য। প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে চালকলগুলো এখন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ৩০০টি হাসকিং মিলের সমান কাজ করে এক-একটি অটোরাইস মিল। বন্ধ হয়ে যাওয়া মিলগুলোকে সচল করতে হলে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষ বরাদ্দ ও ভর্তুকির মাধ্যমে মিলগুলোকে আধুনিক মেশিনারিজ দিয়ে ঢেলে সাজাতে হবে।
উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মঈন উদ্দিন বলেন, ফুলবাড়ী উপজেলায় খাদ্য বিভাগের নিবন্ধিত চালকলের সংখ্যা ১৩৯ টি। এরমধ্যে অটোরাইস মিল ১০টি এবং হাসকিং মিল ১২৯ টি রয়েছে। ১৩৯ টি চালকলের মধ্যে সরকারের সঙ্গে চাল সরবরাহের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছে মাত্র ৯০টি চালকল মালিক।
ফুলবাড়ীতে লোকসানে অর্ধশত হাসকিং মিল-চাতাল বন্ধ : বেকার হয়ে পড়েছেন চাতাল শ্রমিকরা
মার্চ ২, ২০২৪


































