অমর চাঁদ গুপ্ত অপু ও রীতা রানী কানু :
কোরবানী ঈদের আগে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলা জুড়ে গরুর লাম্পি স্কিন ডিজিজ বা এলএসডি রোগের ভয়াবহ রূপ ধারণ করায় গরুর প্রাণ বাঁচানে নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন এলাকার গৃহস্থসহ খামারীরা। গৃহস্থ ও খামারীদের অভিযোগ, রোগটি ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়লেও অফিস ছেড়ে মাঠে দেখা মিলছে না প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। গ্রামের পল্লী চিকিৎসক দিয়েই প্রাথমিকভাবে চলছে এই রোগে চিকিৎসা। এতে গরু সুস্থ না হলে পরবর্তীতে বাধ্য হয়ে নিয়ে যেতে হচ্ছে উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালে।
অপরদিকে উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালের উদ্যোগে রোগটির বিষয়ে সচেতনতামূলক সভাসহ লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে। এছাড়াও তাদের অফিসিয়্যাল ফেসবুক পেজে ও ওয়েবসাইটে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থাপত্র দেয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৪ মে) দুপুরে উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, ভ্যানে ভ্যানে এ রোগে আক্রান্ত গরু নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন গৃহস্তসহ খামারীরা। হাসপাতালের কর্মরত চিকিৎসক ও কর্মচারীরা চিকিৎসা দিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফুলবাড়ী উপজেলায় শতাধিক গরু এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে। সরকারিভাবে এ বিভাগ থেকে আক্রান্ত গরম্নকে চিকিৎসা প্রদানসহ পরামর্শ দেওয়ার কথা থাকলেও তারা কেউ মাঠে আসেননি বলে দাবি কৃষক ও গৃহস্থদের।
এদিকে উপজেলার অনেক খামারি ও কৃষক ‘লাম্পি স্কিন ডিজিজ’ রোগে আক্রান্ত গরম্ন বাধ্য হয়ে খুবই কম দামে স্থানীয় কসাইদের কাছে বিক্রি করছেন। কেনো না বেশি আক্রান্ত হলে গরম্নগুলো মারা যাচ্ছে। উপজেলার শিবনগর, বেতদিঘী, আলাদীপুরসহ বেশি কিছু ইউনিয়নের অধিকাংশ বাড়ীতেই এ রোগ দেখা দিয়েছে। ছড়িয়ে পড়ছে গ্রামের পর গ্রাম। গরু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। নিত্যপণ্যের উর্ধ্বগতির এ পরিস্থিতিতে আক্রান্ত গরুর চিকিৎসা চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন লাম্পি স্কিন ডিজিজে আক্রান্ত গরুর মালিকরা।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালে লাম্পি স্কিন ডিজিজে আক্রান্ত গরুর চিকিৎসা নিতে আসা পৌরএলাকার তেঁতুলিয়া গ্রামের কায়সার আলী বলেন, তার বাড়ীর পাঁচটি গরম্নর মধ্যে একটি ছোট বাছুরের গায়ে লাম্পি রোগ দেখা গেছে। পরে বাছুরটি হাসপাতালে এনে জানতে পারেন বাছুরটি লাম্পিসহ বেবিসিস রোগে আক্রান্ত হয়েছে। চিকিৎসক রোগটির চিকিৎসার জন্য ব্যবস্থাপত্র লিখে দিয়েছেন।
সুজাপুর গ্রামের ফেরদৌসি বেগম বলেন, তার চারটি গরম্নর মধ্যে একটি বড় গরুর গলার নিচে ফুলে গেছে এবং সারা গায়ে ফোসকা বের হয়েছে। গরুটির অবস্থা খুবই খারাপ। শরীর পচে গর্ত হয়ে যাচ্ছে। গরুটি হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। বর্তমানে একটু সুস্থ মনে হচ্ছে।
চকচকা গ্রামের রতন শিং বলেন, তারও একটি গরুর লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত জেনে সাথে সাথে হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন। বর্তমানে গরুটির অবস্থা আশঙ্কাজনক পর্যায়ে। গরুটির চিকিৎসা চলছে।
সাহাবাজপুর গ্রামের গরু খামারী নজরুল ইসলাম বলেন, সামনে ঈদ আর এসময় গরু লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ঈদে লোকসান গুণতে হবে। এ রোগ প্রতিরোধে দ্রুত সরকারিভাবে প্রতিষেধক (ভেকসিন) তৈরির করা প্রয়োজন।ৎ
পজেলার ইউনিয়নের পলিশিবনগর গ্রামের ফয়জুর আলী, আবু বক্কর ও মংলা শেখ বলেন, তাদের প্রত্যেকের একটি করে গরু এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে। এছাড়া এ গ্রামের সিংহভাগ বাড়ীতে এ ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়েছে। গ্রাম থেকে উপজেলা ভেটেরিনারী হাসপাতালে গরু নিয়ে যেতে অনেক টাকা খরচ ও ঝামেলা হয়, তাই বাধ্য হয়ে গ্রাম্য চিকিৎসক দিয়েই কাজ চালাতে হচ্ছে।
উপজেলার বেতদিঘী ইউনিয়নের পল্লী চিকিৎসক রেজাউল আলম বলেন, গত এক মাস যাবত লাম্পি স্কিন রোগের সংক্রমণ দেখা দিয়েছে। প্রতিদিনই কয়েকটি করে এমন রোগে আক্রান্ত গরু দেখছি। তবে এর সুনির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। লক্ষণ দেখে আক্রান্ত পশুকে পেনিসিলিন, এন্টি হিস্টামিন এবং জ্বর হলে প্যারাসিটামল দিলে কিছুটা উপকার পাওয়া যায়। তবে অবস্থা গুরুতর অবস্থা হলে উপজেলা প্রাণীসম্পদ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ড. মো. রবিউল ইসলাম বলেন, উপজেলায় লাম্পি স্কিন ডিজিজ ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিনিয়ত চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে এবং এ রোগ সম্পর্কে গৃহস্থ ও খামারীদেরকে সচেতন করতে লিফলেট বিতরণসহ সচেতনতামূলক সভা সেমিনার করা হচ্ছে। এছাড়াও উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের সরকারি ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেইজে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থাপত্র দেয়া হয়েছে। যদি কোনো কেনো গরুর এ রোগ দেখা দেয় তবে গৃহস্থ বা খামারীরা সে ব্যবস্থাপত্র দেখে প্রাথমিকভাবে ওষুধ দিতে পারবেন। প্রতিষেধক তৈরিতে সরকার কাজ করছে। দ্রুতই এ রোগের প্রতিষেধক বাজারে আসবে। তবে কিছু কোম্পানি ইতোমধ্যে প্রতিভেষধক বাজারজাত করেছে। তার দাম বেশি হওয়ায় কৃষকদের পক্ষে সেটি কিনে গরম্নতে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে কোনো গরু গুরুতর আক্রান্ত হলে দ্রুত সেই গরুকে উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালে নিয়ে আসার পরামর্শ দেন এই কর্মকর্তা।
ঈদের আগে ফুলবাড়ীতে গবাদিপশুতে লাম্পি স্কিন রোগের আক্রমণ গবাদিপশুর প্রাণ বাঁচানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় গৃহস্থসহ খামারীরা
মে ১৪, ২০২৪


































