দৈনিক আমন্ত্রণ প্রতিবেদক :
সহস্র মানুষের অপলক দৃষ্টি ৩০ ফুট উচ্চতার কাঠের দণ্ডের দিকে। শূন্যে ঘুরছেন একজন মানুষ। একটি দড়ি বাঁধা ওই ব্যক্তির পিঠের চামড়ার সঙ্গে গাঁথা বড় দুটি বড়শিতে। চারিদিকে শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি চলছে। বাজছে ঢাকঢোল। ছিটানো হচ্ছে খাজা-বাতাসা ও কলা।
আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার খয়েরবাড়ী ইউনিয়নের কিসমত লালপুর শ্মশানডাঙ্গায় এমন দৃশ্য দেখা মেলে। ওই এলাকার চড়ক কালী মন্দির চত্বরে এ উপলক্ষে বসেছে একদিনের গ্রামীণ মেলা। সেখানে নানা বয়সী সহস্রাধিক ভক্ত ও নানা সম্প্রদায়ের দর্শনার্থী সমবেত হয়েছেন।
বড়শিতে শুক্রবার ঝুলছিলেন গজেন রায় (৪৫)। তিনি ওই অবস্থায়ই নিজের কাছে থাকা ফুল-জল, আবির, কলা, বাতাসা ইত্যাদি ছিটিয়ে দেন ভক্ত-দর্শকের দিকে। তাঁর বাড়ি ফুলবাড়ীর চণ্ডীপুর গ্রামে। গজেন রায় বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন স্থানে এভাবে চড়কে চড়েছেন তিনি। যে কারণে তাঁর পিঠে অগণিত ছিদ্র। প্রত্যেকবার পিঠের ভিন্ন ভিন্ন স্থানে ছিদ্র করে বড়শির কল লাগানো হয়। এটি সহ্য করতে বেশ সাধনাও করতে হয়েছে বলে জানান।
আয়োজক সূত্র জানায়, বড়শিবিদ্ধ অবস্থায় মানুষকে ঘোরানোর আগে দিনভর নানা আচার পালন করা হয়। মাঠের মাঝখানে পোঁতা হয় কাঠের দণ্ড। অনেকটা লাঙলের জোয়ালের মতো আরেকটি কাঠ এই কাঠের ওপর লম্বালম্বিভাবে বসানো হয়। কাঠের মাথায় থাকে মাটি পর্যন্ত ঝোলানো কয়েকটি লম্বা দড়ি। এর মধ্যে ঝোলানো একটি দড়িতে একজন মানুষের পিঠে দুটো বড়শির কল ফুটিয়ে তাঁকে ঝোলানো হয়। আর কাঠের দণ্ডের ঠিক নিচে একদল মানুষ শক্ত হাতে ঘোরাতে থাকেন কাঠের দণ্ডটি। এভাবেই বড়শিবিদ্ধ মানুষকে চারিদিকে ঘোরানো হয়। এটাই চড়ক পূজার বিশেষত্ব।
শুক্রবার এ উৎসবে আসা কমলা রানী, অনিতা বালা ও প্রদীপ রায়ের সঙ্গে কথা হয় সমকালের। তারা বলেন, চড়ক উৎসবের আয়োজন শুরু হয় প্রায় এক সপ্তাহ আগে। ধর্মানুরাগী সন্ন্যাসীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে নৃত্যগীতের মাধ্যমে পূজার জন্য চাল ও অর্থ সংগ্রহ করেন।
ইউনিয়নের কিসমত লালপুর শ্মশানডাঙ্গায় চরক উৎসবের আয়োজন চলছে প্রায় এক যুগের বেশি ধরে। উৎসব আয়োজক কমিটির সভাপতি পদে আছেন ইউপি সদস্য সুকুমার রায়। সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আছেন যাদব রায়। এ দু’জন বলেন, চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে বৈশাখ মাসজুড়ে শ্মশানকালী পূজার আয়োজন থাকে। এ জন্য প্রতিবছর চৈত্রসংক্রান্তির আগের দিন এই কালী মন্দিরের পূজাকে কেন্দ্র করে চড়ক উৎসবের আয়োজন করা হয়। এখানে দিনব্যাপী মেলা বসে।
এই চড়ক মেলা উপলক্ষে মহদিপুর গ্রাম উৎসবে মেতে ওঠে বলে জানান উর্মিলা রানী, দীপালি রানী ও প্রথম রায়। তারা বলেন, এ সময় মেয়ে-জামাইসহ আত্মীয়স্বজনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। রাতে কালী পূজো হয়। দিনে মেলা হয়। এ মেলা শেষ পর্যন্ত আর হিন্দু সম্প্রদায়ের মেলা থাকে না। এটা এ অঞ্চলের সব ধর্মের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়। সব এলাকাবাসীই তা উপভোগ করেন। এটি যেন এলাকার বাৎসরিক উৎসবে রূপ নিয়েছে।
ফুলবাড়ীর চড়ক মেলা : বড়শিবিদ্ধ মানুষের শূন্যে ঘোরা দেখতে ভিড়
এপ্রিল ১৩, ২০২৪


































